নাচে ছুঁলে কয় ঘা?

 

(আয়নানগর বইমেলা ২০১৫)

নাচে ছুঁলে কয় ঘা?

আর কতদিন নেচে নেচে বেড়াবি? ওহ নাচেন বুঝি, আর কাজ কি করেন? ষষ্ঠীর দিন মেয়েটা নাচলো দেখলি, পুরো শিল্পা শেঠি! এঃ ব্যাটাছেলে আবার নাচে নাকি! …

মানুষমাত্রেই একা। নৃত্যশিল্পীরা মানুষ, অতএব নৃত্যশিল্পীরা একা। নাচে ছুঁলে ঘা কম নয়, কিন্তু সামান্যে কি তার মর্মে বোঝা যায়?

ভারতীয় মার্গীয় নৃত্যের একটি নিজস্ব ভাষা আছে, যেটা আমাদের পরিচিত বাচিক যোগাযোগের ভাষার মতই নিয়মে বাঁধা। একেকটি শব্দের মত একেকটি মুদ্রার কিছু মানে রয়েছে। আর এই মুদ্রাগুলির – অন্তত মৌলিক একসেট মুদ্রার অর্থ বেশ চিত্রানুগ। যেমন হরিণের মুদ্রায় তিনটি আঙুল জুড়ে হরিণের সরু মুখটি আর দুপাশে দুটি আঙুল দিয়ে কান উঠে আছে, সাপের মুদ্রায় ছোবল – এইসব আর কি। এছাড়াও যোগাযোগের উপাদান হিসেবে আছে নবরস – শৃঙ্গার, ভয়, শান্তি, রাগ, লজ্জা-টজ্জা। এরপর আসে ওই মৌলিক মুদ্রা ও রসগুলির পার্মুটেশন-কম্বিনেশনে নির্মিত জটিল শব্দ ও বাক্য, যেমন হরিণ গাছের তলায় দাঁড়িয়ে আছে, সে সাপ দেখে ভয়ে আঁতকে উঠলো। আবার দুঃশাসন বোঝাতে একহাতে রাজার মুদ্রা, আরেকহাতে কুটিল সর্পমুদ্রা, সতীন বোঝাতে দুই হাতে নারী দেখিয়ে তারপর দড়ির ফাঁস দেখানো (আমি অবশ্য অভিনয় দর্পণ, হস্তলক্ষণদীপিকা, নাট্যশাস্ত্রটাস্ত্র – যখন যেটা মাথায় আসছে শুট করছি, কেউ ভুল ধরলেই কান ধরব) – এইভাবে ভাষাটা ডেভেলপ করে। অতএব দৈনন্দিন জীবনের সহজ এক্সপ্রেশনের কাজটা মার্গীয় নাচ দিয়ে অনেকটাই কভার করে ফেলা যায়। নাচের আদিযুগে পার্ফর্মেটরি স্টোরি-টেলিঙের জায়গা থেকে এই যোগাযোগের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু মানুষ যেমন যোগবিয়োগে খুশি না থেকে ডিফারেনশিয়াল ক্যালকুলাসের পিছনে ছোটে, তেমনি নাচের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে নৃত্যশিল্পীরা শরীরের সহজ অভিব্যক্তি ও কথোপকথনে খুশি থাকেননি। তাঁদের মধ্যে কেউ নাচ জিনিসটাকে জিমনাস্টিক হিসেবে দেখতে চেয়েছেন, কেউ রূপচর্চা, কেউ আবার দেখেছেন রাজনীতি বা দর্শন হিসেবে। নাচের সাথে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্কের নয় নয় করে পঁচিশ বছর হয়ে গেল, তাই স্বাভাবিকভাবে আমারও স্টকে রয়েছে একটা দেখার ধরণ, বহু প্রশ্ন, কিছু উত্তর। বিশেষ করে গত দেড়-দুবছরে ইণ্ডিয়ান কনটেম্পরারি নাচের একটি শাখার সাথে যুক্ত থাকায় হালের অনেক প্রশ্নই উঠে এসেছে ওই জায়গা থেকে। এ লেখা সেসব নিয়েই। একে ভারতীয় আধুনিক নাচের ক্র্যাশ কোর্স হিসেবে ধরলে বিষম খাব, বলা ভালো – এটা ভারতীয় নাচ, বিশেষত আধুনিক ভারতীয় নাচ বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত ধ্যানধারণার মিনি পাঁচালিবিশেষ। ফলে উদাহরণ যা দেব, মূলত আমার চর্মচক্ষে দেখা নাচগুলির থেকেই দেওয়ার চেষ্টা করব। আরেকটা কথা বলে রাখা ভালো, হয়তো শিল্পী ও তাঁদের শিল্পকর্মের নাম না করেও অনেক ব্যাপার কথায় বুঝিয়ে দেওয়া যেত; তাও আমি লেখাটিকে একটু নামভারাক্রান্ত করেছি, যাতে কারুর যদি মনে হয় ইউটিউব বা অন্যান্য অনলাইন আর্কাইভে গিয়ে এই নাচগুলির কোনোটা বা এদের সম্বন্ধিত কোনো ভিডিও দেখবেন বা রিভিউ, অন্যান্য আলোচনা পড়বেন, তাহলে তার একটা সহজ সুযোগ থাকে।

এব্যাপারে ছোট করে একটা ব্যক্তিগত কথা বলি। ভারতীয় কনটেম্পরারি নাচের এক্সপ্রেশনে নানা রস উঠে আসতে দেখেছি, কিন্তু গুড কোয়ালিটি হাস্যরসের কিছু অভাব আছে মনে হয়েছে। এর একটা কারণ হতে পারে, যে ভারতের মার্গীয় নৃত্যশাখার সুগভীর শিকড়ের তুলনায় এই সাবজেক্টটা সবে ছড়াতে বা স্বীকৃতি পেতে শুরু করেছে। তাই একটা জিনিসকে আগাপাশতলা চিনলে যেমন তার ফর্মের মধ্যে থেকেই তার বোকামি-ছোটমি নিয়ে রঙ্গব্যাঙ্গ করা যায়, সেই অবস্থান এখনো তৈরি হয়নি। আরেকটা কারণ কি এই যে কনটেম্পরারি মানুষের জীবনে হাস্যরসের একটা জেনুইন ভাঁটা পড়েছে, আর তাই তার শারীরিক এক্সপ্রেশনও অমনি কঠোর? মানে কনটেম্পরারি নাচ বলতে যদি গোদাভাবে শারীরিক বিমূর্ততা বুঝি, ক্লাসিকাল নাচের কাহিনিধর্মিতার তুলনায়, তাহলে সেই বিমূর্ততার রসটি কি শুধুই গাম্ভীর্য্যের? হাস্যরসের কথাটা তুললাম কারণ এর অভাবটা — আমার অনেক সময় মনে হয়েছে — কনটেম্পরারি নাচ ও ‘সাধারণ মানুষে’র মধ্যে একটা দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। যাই হোক, এ নিয়ে আর কথা বাড়াবনা। এমনিতেই পেশায় ও ভাবভঙ্গীতে শুষ্ক একাডেমিক হয়েও তুলকালাম নাচের নেশায় ডান্স-ফিল্ডের যত্রতত্র ট্রেসপাস করার সুবাদে নাচের লোকেরা আমায় একটি নিরীহ কিন্তু উদ্ভট জীব বলে গণ্য করেন। এই ধরুন, আমি যখনই কাউকে নাচের লাইনের কায়দা মত শত্রুমিত্রনির্বিশেষে কদিন বাদে বাদে দেখা হলে হাগ করতে কি হাগিত হতে যাই, তখনই ইনেভিটেবলি কোন দিকে মুখটা রাখতে হবে সেব্যাপারে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি আর প্রত্যেকবার সেই কলেজফেস্টে লাইটম্যান জলধরদাকে বাই মিস্টেক গণ্ডে পেক করার কেস হয়। এইরকম আরো নানান ছোটবড় হাস্যকর ডেকোরাম খিচাইন আমার লেগেই থাকে। আবার সেদিন আমার এক নৃত্যশিক্ষক স্নেহের সাথেই ডেকে আমায় বললেন — জানিস তো আমাদের নতুন প্রোডাকশনটা নামছে, সবার সব ঠিক করা হয়ে গেছে কে কি করবে, তা তুই কি একটা কিছু করবি? তাতে অন্তত পুরো বিষয়টার একটা কমিক রিলিফ হবে, সবাই সিরিয়াস কাজ করছে তো…

রুস্তম ভারুচা যেমন নিজেকে কনটেম্পরারি নৃত্যশিল্পী চন্দ্রলেখার নাচের জগতের ‘ক্রিটিকাল ইনসাইডার’ বলেছিলেন, আমিও হয়তো তেমনি যে নাচের মানুষগুলির গায়ে লেপ্টে থাকার চেষ্টা করি, নিজেকে তাঁদেরই নৃত্যজগতের ‘জেস্টিং ইনসাইডার’ বলে ভাবতে পছন্দ করি। লেখার মুডটিও তাই একটু ভাঁড়ামি-ঘেঁষা বলে মনে হতে পারে। আমার জীবনের সবচেয়ে ভীতিপ্রদ শিক্ষক, শৈশব থেকে শুরু করে দীর্ঘ পনের বছর যাঁর স্নেহের মিঠেকড়া স্বাদ নিতে নিতে নাচের অ-আ-ক-খ শিখেছি, তিনি এ লেখা পড়লে গোল গোল চোখ করে তাকাতেন — এই সম্ভাবনার বিষম দায় ঘাড়ে নিয়ে লেখা শুরু করছি।

নাচিয়ের মন

গেল বছর আমার বয়েস তিরিশ পেরিয়েছে। এই কথাটা দিয়ে প্যারা শুরু করার তেমন কোনো দরকার ছিলনা — তবুও করলাম, কারণ অদৃষ্টপূর্বরকমভাবে আজকাল এটা দিনের মধ্যে ষোলো ঘন্টা মাথায় ঘোরে। আবার নাচের ব্যাপারে একথাটা পুরোপুরি বিষয়বহির্ভূত নয়, কেননা সত্যিই গত বছর দেড়েক আমার শরীর আর আগের মত কথা শোনেনা, বা অন্যভাবে বলতে গেলে এখন নাচতে গেলে শরীরের সাথে ক্রমাগত একটা কথোপকথন চালিয়ে যেতে হয় — আগে যে যোগাযোগটা মস্তিস্ক ও শরীরের একটা যুগ্ম সহজাত বোধ থেকে হত। এই বোধ মানে শুধু শরীর-মনের সিনক্রোনাইজড যুগ্মক্রিয়া নয়। জানিনা একে শব্দে ধরতে পারব কিনা। যদি বলি এ হল দেহ ও মস্তিষ্কের একটি গভীর পারস্পরিক আন্দাজ ও সখ্যতা, যেখানে তারা সমভাবে পরস্পরকে শেখে ও শেখায়, এবং এতটাই দক্ষতার সাথে যে বাইরে থেকে দেখে বোঝা যায়না কখন কে মূল ভূমিকা নিচ্ছে, তাহলে হয়তো কিছুটা কাছাকাছি যেতে পারে। এই বোধ হল নৃত্যশিল্পের সেই বিমূর্ত অঙ্গ যা কাউকে শেখানো যায়না। মানে আজ যদি আমি কাউকে বোঝাতে যাই ভালবাসা কি, আমি রোমিও-জুলিয়েট থেকে শুরু করে রাজ-সিমরনের হাজার একটা উদাহরণ প্রোডিউস করতে পারি, তাতে অন্ধের হস্তীদর্শনের মত একটা ব্যাপার হবে, কিন্তু তা ভালবাসা — এই বিমূর্ত বস্তুর বিবৃতি হবে কি? যাই হোক যা বলছিলাম, বয়েসঘটিত এই সমস্যা যেকোনো চলন-গমনসম্পর্কেই প্রাসঙ্গিক, যেটা অনেক মানুষই আক্ষরিক অর্থে হাড়ে হাড়ে জানেন। কিন্তু নাচের লাইনে বহু সদশিল্পীই — আজীবন দেহমনবিষয়ক নানা শৃঙ্খলা মেনে চলার ফলস্বরূপ — এই সমস্যাবিমুক্ত। স্বশিল্পক্ষেত্রে তাঁরা যেন সত্যিই যক্ষ-অপ্সরাদের মত জরাহীন। তবে মূল কথা হল, এই সুদীর্ঘযৌবন বা তার পশ্চাদ্ধাবন কিম্বা তার সাহচর্য্যের অধিকার-স্পৃহা — এসবই আসে এক নেশা থেকে। এই নেশা দেহ — অর্থাৎ একটি বস্তু, যা গতিশীল ও স্থিতিশীল হতে সক্ষম, তার এই গতি ও স্থিতিশীলতার রকমফের আর এই যে নানাবিধ গতি (এখন থেকে গতি বলতে আমি স্থিতিকেও সামিল করছি — গতিশূন্যতাও তো একরকমের গতি, যেমন শূন্য একটি সংখ্যা), তার পিছনের বিজ্ঞান বিষয়ে একটা প্রবৃত্তিগত আকর্ষণবোধের আরেক নাম — এইভাবে ভাবা যেতে পারে।

যে যুগ্ম সহজাত বোধের কথা বলছিলাম, এই বোধ-ই হয়ত একজন নাচিয়ের মন। ব্যক্তিগতভাবে আমার যা মনে হয়, একজন নাচিয়ের জীবন — তা তাঁর সমগ্র জীবন নাও হতে পারে — শুরু হয় এই মন থেকে, তারপর ক্রমশঃ তার ভাবনাভঙ্গীর, বা বলা ভাল ভাবনাবিন্দুর একটা সমান্তরাল স্থানান্তর ঘটে। তফাতটা ঘটে এইভাবে, যে তখন নাচ আর তাঁর কাছে একটা শখ, বা একটা মুক্তি, বা এমনকি একটা শিল্পই শুধু নয়, বরং একটা বিজ্ঞান, একটা গবেষণা — যাকে হয়ত শিল্পের ভাষায় সাধনা বলা হয় — যদিও সাধনা শব্দটার মধ্যে একটা ডানপন্থী গন্ধ আছে যেটা আবার আমার ঠিক পছন্দ নয়। নাচিয়ের জীবনের এই দ্বিতীয় অঙ্কের সাথে স্ব/পরচিত্তবিনোদনের কোনো সম্পর্ক নেই। এবং অন্য কেউ আমায় এটা বললে মারতে যাব, কিন্তু সত্যি বলতে কি এই নৃত্যভাবনা স্বভাবগতভাবে জীবিকানির্বাহেরও পরিপন্থী। নাচিয়েজীবনের এই ধাপে — খাব কি, হচ্ছে কিনা, কাকে কেমন দেখাচ্ছে — এসব প্রশ্ন প্রায় অপ্রাসঙ্গিক। এই পর্যায়টা একটা করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে ধরণের পরিস্থিতি তৈরী করে। এর পরবর্তী ধাপে পৌঁছে উঠতে পারলে, যা সব নৃত্যশিল্পীর জীবনে নাও ঘটতে পারে, নাচিয়ের জীবন মন ও মননের এক সার্থক সমন্বয় হয়ে ওঠে। এই পর্যায়ে একজন নৃত্যশিল্পীকে সফল বলা যেতে পারে, তবে সেটা খবরের কাগজে বা পাশবইতে লেখা সাফল্য নয়। সফল বলার চেয়েও হয়ত সুখী বা সন্তুষ্ট বললে এই মানসিক ও শৈল্পিক অবস্থাটার আরেকটু কাছাকাছি বর্ণনা দেওয়া হয় — অনেকটা একটা কঠিন অঙ্ক মিলিয়ে দিতে পারার অনুভূতির মত। এখানে পৌঁছবার পরে মানুষ হিসেবে নিশ্চয় একজন নাচিয়ের আরো অনেক কিছু চাওয়ার বা পাওয়ার থাকতে পারে, কিন্তু নাচিয়ে হিসেবে এটা তাঁর জীবনের জেনিথ। এই শৃঙ্গে এসে তিনি তাঁর উপযোগী স্টাইল আর একধরণের কমফর্ট জোন আবিষ্কার করেন। এর পরের কোনো প্রাপ্তি বা ঝুঁকিই এই উত্থানের সাথে তুলনীয় নয়। কম নৃত্যশিল্পীর জীবনেই এই মানের আরোহণ একাধিকবার আসে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর পরের জীবন শুধুই ঝুলে থাকার, যার জন্যেও অবশ্য যথেষ্ট দম লাগে, কিম্বা ধাপে ধাপে নেমে যাওয়ার।

নাচের এই বোধ যাঁর ভিতরে রয়েছে, তিনি জীবনের শেষ পর্যন্ত কিছু না করেও একজন নর্তক। কারণ নাচ মানে রঙিন সিল্কের শাড়ি বা এমনকি সুগঠিত শরীরও নয়; নাচ সর্বোপরি একটা ভাবনা, একটা প্রবৃত্তি। নাচিয়ের জীবনের শেষ ভাগাড়ে, যেমন আর পাঁচজনের। শিল্পটা অবশ্য থেকে যায় — শিষ্য, তথ্য, কথনের মধ্যে দিয়ে, অথবা থাকেনা। তাতে উপকার বা অপকার কিছু হয় বলে হলফ করে বলতে পারবনা। কারণ যাঁর শেখার তাঁকে আবার একদম গোড়া থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত যেতে হয়, যে পথ প্রতিটি নাচিয়ের জন্য আলাদা। তবে মোদ্দা কথা যেটা বলতে চাইছি, নাচ একটা আকাশ থেকে পড়া আজব জিনিস নয়, যেটাকে মখমলে মুড়ে বা আস্তাকুঁড়ে ঠেলে রাখতে হবে; পৃথিবীর অন্য সমস্ত শখ, পেশা ও চিন্তাধারা যেমন একইসাথে অবশ্যপ্রয়োজনীয় ও একেবারেই অপ্রয়োজনীয়, নাচও তেমনি। নাচের উপস্থাপক বা উপস্থাপনাক্ষেত্রটা মূল নয়, মূল হল তার দিকে তাকাবার পদ্ধতি, বা তাকে গ্রহণ করার শিক্ষা, যেটা একজন নাচিয়েকে আর সহমর্মী দর্শককে অনুভূতি আর মাথা খাটানোর একটা ব্যালান্সড সমন্বয়ের ভিতর দিয়ে অর্জন করতে হয়। ব্যাপারটা আর সব কিছুর মতই শুনতে এতটুকু, কিন্তু ওই ভাবনা বা প্রবৃত্তিটুকু না থাকলে এটা অত সহজে খায়না। আবার এই এতক্ষণ ধরে পাকানো গৌরচন্দ্রিকার উল্টোপিঠে রয়েছে নাচিয়ের মনের আরেকটা দিক — নিজের অর্জিত বিদ্যা সম্পর্কে অহঙ্কার ও স্পর্শকাতরতা, যা একজন নাচিয়ের কনফিডেন্স তৈরী করে কিন্তু মাপের একটুও এদিক ওদিক হলে যা তাঁকে ও তাঁর শিল্পকে সহমর্মিতার সাথে দেখার কাজটা কঠিন করে তোলে।

বিশেষ করে নাচ শেখাতে গেলে এই জিনিসগুলো নিয়ে ভাবনাচিন্তা না করে পার পাওয়া যায়না। আমার জীবনে আমি কিছু গড়পরতা আর বেশ কিছু উদ্ভট নাচের ক্লাস নিয়েছি। বাচ্চাদের নাচ শেখানোর মধ্যে দিয়ে প্রবৃত্তির ব্যাপারটা অনেকটা পরিষ্কার বোঝা যায়। একবার এক ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে আরেক বন্ধুর হয়ে, যে ওখানে বিদেশী বাচ্চাদের নাচ শেখাতে যেত, প্রক্সি দিতে গেছিলাম। ক্লাস মানে মোটে তিনটি চিংড়ি টাইপের ছাত্রী — আটের নীচে বয়েস, একটি ভারতীয় অরিজিনে ইউকেবাসী, একটি ফ্রেঞ্চ এবং একটি মার্কিন — দেখে প্রথমেই মনে হলো এ যেন সেই এক এস্কিমো, এক ইজরায়েলি আর এক পাকিস্তানী একটা বারে ঢুকলো ধরণের রসিকতা। ক্লাসরুমটিও নাচের ক্লাসের চেয়ে বার হিসেবেই মানাতো বেশি, পায়ের তলায় কার্পেট, মাথার উপরে এ.সি., জানলাবিহীন, টিমটিমে টিউবলাইটের আলোয় কালচার বা শরীরসাধনা বা যে অদ্ভূত কারণেই ও ক্লাসের জন্ম হয়ে থাকুক। আমার বন্ধুর ছিল তার মার্গীয় নাচের স্টাইলটির সাংস্কৃতিক প্রয়োজনীয়তা ও পবিত্রতা নিয়ে অটুট প্রত্যয় এবং সর্বোপরি সেইধরণের আত্মবিশ্বাস আর গোল্লা চোখ করে “এইও” বলবার ক্ষমতা যা বাচ্চা সামলাবার জন্যে অত্যাবশ্যক। আর আমি একে কোনদিনই নাচের স্টাইল বলতে একটা সেট অফ শরীর নাড়ানোর নিয়ম ছাড়া তেমন কিছু বুঝিনা, পবিত্রতা-টতা ছেড়েই দিন; তার উপর বাচ্চারা তাদের ফিচলে বুদ্ধি দিয়ে সর্বদাই কেমন ধরে ফেলে যে আমি লোকটা নেহাতই কেবলা, তাই আমার শিশুনৃত্য-শিক্ষকতা বিভাগে সাফল্যের রেট কোনোদিনই খুব বলার মত নয়। যাই হোক প্রবৃত্তির কথা বলছিলাম, তিনটি বালিকার কেউই কিছু নাচের প্রডিজি ছিলনা এবং তিনটিই সমান বিচ্ছু; কিন্তু তারই মধ্যে একটির শরীরে ছিল গতি সম্পর্কে চিন্তা — যা মানুষের বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ ব্যবহারে একধরণের শান্তির ভাব আনে (যেটা থাকলে বদমাইসি করলেও তাকে শিখিয়ে, বা তার সাথে নাচ বিষয়ে একধরণের কনভার্সেশন তৈরী করে আনন্দ আছে – এটা যে কেউ যদি বাচ্চাদের নাচ কেন কোনো কিছুই শিখিয়ে থাকেন, হয়তো বুঝতে পারবেন — শান্তিপূর্ণ বিচ্ছুতা এক্ষেত্রে অক্সিমোরন নয়)। বাকি দুটির মধ্যে একটির শরীরে ছিল ঔদাসীন্য আর তৃতীয়টি আধ ঘন্টা আমায় ও আমার চোদ্দগুষ্টিকে হয়রান করার পর বিরক্ত গলায় পাক্কা ইংরিজিতে যা বলল, তার মানে দাঁড়ায় — “বলি মাস্টার, থামতে কত নেবে? যতই চাও না কেন আমার মায়ের তার চেয়ে ঢের বেশি আছে।” ফেসবুকে এ গল্প লিখলে এইখানে একটা আক্কেলগুড়ুম স্মাইলি দিতে হয়। জাতিবৈশিষ্ট্যবাদী হবার ভয়ে ফার্দার ঘাঁটানোর থেকে বিরত হলাম।

আবার এর বিপরীতে — চল্লিশোর্ধ চৌকো মুখে চৌকো দাড়ি (ছেলেবেলায় বাবা-মায়ের একগুচ্ছ বন্ধুর সম্বন্ধে দাদার কয়েন করা অবিস্মরণীয় পারিভাষিক ও পারিবারিক কূটশব্দ) কোনোদিনও নাচের ন না জানা মানুষ যখন এই প্রবৃত্তি ও অনুধাবন-স্পৃহা থেকে মার্গীয় নাচে একই শরীরচালনা কিভাবে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মুদ্রাভেদে নানান ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে তাই নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দুপুরবেলা দাবিয়ে খাবার পর হঠাৎ খাট থেকে উঠে বসে হাত-পা ছুঁড়ে নাচতে শুরু করেন, তখন তা যতই ইয়ে — হাস্যকর হোক, একভাবে দেখতে গেলে এই শিল্পের অস্তিত্ব, উপচয় ও আনন্দ এমন দিনেই ভালভাবে উপলব্ধ হয়।

নাচ আর বিনোদন

নাচ আর বিনোদনের অনস্বীকার্য সম্পর্কটা যে তেমন একটা কিছু আপত্তিকর তা নয়। হতে পারে ব্যক্তিগতভাবে শিল্প-বিনোদনের সম্পর্ক ব্যাপারে ওল্ড স্কুল হওয়ায় আমার দৃষ্টিভঙ্গী এবাবদে কতকটা ব্যাঁকা। তাছাড়া শিয়াল আঙুরফল খেতে পায়নি বলে তা টক না সত্যি সত্যি আঙুরফল টক বলেই শিয়াল সেটা খায়নি এ আলোচনা অসন্তত। ধরা যাক এও এক প্রবৃত্তিগত বিভেদ। তবে নিঃসন্দেহে এবিষয়ে আমার একধরণের জড়তা আছে, যা অন্যকে বোঝানো কঠিন। আমি কপালদোষে অঙ্ক নিয়ে খানিক পড়াশুনো করেছি এই দোষে যেমন হামেশাই লোকে বাজারের হিসেব করার সময় মুখে মুখে কেন সাত লাইনের যোগটা করে দিতে পারছিনা বলে কটাক্ষ করেন, তেমনি পালপার্বণে কাঁটা লাগা বা ধিতাং ধিতাং বোলে শুনলেই কেন কাটা পাঁঠার মত আমি দেহেমনে নেচে অপ্সরা পেঁদিয়ে দিচ্ছিনা এ নিয়েও হামেশাই কথা শুনতে হয়। কিন্তু এমনই আমার স্বভাব যে আমার সামনে বীরুকে সাত মণ তেলে পুড়িয়ে সাত দিনের ফাঁসি দিলেও বাসন্তি কিছুতেই এই কুত্তোকে সামনে মৎ নাচেগি। এ লেখার বাকিটুকু পড়ে, বা না পড়েই বিনোদনপ্রেমী পাঠক তাই ক্ষুব্ধ হবেননা; এ আমার লেখা নয় — মুদ্রাদোষ!

সেদিক থেকে দেখতে গেলে, সমাজে সমমনস্ক মানুষের ভিতর শিল্প হিসেবে নাচের বিকাশ তো পারস্পরিক বিনোদনের উপরেই দাঁড়িয়ে আছে। সে বিনোদনের, মানে কেবলমাত্র মস্তিষ্কে সুড়সুড়ি দেয় যে বিনোদন, তার কথা হচ্ছেনা। সমস্যা হয় বিনোদনের ভোগবাদী দিকটাকে নিয়ে, যেটা স্বাভাবিকভাবেই বাহ্যিক চাকচিক্য আর তার চেয়েও বেশি শিল্পীর বিনোদনী ইচ্ছে বা ইচ্ছের ভড়ঙের উপর নির্ভরশীল। এই ইচ্ছের প্রকাশভঙ্গীটাও বাজারপ্রেক্ষিতে নানানরকম – সেটা এবার একটু গুছিয়ে বলার চেষ্টা করছি। ভড়ং কথাটা বারবার ব্যবহার করব, তাই এখানে বলে রাখা ভালো – কথাটার ব্যবহার এই লেখায় নেতিবাচক নয়, এ হলো যাকে বলে পার্ট অফ দ্য গেম – যে নাচছে সেও জানে যে এ ভাণ, যে দেখছে সেও। আম্মো খুশ, তুম্মো খুশ – খুশ না হোক অন্ততপক্ষে খুশির ভড়ঙে রাতকাবার। অধিকাংশ নাচিয়ে, তিনি যদি ঠাকুরমার ঝুলির ভাষায় সত্যকালের নাচিয়ে হন, তিনি এই ভড়ঙের বাইরে এক দ্বৈত অস্তিত্বে অডিয়েন্স, ক্রিটিক ইত্যাদি এলিমেন্টকে ছলেবলেকৌশলে তাঁর নৃত্যজীবনবলয়ের বাইরে রেখে তাঁর সাধনা, গবেষণা এইসব চালাতে বাধ্য।

সিনেমার পর্দায় বা তার বাইরে – ক্যাবারে বা একালীন বাইজিনাচের আসরে, মায় কলেজ ফেস্টে স্টেজের উপরে/নীচে এই ইচ্ছের ভড়ং অপেক্ষাকৃত ভ্যানতাড়াহীনভাবে অর্থ ও যৌনতার সমীকরণ সিদ্ধ করে। মার্গীয় নাচের বাজারে – বিশেষ করে নাগরিক প্রসেনিয়ামে এই ভড়ং শুধু যে যৌনতার পরিবেশক তা নয়; এখানে ব্যাপারটা আরো বহুমাত্রিক, কারণ এখানে নাচিয়ে আর দেখিয়ে – দুপক্ষই অন্তত তাদের স্ব-উপলব্ধিতে এক জটিলতর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্থানাঙ্কে অবস্থিত। তার ফলে যা দাঁড়ায় তা হলো যৌনতা আর নৈতিকতার এক খিচুড়ি – যেখানে একদিকে প্রতিরাত্রে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ বা চন্দনচর্চিত অষ্টপদীর চিত্রানুগ নাট্যরূপ দেখে দর্শকের আপাদহৃদয়ে বৈধভাবে ঘাম দেয়; আবার অন্যদিকে এর কর্ণধারেরা হামেশাই পৃথিবীর অন্য যেকোনোরকম নাচ – সাধারণত নিজের উঠোনটুকু ছাড়া বাকি যা-ই দৃষ্টিসীমায় পড়ে – কেন অশ্লীল বা কৃষ্টিহীন বা অর্থহীন – মোট কথা যথেষ্ট নৃত্যপদবাচ্য নয় তা প্রমাণ করবার ঠেলায় একসা। দর্শকরাও, বিশেষ করে যাঁরা নিয়মিত আর মার্গীয় নাচের ভাষায় যাঁদের রসিক বলে, অর্থাৎ যাঁরা এই কেচ্ছার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে পেশা ও আবেগগতভাবে যুক্ত বা যুক্ত বলে নিজেদের মনে করেন – যেমন আমি – প্রায়ই এই দলাদলির বাইরে থাকতে পারেননা, কারণ এক, ভারতীয় সংস্কৃতির সাথে গোষ্ঠীবাজি প্রায় স্বভাবগতভাবে জড়িত, আর দুই, নাচ, বা আরো সমগ্রভাবে বললে শরীরের গতি এক এমন বিরাট সমুদ্র, যে তার একপ্রস্ত নিয়মের শুধুমাত্র রস পেতে শিখতে শিখতেই একজন ব্যক্তিমানুষের এতটা সময়, চিন্তাভাবনা ও সর্বোপরি শক্তি ব্যয় হতে বাধ্য, যা একা দাঁড়িয়ে ম্যানেজ দেওয়ার মত কালাপাহাড় কমই জন্মান।

যা বলছিলাম, মার্গীয় নাচের বিনোদনী ভড়ং একাধারে

১. ভারতীয় ঐতিহ্যের অস্পষ্ট ছায়াবাজি (যদিও ক্লাসিকাল ফর্মগুলি পুরোপুরি ভিন্ন পটভূমি ও সময়ে সৃষ্টি হয়ে ভিন্ন নিয়ম, পরিবেশ ও ঘটনার ভিতর দিয়ে বেড়ে উঠেছে – তাও তাদের এক সাংস্কৃতিক ছাতার তলায় আনার চেষ্টা ভারতকে রাজনৈতিক ইন্টিগ্রেশনের পরাকাষ্ঠা বলে ঘোষণা করার মতই ঢপের);

২. ভারতীয় নারীত্বের একধরণের সংজ্ঞানির্ধারণ যা শাসনব্যবস্থায় ও বাণিজ্যে সুবিধাজনক (বুকে আঁচল, পাছায় মাস্ল্, চুলে ফুল, মুখে হাসি, চোখে সরল বিহ্বলতা, মস্তিষ্কে হিন্দুধর্মের মূল কাহিনীগুলির বিষয়ে জ্ঞান ও শ্রদ্ধা কচকচি আর হৃদয়ে যদিও মা দুর্গার মতন বল, আসলে মীনাকুমারির মত সদাসিক্ত নমনীয়তা, তার সাথে মাপমত মাতৃত্ব ইত্যাদি),

৩. রূপের সংজ্ঞানির্ধারণ (এইটে মহা গোলমেলে – স্টেজে উঠে কে কি রঙের ব্লাউজ পরল তাই নিয়ে কিচিরমিচির করেই সখীর দলের আদ্ধেক মেয়ে ম’ল),

৪. দেশপ্রেম ও দেশের অবান্তর সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্ব (যেকোনো জাতীয় বা আন্তর্জাতিক সভা-অনুষ্ঠানে – তা সে পশু চালান থেকে কমনওয়েলথ গেম থেকে হায়ার ম্যাথেমেটিক্স থেকে হোটেল উদঘাটন বা যাই হোক না কেন, দুটি -চারটি ঝলমলে কাপড় পরা মুখে রং মাখা মেয়ে – হারমোনিয়াম-ঘটম-টটম-কচু-ঘেঁচু কিছু না কিছুর সাথে পা মিলিয়ে বা না মিলিয়ে তাতা থৈ থৈ – কালচারাল রিলিফ); আবার

৫. পৌরাণিক পরম্পরা বজায় রেখেই কেমন দেশের সাংস্কৃতিক মেধা ও গবেষণার বিকাশ ঘটে তার বিজ্ঞাপন (যদৃচ্ছ মিক্স এন্ড ম্যাচ – আর ক’বছরে একবার রবীন্দ্রনাথ, আরেকবার কবীর আর আরেকবার তিরুভাল্লুভারের সাথে হাত ঘুর ঘুর নাড়ু) ইত্যাদি হাজার একটা জিনিসকে ঘাড়ে নিয়ে তুলোর বলদ হয়ে আছে।

তবে মার্গীয় নাচের বাজারে যেটা সবথেকে হেজে যাওয়া ফিচার সেটা হলো তার হিন্দু মিথোলজি ব্যাখ্যান। মানে যদি ধরে নিলাম গল্প বলাটাই লক্ষ্য (শরীর-টরির প্রবৃত্তি-টিত্তি কিছুক্ষণের জন্য ভাড়ে যাক) তাহলে সাহিত্য নিয়ে এত কথারই বা কি আছে – রবীন্দ্রনাথই বা কে আর দস্তয়েভস্কি পড়ারই বা দরকার কি, রোজ সকালবেলা নাকে তেল দিয়ে দুলে দুলে মচ্ছপুরাণ আর মুণ্ডুপোনিষদ পড়লেই হয় কড়াকিয়া-গণ্ডাকিয়ার মত। যদি রাজা-রাণী-রাক্ষস-দেবতার গল্পের ফাঁদ থেকে বেরোনো না-ই যায়, অন্ততঃ গল্পের বিষয় বা পরিবেশন আলাদারকম করার যে উৎসাহ, তাতে যদি গোড়াতেই ব্লাসফেমি কিংবা এঁড়ে পাকামি বলে জল ঢেলে দেওয়া হয় তাহলে একটা শিল্পের ইন্টেলেকচুয়াল অগ্রগতি যেমন হবার কথা ক্লাসিকাল নাচেও তেমনি হত। ভাগ্যক্রমে মানুষের বুদ্ধিকে তো কোনো ব্যাপারেই পুরোপুরি ঠেকিয়ে রাখা যায়না। তাই অনেক মার্গীয় নাচিয়েই তাঁর নিজের প্রশ্নগুলোর পিছনে হেঁটে হেঁটে নতুন পথ খুঁজে বার করেন। আমার দেখা বিখ্যাতদের মধ্যে ভরতনাট্যমে মৈথিলী প্রকাশ, ওডিসীতে সুরূপা সেন, মোহিনীআট্যমে নীনা প্রসাদ, কুডিয়াট্যমে মার্গী মধু, কত্থকে কুমুদিনী লাখিয়া, অদিতি মঙ্গলদাস, আকাশ ওদেদরা এবং আরো অনেকে এইধরণের বুদ্ধিমান, শক্তিশালী ডান্সার। এঁরা প্রথমত মার্গীয় নাচের ভেতরের শরীর ব্যাপারটাকে যথেষ্ট গুলে খেয়েছেন – ভালো ছবি তুলতে গেলে যেমন আলোর থিওরিটুকু অন্তত গুলে খেতে হয়। নাচের কস্ট্যুম একালের এসথেটিক ও কনভিনিয়েন্সমত পাল্টানোই শুধু নয়, এঁরা যেটা করেছেন শাদা বাংলায় তাকে ফর্ম ভাঙা বলে – বিনোদনকে বজায় রেখেই অবশ্য – কিন্তু কূপমণ্ডুকতা, শস্তা জনপ্রিয়তা আর বিনোদনের হাতের পুতুল হওয়ার বদলে বুদ্ধিমানের মত বিনোদনকে ব্যবহার করার জায়গাটাতে পৌঁছনোর কাজটা সহজ নয়। এখানে পাল্টানো মানে শুধু ধুতির জায়গায় জীন্স নয় – যেমন হয় তেমনই, কিন্তু ছিমছাম, শরীরের নড়াচড়ার প্রয়োজনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ – গুগল করে এঁদের ছবি-ভিডিও ইত্যাদি গতানুগতিক এনালগের পাশে ফেলে দেখলে হয়তো আরো ভালো বোঝা যাবে। এঁরাও গল্প বলেন, এমনকি পুরাকালের গল্পও – কিন্তু তাতে যে প্রশ্নগুলো তাঁরা দর্শকের সামনে রাখেন সেগুলো মুখস্থ বিদ্যার ধন নয়, বরং সেগুলো নিয়ে ভাবতে ভালো লাগে। যেমন নীনা প্রসাদের দ্রৌপদী এবং আরো কিছু কাজ যা লিঙ্গ ও নাচের শরীরী ভাষার সম্পর্ক নিয়ে কিছু কিছু প্রশ্ন তুলে ধরে। আবার অন্যধরণের গল্প নিয়ে অসম্ভব সুন্দর কিছু কাজ আমি নিজে দেখেছি – মার্গী মধুর ম্যাকবেথ দেখে যেমন গায়ে কাঁটা দেয় – অথচ ওই ইলাবরেট পোষাকের ভার, মুখে পুরু রঙের পরত, মাথায় ওই কেরালার টুরিজমের বিজ্ঞাপন স্টাইলের জাবদা মুকুট – কিন্তু কে বলবে গ্ল্যামেসের থেন নয় – এক্ষুনি ডানকানকে ছুরি মেরে এসে ত্রাসে বেপথুমান। কেউ কেউ আবার শরীরচালনার সূক্ষ্মতা ও সফিস্টিকেশন এমন একটা মোহময় উচ্চতায় নিয়ে যান যেখানে গল্পটা গৌণ – ভালো উদাহরণ হবে নৃত্যগ্রামের সুরূপা-বিজয়িনীর পরিবেশনাগুলি বা কুমুদিনী, মৈথিলীর কিছু কাজ, যেগুলো শুধুমাত্র চিন্তা-কৌশল ও শরীরি ভাষার স্মার্টনেসেই এত মডার্ন যে আর কোনো কথাই ওঠেনা। কেউ আবার তুলে ধরেন কথা ও কাহিনীর আওতার বাইরে মার্গীয় নাচের মধ্যে বিশুদ্ধ শরীর ও সে শরীর যে স্পেসে আছে তার ব্যকরণ ও প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা ও প্রশ্ন, যেমন অদিতি মঙ্গলদাসের ভাঙাভাঙা কথা ও নাচ মিলিয়ে কম্পোজিশন, যা শেষ হয় শুধু বিমূর্ত শব্দে – গাঢ় অন্ধকারে ক্রমশ দ্রুততর ও মৃদুতর ঘুঙুরের ঝংকারে। এইসব শিল্পীর কাজ ক্লাসিকাল হওয়া সত্ত্বেও কনটেম্পরারি।

মার্গীয় নাচের উপর ভিত্তি করে যাঁদের নাচের জগতে প্রবেশ, তাঁদের মধ্যে অনেকে আবার এই গল্প বলার মডেলের উপর নানারকম নতুন কাজ করতে চেষ্টা করেছেন। অনিরুদ্ধন বাসুদেবনের ‘বৃহন্নলা’ এইরকম একটা কাজ, যা একজন ট্রান্সজেণ্ডার নৃত্যশিল্পীর দৈনিক দ্বন্দ-বৈকল্যের গল্প তুলে ধরে আগাগোড়া খিল্লি করতে করতে; প্রীতি আত্রেয়া তাঁর ‘সুইট সরো’তে ব্যবহার করেন মার্গীয় নাচের মুদ্রা, কিন্তু তাঁর গল্পে উঠে আসে ম্যাজিক রিয়েলিজম – একটি মেয়ে যে তার এক খুব প্রিয়জন চলে যাওয়ার পর ছ’মাস একটা চেয়ারে বসে থাকে – তার মাথার ভিতর শব্দস্রোত ও তার অর্থস্রোত বয়ে চলে সম্পর্কহীন দুটি ভিন্ন গতিতে। রাজিকা পুরীর মত কেউ কেউ কথকতার কায়দাটি ফিরিয়ে এনেছেন মার্গীয় নৃত্যের ভাষা ব্যবহার করে। তাঁর নাচ-গল্পের আসরে গ্রীসের নাগরিক থেকে রামায়ণের চরিত্র সক্কলে উপস্থিত।

বিশুদ্ধ বা অশুদ্ধ ওয়েস্টার্ন নাচের প্র্যাকটিস বহুদিন থেকে জনপ্রিয়তা পেতে পেতে এখন আর বিদেশী মাল বলে গণ্য হয়না, তার কথা আপাতত থাক। তবে গোদের উপর বিস্ফোটক হলো ভারতীয় আঁতেল কনটেম্পরারি নাচের এক ঘূর্ণাবর্ত, যা নিজেই এক মহাকাব্য কারণ একদিকে এ যেমন সামগ্রিক আর্টি ফার্টি আবালবৃদ্ধবনিতার ইনপুট-আশ্রয়, তেমনি গু থেকে ভূ পর্যন্ত সকলই এর থ্রু-তে বিক্রয়যোগ্য। কনটেম্পরারি নাচ বাই ডেফিনিশন চিরহরিৎ হতে পারে, কিন্তু পুরনো চালও তো ভাতে বাড়ে। ফলে এর ভড়ং আরও ব্যপকভাবে বহুমুখী – বিশেষত যদি গর্মেন্ট খুশি হয়…। ঘটনাচক্রে, হালে গর্মেন্ট ভারতীয় কনটেম্পরারি নাচের উপর শুধু খুশি তা-ই নয়, খোদ সঙ্গীত নাটক একাডেমি থেকে কনটেম্পরারি নাচকে ‘নাচ’ বলে বরণ করে নেওয়া হয়েছে (ইসওয়ার উনকা ভালা করে)! তাই বিনোদন ব্যতিরেকে যে নাচিয়েরা নৃত্যশিল্প ও শরীরকে বোঝার গবেষণা করে থাকেন, তাঁদের কাজকর্মের কিছু সামান্য বেশি সুরাহা হলেও হয়ে উঠতে পারে।

বিনোদনী প্রবৃত্তির দায় শুধু শিল্পীর ঘাড়ে চাপিয়ে দিলেই কিন্তু ল্যাটা চুকে যায়না। যাঁরা নাচ দেখতে চাননা তাঁদের কথা আলদা, কিন্তু যাঁরা দেখতে চান, তাঁদেরও চিত্তশুদ্ধি, আত্মানুসন্ধান ও মর্মোপলব্ধি শিক্ষার – আজকাল যাকে বোধহয় আর্ট এপ্রিসিয়েশন কোর্স বলে – একটা সমান গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন থেকে যায়। শুনুন পেন্টিং প্রসঙ্গে কয়েক লাইন –

“The mirror was often used as a symbol of the vanity of women. The moralizing, however was mostly hypocritical. You painted a naked woman because you enjoyed looking at her, you put a mirror in her hand and you called the painting ‘Vanity’, then morally condemning the woman whose nakedness you depicted for your own pleasure. The real function of the mirror was otherwise. It was to make the woman connive in treating herself as, first and foremost, a sight.”

আমি বলিনি কিন্তু, জন বার্জার বলেছেন, ইয়ার্কি না।

এতক্ষণ নিন্দে করার আনন্দেই নিন্দে করছিলাম কারণ এই সবের কোনটাই ধ্রুব বা একমাত্র সত্য কিংবা পুরোপুরি এড়িয়ে চলা সম্ভব বা প্রয়োজন এমনটি নয়। তবু এর মধ্যেও যখন কিছু প্রকৃত নাচিয়ের অন্তর্জগতের একটি খণ্ড কোনো ফেস্টিভালের বদান্যতায় বা নেহাতই ঘটনাক্রমে চোখে পড়ে, তখন নাচ শেখা, বা নাচ বুঝতে ও ভাবতে শেখাটা সার্থক মনে হয়। তাঁরা সংখ্যায় কিছু কম নন – বিখ্যাত নৃত্যশিল্পীরা ছাড়াও – নিজের মত করে, নিজের কোণটিতে একা, কখনো স্টেজে না ওঠা বহু নাচিয়ের প্রবৃত্তি ও চিন্তাশক্তির দার্ঢ্য ও পরিচ্ছন্নতা বহু জনপ্রিয় পারফর্মারের নাক কেটে নিতে পারে – যা আমি ইনফর্মালি কোনো কোনো বন্ধু বা ছাত্রীর সাথে নাচ/আর্ট নিয়ে ভাট মারতে গিয়ে অনেকবার দেখেছি। অবশ্য কি ভাগাভাগির কথা বলছি! এদেশে নাচের কমিউনিটির আয়তনই বা কি! নাচিয়েসমাজ নিজেই তো কোণঠাসা এক অনস্তিত্ব। হাজার বিনোদন যুগিয়েও যাকে মানুষ আর পাঁচটা আর্টের জিনিসের মত ঘরে ঠাঁই দিয়ে উঠতে রাজি হয়নি।

খাব না মাথায় দেব

আর পাঁচটা আর্টের কথায় এটা বলতেই হয় যে আর্ট হিসেবে – সস্তা বা বলা ভালো সহজ বিনোদন হিসেবে নয় – যথার্থ আর্ট হিসেবে অন্যান্য শিল্পের তুলনায় নাচ কিছুটা ব্রাত্য। আবার একদিক থেকে সব মক্কেলই – যেমন এই মক্কেল বলছে – নাচ নিয়ে দুকথা বলে থাকেন বা বলতে পারেন এই বিশ্বাস পুষে রাখেন, কারণ শরীর নাড়ানো নিয়ে তো কথা, আর সেটা তো ভগবানপ্রদত্ত সকলেরই একটা না একটা আছে। তবে অন্যান্য শিল্পের চেয়ে নৃত্যশিল্পের মূল তফাতটা বোধহয় এইখানে যে শুদ্ধ শরীরশিল্প হিসেবে নাচের কোনো দীর্ঘসময়ব্যপী বা ঘর সাজানো মূল্য নেই চিত্র বা স্থাপত্যশিল্পের মত। এমনকি নাচ জিনিসটাকে মাছিমারার বিকল্প হিসেবেও ব্যবহার করা যায়না – গানের যেমন গুনগুন-মূল্য, ড্রয়িঙের ডুড্ল্-মূল্য – সময় কাটাতে। নেই কথাটা অবশ্য ভুল হলো – বাসে যেতে যেতে অনেকবার এই অবস্থায় পড়েছি , যে বাসশুদ্ধু লোক আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে কারণ আমি হয় অন্যমনস্ক হয়ে একটা জটিল মুদ্রা ধাতস্থ করছি নয় আরো কপাল খারাপ থাকলে মুখে একটা গদগদ এক্সপ্রেশন নিয়ে বসে আছি – কারণ মাথায় কিছু একটা অর্বাচীন কম্পোজিশন ঘুরছে; তবে ঠিক বহুস্বীকৃত মূল্য নেই বটে। এখন মূল্য নেই কেন, সেটা ভাববার বিষয়। সত্যি বলতে কি ঘরের বা অফিসের দেয়ালে একটা ল্যান্ডস্কেপ কি একটা মা কালীর পট বা একটা কান্ডিন্সকি নয় মিরোর ছবি টাঙিয়ে রাখাটা যদি একজন মানুষের কাছে কোনো এক বৌদ্ধিক, আত্মিক বা সামাজিক স্তরে প্রয়োজনীয় হয় (ল্যান্ডস্কেপে এবস্ট্রাক্শান বা মা কালীর ছবির মধ্যে যে সাররিয়েলিজম কিছু কম নেই – সেটা কনসেপচুয়াল আর্টের কুখ্যাত চেয়ারে পেছন না ঠেকিয়েও একরকম মালুম হয়), কিম্বা সাতসকালে আমীর খাঁ, দুপুরবেলা চন্দ্রবিন্দু, ভর সন্ধেয় ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা বা রবীন্দ্রজয়ন্তীতে পার্থ ঘোষ-গৌরী ঘোষ না শুনলে (যাঁদের শিল্পকর্মের মিডিয়াম মস্তিষ্ক ও কন্ঠ – যারা দুইই শরীরের অঙ্গ বটে, কিন্তু আর পাঁচটা অঙ্গের থেকে সভ্যসমাজে বেশি ভাও পেয়ে থাকে) যাঁদের পেটের ভাত হজম হয়না, তাঁরা কেন যামিনী কৃষ্ণমূর্তি দিয়ে দিন শুরু করে মার্স কানিংহ্যামে থামবেননা, সেটা স্পষ্ট নয়। এমন মানুষ নেই তাও নয়, কিন্তু অন্যান্য আর্ট-সমঝদারের তুলনায় তাঁদের সংখ্যা কম। নাচ দেখতে গিয়ে ঘুম পেয়ে যায় এমন একাধিক আর্ট-সমঝদারকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি। এক তো হলো স্বভাব, বা যাকে বলে ন্যাক। কিন্তু এর মধ্যে হয়ত আরো একটু ব্যাপার আছে। এইখান থেকে শুরু করে আমি মোটামুটিভাবে শহুরে আধুনিক নাচ নিয়েই কথা বলব; মার্গীয় নাচ নিয়ে আলোচনার ইতোমধ্যেই বাড়াবাড়ি আর লোকনৃত্যে আমার জ্ঞান একে খুব কম, স্কুলে পড়তে কিছু ফেক লোকগীতির সাথে মাথায় পাগড়ি বা খাটো শাড়ি পরে ফেক ধিতাং ধিতাং করা ছাড়া, তাও যেটুকু যা সেবিষয়ে বলার আছে, সেটা পরের দিকে বলার চেষ্টা করব।

আমার নিজের যেটা মনে হয়, স্বশরীর বিষয়ে মানুষের একটা স্বাভাবিক প্রত্যয়, যেটার কথা এক্ষুনি আগেও একবার বললাম, মানুষের নাচ – একটি বিশেষ বস্তু হিসেবে – উপভোগ করার ব্যাপারে একটা স্বাভাবিক বাধা তৈরী করে। নাচের যে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি মুভমেন্ট-সম্পর্কিত – অর্থাৎ অবিনোদনমূলক নাচ, যাতে ট্রিক নেই, গবেষণা আছে – সেটা কল খুলছে-বাল্ব জ্বলছে জাতীয় একটা হাসাহাসির ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। আবার অন্যদিকে ভারতে শরীর একটি ট্যাবুবিশেষ। পাশ্চাত্যে এটা খানিকটা অন্যরকম বলেই পাশ্চাত্য নাচের ক্ষেত্রে এই আলোচনাও অন্যরকম হবে – অন্তত সমসাময়িক শহুরে নাচের ক্ষেত্রে সংখ্যাগতভাবে আলোচনার বিষয়বস্তুর বিস্তারটা অনেক বেশি হবে এর চেয়ে। সে কথায় যাচ্ছিনা। আসলে শুধু সামাজিক ট্যাবু বলে ছেড়ে দিলে কম বলা হয়, ব্যাপারটা তার চেয়ে জটিল – মানুষ এমনিতেই তার ব্যক্তিত্বের প্রকাশের ব্যাপারে তার শরীরের উপর নির্ভরশীল – রোজকার কথাবার্তায় হাজার এক ধরণের হাত-মাথা-মুখ-চোখ-ভুরু নাড়া বোধহয় এদেশে কিছু বেশিরকম ভাবেই ঘটে। তাই একদিকে সে তার মগজ দিয়ে শরীর কি করছে না করছে এবিষয়ে সর্বদা কড়া নজর রাখার চেষ্টা করে, আবার অন্যদিকে সভ্যসমাজে (‘সভ্য’ কথাটা বারবার বলছি বটে – তবে সদগুণগতভাবে বলছিনা) শরীরসর্বস্ব বলে পরিচিত হবার যে ভয়, যেটা ওই মস্তিষ্কের সামাজিক ভাও-এর ব্যাপারেও উল্লেখ করেছিলাম, তাকে এবিষয়ে ভাবতে ডিসকারেজ করে। বেশি কুস্তি করলে বুদ্ধি কমে যায় এটা তো আমাদের একটা জনপ্রিয় ধারণা – ফলে বিজ্ঞানী টিজ্ঞানী ছেড়েই দিচ্ছি মায় কবি-লেখকের বুদ্ধি আছে এটা হয় স্বতঃসিদ্ধ আর ডান্সার-অভিনেতাকে এটা ক্রমাগত প্রমাণ করে যেতে হয় – সেই বার্নার্ড শ আর মেরিলিন মনরো না কার গল্প আর কি। তবে এই সবকিছুর মাথায় রাজা হয়ে আছে শরীর বিষয়ে জনগণের ছুঁতমার্গ, অর্থাৎ কিভাবে নড়ছের থেকে কি নড়ছে সেটাই তখন বড় হয়ে দাঁড়ায়।

যেকোনো বিষয় গভীরভাবে বুঝতে গেলে গোড়ায় তাকে বাইরের আর পাঁচটা জিনিসের থেকে আলাদা ভাবে দেখতে পারলে সুবিধা হয় বলে আমার মনে হয়। ধরা যাক পেঁচি বাঙালের মেয়ে আমি বুঝতে চাই মোগলাই পরোটা কিকরে রাঁধে, তা আমি যদি ঠাকুমা-দিদিমা-বাবুর্চি বা রান্নার বই কিছুই না মেনে বিশুদ্ধ মানবিক অনুভবশক্তি দিয়ে হরিয়ানার গমচাষীদের দুঃখদুর্দশা থেকে শুরু করে পোল্ট্রির মুরগিদের প্রতি মালিকশ্রেণীর অত্যাচার আর পেয়াঁজের মূল্যবৃদ্ধি ছুঁয়ে শেষে কেন আমিই এই রেসিপিটা শিখব আর দাদা ইজিচেয়ারে বসে ঠ্যাং দুলিয়ে দুলিয়ে কাগজ পড়বে ইত্যাব্দি পুরো চিত্রপটটা সমঝে নিতে চাই তাতে মানব ও মুরগিসভ্যতার বিস্তর উপকার হতে পারে, মোগলাই পরোটা খেতে পাবার সম্ভাবনা কম। অর্জুনের পাখির চোখের গপ্পটা নেহাত ফ্যালনা নয়।

কনটেম্পরারি নাচের, বা সত্যি বলতে কি কনটেম্পরারি আর্টের যে জিনিসটা আমার সবচাইতে বেশি আকর্ষণীয় মনে হয় তা হলো এর বিশুদ্ধ গাণিতিক গবেষণাধর্মিতা। পিওর ম্যাথেমেটিক্স নিয়ে রিসার্চ জিনিসটা মোটামুটিভাবে এই পথে চলে – গোড়ায় একটা প্রয়োগগত প্রশ্ন থাকে – যেটা মূলত ফিজিক্স বা বায়োলজি বা এপ্লায়েড অঙ্ক – এইধরণের কোনো একটা জায়গা থেকে আসে – সেই প্রয়োগের কোনো একটা সমস্যাকে কেন্দ্র করে। অঙ্কের প্রধান কাজটা হয় এই সমস্যার একটা সাধারণ সংজ্ঞা দেওয়া – অর্থাৎ একটা কনজেকচার তৈরী করা যা ওই একইধরণের সব সমস্যার সমাধান করবে, এবং ওই কনজেকচারকে প্রমাণ বা অপ্রমাণ করা – থিওরেম প্রুভ বা ডিসপ্রুভ। এবারে এটা করতে গিয়ে যে থিওরেম যত বেশি সংখ্যার প্রয়োগমূলক প্রশ্নকে এক ছাতার তলায় এনে সমাধান করতে পারবে, তার দর তত বেশি। সাধারণত অঙ্কে এই ‘দরে’র প্রশ্নটা কিছু গৌণ, প্রয়োগটাও সবসময় বাংলা বাজারে প্রয়োগ বলতে যেমন আলু-পটল বোঝায় তেমনটা না হতে পারে, কিন্তু এই যে বহু জিনিসকে এক ক্যাটেগরির মধ্যে দেখার মজা – এটা করতে গিয়ে অনেকসময়ই অঙ্কের নানান স্রোত একসাথে মিশে যায়। কাব্যি করে বললে – একটা প্রশ্ন ভেসে উঠলো হয়ত রৈখিক কার্যকারকের মহাসমুদ্রে, আর সেটার উত্তর বেরোলো গিয়ে বীজগাণিতিক জ্যামিতির চড়ায় উঠে। এইসব করতে করতে অঙ্ক যা করে তা হলো আরো হতে আরো এক সাধারণ প্রশ্ন খুঁজে বার করা, যাতে প্রযোজ্য বস্তুর উপরে পূর্বনির্ধারিত স্ট্রাকচারের সংখ্যা ক্রমশ কমতে থাকে। মানে ধরা যাক কিছু একটা থিওরি প্রমাণ হলো এক বেটা বাঘের জন্য; তখন দেখা হবে সেটা কি যেকোনো বেড়াল জাতীয় জীবের জন্যেও সত্যি? যদি তা হয়, তবে সে কি যেকোনো চারপেয়ে জন্তু, আর তারপর যেকোনো চারপেয়ে জিনিস – মায় চেয়ার-টেবিল-খাটের জন্যেও সত্যি নাকি না – এইভাবে চলতে থাকে। এইধরণের জেনারালাইজেশন আর আনচার্র্টেড প্রবাহে উত্তরণের ঔদার্য বা ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা না থাকলে তখন এই আমার মত ক্যালানে গবেষক হয়।

কনটেম্পরারি নাচে ঠিক যেন এই ঘটনার প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। যদি ধরি লোকনৃত্য আর মার্গীয় নৃত্য নাচের গোড়া বেঁধে দিয়েছে; প্রয়োগ – বিনোদন (ক্রমানুসারে – লোকসাধারণের বিনোদন ও ব্রাহ্মন-ক্ষত্রিয় আর পরবর্তী কালে জাতে ওঠা বৈশ্যের বিনোদন), তবে এখানে প্রশ্ন হতে পারে – বিনোদনই কি সব? বা রূপই কি সব? বা আরও নানা প্রশ্ন যা নিয়ে এতক্ষণ কথা হচ্ছিল। এখানে স্ট্রাকচার হিসেবে ধরে নেওয়া যায় রূপসজ্জা, কাহিনিধর্মিতা, বিনোদন, লিঙ্গভেদ, মুদ্রাব্যবহার, অভিনয়ব্যবহার, বর্ণব্যবহার, বাদ্যব্যবহার, গীতব্যবহার এমনকি শব্দব্যবহার ও আরো বহু বিষয়কে, যারা ক্রমশই দেখা যাচ্ছে নাচিয়ের শরীরসাধনার সাথে চাইলেই সম্পর্কবিযুক্ত। আবার আধুনিক শিল্পে শুধু নৃত্য-গীত-বাদ্যের চিরাচরিত মিক্স এণ্ড ম্যাচ নয়, একেকটি শিল্পকলার গঠনশৈলীর গভীরে গিয়ে তাদের কোলাবরেশন ঘটানোর যে চেষ্টা – যেমন ডান্স-থিয়েটার বা সাহিত্য, চিত্র-স্থাপত্যশিল্প, আলোকশিল্প বা চলচ্চিত্রশিল্পের সাথে নাচ বা সঙ্গীতের সম্পর্ক – এ হলো নানা স্রোতের মিলন, যাদের আগে যতটা আলাদা বলে ঠেকত, এখন আর তেমন ঠেকছেনা। এই একের পর এক এট্রিবিউট বাদ দিয়ে বিশুদ্ধ নাচ জিনিসটাকে দেখার ব্যাপারটাকে আমি বিসর্জন আর এই নানান অন্যান্য বিষয়ের সাথে কোলাবরেশনের ব্যাপারটাকে আবাহন বলছি সহজে রেফার করার জন্য।

এবারে কিছু উদাহরণ না দিলে ব্যাপারটা বড্ড খটমট হয়ে উঠছে। কিন্তু তার আগে একটা সময়োচিত কোটেশন দিয়ে রাখি, মার্গীয়পক্ষের বা আধুনিকপক্ষের বা কোনো পক্ষের না হয়েও এতখানি অর্বাচীনতা সহ্য করতে না পেরে কেউ যদি খাঁড়ায় শান দিতে বসে থাকেন, তিনি যাতে আরো খানিক্ষণের জন্য কেসটা মুলতবি রাখেন। আমরা বাঙালি জাতি রচনা লিখতে গেলে গুরুবাক্য বড় পছন্দ করি। এ আবার যেমন তেমন গুরু নয়, খোদ শিল্পাচার্য্য অবন ঠাকুর –

”নাচের ধারার ইতিহাস এবং নাচের নানা কৌশলের পরিষ্কার ধারণা না নিয়েও নাচতে পারা যায় সত্য; কিন্তু শুধু সেই কারণে নৃত্য সম্বন্ধে প্রাচীন কালের নির্দেশ সম্বন্ধে অন্ধ থাকতে হবে এমন কথা নাই। প্রাচীনের যোগসূত্র অমান্য করে নতুন করতে যাওয়ার হাস্যকর ব্যাপারের সৃষ্টি যেমন অসম্ভব নয়, তেমনি প্রাচীন প্রথা ধরে আজ নাচতে গেলে একটা কৃত্রিমতার গহ্বরে সেঁধিয়ে যাওয়াও আশ্চর্য্য নয় – এই বুঝে যে সব নট শাস্ত্রচর্চা ক’রে নিজেদের অতীত বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ দৃষ্টি প্রখর ক’রে তোলেন, তাঁরাই সফলতা লাভ করেন নৃত্যকলায়।”

অর্থাৎ ব্যালেন্সটাই আসল।

আবাহন

খামোখা দুটি আর্ট ফর্মকে মেশাবার প্রয়োজন কি? অর্থাৎ কোলাবরেশন কেন, এই প্রশ্নের উত্তর নিশ্চয় একেকজন শিল্পী বা শিল্পীদল একেকভাবে দেবেন। একটা কারণ তো পরিষ্কার – মার্গীয় ধারণায় নাচের ভিত্তির দুটি বড় প্রস্তর হলো গিয়ে সুর ও তালজ্ঞান। তাই সঙ্গীত ও বাদ্যের সাথে কোলাবরেশনের প্রয়োজনীয়তা প্রাচীন। নৃত্যের আদিকাল থেকেই নর্তককুল তাই পরমুখাপেক্ষী হয়ে আছেন। এই হালে এসে তাঁদের একরকমের স্বাধীন ভাব জেগেছে – সেকথায় আবার পরে আসব। ওদিকে আবার যেহেতু বিনোদন ও বেশ্যাবৃত্তি নাচ শিল্পটির সাথে অঙ্গাঙ্গী যুক্ত ছিল, তাই চৌষট্টি কলা শিক্ষার মধ্যে দিয়ে কোলাবরেশন নাচের পুরনো সঙ্গী। এর উপর আমার নিজের যেটা মনে হয়, ওই যে উপরে বলেছিলাম শিল্পীজীবনের উত্তরণ ও তার জেনিথ, সেদিক থেকে দেখতে গেলে নৃত্যক্ষেত্রে এই বিভিন্ন শিল্পের আবাহন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। প্রতি শিল্পীর একটি সহজাত ভঙ্গী থাকে তাঁর শিল্প প্রকাশ করার ব্যাপারে। এই সহজাত ভাবটি নষ্ট হয়না, বয়েস আর অসুখ মানুষের শরীর থেকে নাচের আর সব কেড়ে নিতে পারে, এই ভঙ্গীটি পারেনা। কলামণ্ডলম গোপীর নাচ দেখেছেন? অত্যন্ত দরিদ্রঘরের ছেলে, আজ জগদ্বিখ্যাত কথাকলি শিল্পী। বৃদ্ধ আর তেমন দাপটের সাথে নাচতে পারেননা, পারেননা দম ধরে রাখতে। অথচ তিনি যখন নল-দময়ন্তী পালার রাজা সেজে দময়ন্তীর কেশবর্ণনা করেন, এখনো সর্বাঙ্গে কাঁটা দিয়ে ওঠে। আরেক মার্গীয় নাচিয়েকে চিনতাম – মুখেচোখে গল্প বলার সম্রাজ্ঞী। বয়েস ও জীবন তাঁর শরীরকে শিথিল ও মস্তিষ্ককে জটিল করে তুলেছে। কিন্তু তাঁর সেই স্বপ্রকাশভঙ্গীর জায়গাটিতে তিনি ঈশ্বর। একদিন তাঁর ক্লাসে গেছি, তা ক্লাসের বাইরে দু-তিনটি শীর্ণ কুকুর সম্বর-রসম-ভাতের আশায় রোজ ঘোরাঘুরি করত। সেদিন বোধহয় তাঁর চোখে পড়েছে। আমার কুকুরপ্রেমী বলে একটু বদনাম ছিল, তাই তিনি আমায় বলছেন – ওই দেখো বাইরে তোমার কেলে বন্ধুটি খাবারের আশায় দাঁড়িয়ে আছে, আর জানো আমায় দেখেই কিভাবে মুখটি তুলে একবার এদিক একবার ওদিক করে তাকিয়ে … তিনি বলছেন, আর বিশ্বাস করুন শিল্পীর ফর্সা গোল দুগ্গাঠাকুরের মত ত্রস্ত মুখটিতে তখন অবিকল কালু কুকুরের ছবি – আলাদা করা যায়না। পিনা বাউশের উপর করা একটি ডকুমেন্টারি যদি দেখেন, দেখবেন শিল্পী কথা বলছেন একটা কফি টেবিলে বসে, আর ক্যামেরা ফোকাস করেছে তাঁর হাতদুটির উপর। হাতের পাতাদুটি অনর্গল টেবিলের নীচে একটি সমান্তরাল কথোপকথনে সৃষ্টি করে চলেছে গতি, যা তাঁর কথাবার্তার সাথে আপাতভাবে সম্পর্কবিরহিত – যেন তাঁর শরীরের এক স্বাধীন চিন্তাভঙ্গী। শিল্পী সেই সহজাত ভঙ্গী খুঁজে পাওয়ার এবং তাতে ব্যুৎপত্তি লাভ করার পরে যদি আশা করা হয় যে তিনি এবার তাঁর শিল্পবক্তব্য প্রকাশের আরেকটি আনকোরা নতুন সহজাত ভঙ্গী খুঁজে বার করবেন, তাতে পুরো জিনিসটার স্বাভাবিকত্ব চলে যাবার একটা আশংকা থেকে যায় না কি? বক্তব্য বলতে – নতুন এজেণ্ডা খুঁজে পাওয়ার চ্যালেঞ্জটা নেওয়া যায় – কিন্তু একই ফর্মের ভিতর নতুন প্রকাশভঙ্গী খুঁজে পাওয়াটা প্রায় অসম্ভব বলে ঠেকছে। অথচ বহু মহৎ শিল্পীর জীবনেই যেটা ঘটে থাকে তা হলো এক অন্য শিল্পপথের আবিষ্কার এবং তখন তাঁর প্রকাশক্ষমতাকে সেই নতুন পথে চালনা করা। রবীন্দ্রনাথকে দেখুন গানে, গান থেকে নাচে, থিয়েটারে, রঙে। তারপর ধরুন চন্দ্রলেখা – নাচ ও শরীরভাবনা থেকে ভাস্কর্য্য, চিত্রশিল্প, আবার সেসবের থেকে সমাজভাবনা, লেখা। নাচের ব্যাপারে এদেশীয় না হলেও একটা সহজ উদাহরণ মাইকেল জ্যাকসন – ছিলেন গানের লোক, জনপ্রিয়তার একটা স্যাচুরেশনে পৌঁছে যেতেই বুদ্ধি করে মঞ্চে প্রবর্তন করলেন নাচ, যা হলো ঠিক যেন তাঁর গানেরই আরেক প্রকাশ, আর কি নাচই নাচলেন বলুন! এই শিল্পীসত্বার বহুধা প্রকাশের বিষয়টির পিছনে যে এক্সপেরিমেন্টেশন – জ্ঞানত হোক বা অজ্ঞানত – তার আরেক নাম কোলাবরেশন।

কনটেম্পরারি নাচের ব্যাপারে আমার প্রথম অভিজ্ঞতা কলকাতার উদয়নে। আমাদের ক্লাসটা গড়িয়াহাটের মূল ক্যাম্পাসে না হওয়ায় মমতাশংকরের চেয়েও শিক্ষক হিসেবে আমরা বেশি কাছে পেয়েছিলাম সুস্মিতা নন্দীকে। ওখানে শেখার আগে আমার নাচ ছিল অনেকটাই পরমুখাপেক্ষী – নাচের বিষয়ে চিন্তা ছিলনা তেমন কিছু – তাই উদয়নের ওই সাড়ে চার বছর নাচিয়ে বা নিদেনপক্ষে নৃত্যরসিক হিসেবে আমার ঋণ অসীম। বিশেষ করে এখন শুনতে তেমন কিছু মনে না হলেও ওই যে টানা টানা চোখ আর তেলাকুচো ফলের মত ঠোঁট না বানিয়ে শুদ্ধু নাক-মুখ একটুখানি হাইলাইট করে নিয়েই মঞ্চে উঠে পড়া যায়, আর একেকজন নৃত্যশিল্পীর বিশেষ ঢং নয়, বরং মঞ্চের সমস্ত নাচিয়েকে সামগ্রিকভাবে একটি দেহ হিসেবে কল্পনা করে নিতে পারলেই নাচটা উতরোয় বেশি ভালো – নাচিয়ের ব্যক্তিগত কোণ থেকে তাঁকে ও দর্শককে টেনে বার করে একটি বিশালত্বের মাঝে এনে ফেলে – এই উপলব্ধিটাই তখন অনেক ছিল। তবে উদয়নে শেখার সময় হিসেব করতে গেলে আমি কম দিনই ছিলাম – এডভান্স কোর্সে উঠতে না উঠতেই তো তখন সদ্য সদ্য ইউনিভার্সিটিতে ঢুকে পাখা গজালো, প্রেম করতে, গাঁজা-টাজা খেতে শুরু করে সাময়িকভাবে দেহপট-ফট সমেত সব জলাঞ্জলি গেল। তো সেইসব মিলিয়েই হয়তো উদয়নের শিক্ষাবিস্তার থেকে আমি কোরিওগ্রাফির রকমবাহার ছাড়া তত কিছু শিখিনি – না ভুল বললাম – নাচ জিনিসটা যে শুধু শরীরে নয়, মাথাতেও ঘটে, সত্যি বলতে কি মাথাতেই ঘটে – কিন্তু শরীরের সাথে মাথার একটা সর্বক্ষণের যোগাযোগ বা কনভার্সেশন চালু থাকতে হয়, এটাও উদয়নের ক্লাসগুলিতে সেই যে দেয়ালের দিকে ফিরে চোখ বুজে আড়চোখে অন্যরা কি করছে সেসব না দেখে নাচ ভাবার এক্সারসাইজ তার ভিতর দিয়েই প্রথম ফর্মালি শিখেছিলাম। যাই হোক যা বলছিলাম নাচের ডেকোরেটিভ দিক বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে আমার অনুভব খানিকটা ম্যাচিওর করলেও আর্টে বা নাচে প্রথমে মিনিমালিজ্ম ও পরে অন্যান্য আর্ট ফর্মের সাথে কোলাবরেশন নিয়ে ভাবনাগুলো এসেছে আর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে অনেক পরে, আর এবাবদে আমি চেন্নাইয়ের বেসমেন্ট ২১ গ্রুপটির কাছে – বিশেষত পদ্মিনী চেত্তুর, প্রীতি আত্রেয়া, অনুশকা কুরিয়েন, অখিলা ভিরালি প্রমুখ নাচিয়ের কাছে কৃতজ্ঞ। তাই উদাহরণের বেশিরভাগটা হয়তো আসবে চেন্নাইয়ে দেখা কিছু প্রোডাকশন থেকে। তবে শুরুটা করছি দিল্লিতে দেখা ‘গতি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা-শিল্পী মনদীপ রাইখির ‘ইনহ্যাবিটেড জিওমেট্রি’ নিয়ে।

নাচে ভিশুয়াল মিডিয়া, আলো আর আর্কিটেকচারের (স্পেস অর্থে) ব্যবহার তো এখন এতই সাধারণ একটা ব্যাপার যে খুঁজলে কাঁড়ি কাঁড়ি উদাহরণ বেরোবে, এক্ষুনি যে মনদীপের নাচটার কথা মনে পড়ছে তার কারণ এটা একদম হালে দেখেছি – এবছরই নেমেছে। প্রোডাকশনটির গুরুত্ব এখানেও যে তা ক্লাসিকাল ও কন্টেম্পরারি ফর্মের মুড ও স্পেসের তুলনামূলক জায়গাটা ধরতে চেয়েছে। অবশ্য প্রেসে যাকে বলে – ভরতনাট্যম আর ওয়েস্টার্নের অর্গ্যানিক ফিউশন থুড়ি একাডেমিক কম্বিনেশন – সেটা আমার কখনই তত হাতিঘোড়া কিছু মনে হয়না। তবে এখানে শুধু চিন্তাটার গুণই গাইছি – জার্মান মিডিয়া আর্টিস্ট ক্রিস জিগারের সাহায্যে আলোছায়ার নানা জ্যামিতিতে ও তাঁর ডান্সারদের শরীর ব্যবহার করে মনদীপ মঞ্চে তৈরী করেন অনেকগুলি খোপ যা বারবার ভেঙে যায় ও পুনর্সৃষ্ট হয়, যা হয়তো দেখায় একজন ক্লাসিকাল টু কনটেম্পরারি নাচিয়ের মনোজগতে টেকনিক আর ফিলোসফির যে পার্টিশনিং প্রয়োজন তাকে, আবার দেখায় একেকজন নাচিয়ের আইসোলেটেড অস্তিত্বকে, যেটা আরো পরিস্ফুট হয় মঞ্চের প্রেক্ষাপটে বড় স্ক্রিনে শাদাকালো ভিডিওটির মধ্যে দিয়ে – ছাদের শ্যাওলা ধরা কোণে, ভাঙাচোরা বাড়ির পিছনের উঠোনে – এরকম নানা জায়গায় একেকটি ডান্সারের শরীরের ইনস্টলেশনে। জিগারের স্থাপত্যশিল্পের ব্যাকগ্রাউণ্ড এই সৃষ্টির পিছনে এইরকম অনেকভাবে পরিষ্কার ছাপ ফেলে গেছে। ভিডিওগ্রাফি ও নাচ বিষয়ে পুরনোদিনের কথায় উদয়শংকরের ‘কল্পনা’ সিনেমাটির কথা মনে পড়ছে। সেটি একটি বেশ ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা। বেশি কথার থেকে সেটা গুগলে খুঁজে পেতে দেখে নেওয়া ভালো।

নাচের সাথে নাচের কোলাবরেশন – বিভিন্ন বাজে ফিউশনের মধ্যে দিয়ে অনেকদিনই ঘটে আসছে। কিন্তু এই পদ্ধতির সবচেয়ে সুন্দর অর্গ্যানিক ব্যবহার দেখেছি ওডিসী-কত্থক-ভরতনাট্যম-কথাকলি-মেড-ইন-ইণ্ডিয়া বা লক-পপ-হিপ-হপ-ভরতনাট্যম বা এমনকি অনিতা-রত্নমের সিম্পলিফায়েড-ভরতনাট্যম কি মনদীপ-টাইপ লাবান-কত্থক-ভরতনাট্যমেও নয়, রবীন্দ্রনৃত্যে। রবীন্দ্রনৃত্য নিয়ে আজ যতই আমরা হাত ঘুরঘুর রঙ্গরসিকতা করি, পঁচিশে বৈশাখ ঘরে-বাইরে-উঠোনে হঠাৎ একটি নাচ দেখে কি কেউ বুকে হাত রেখে বলতে পারবে বা চাইবে, যে ওই স্টেপটা মণিপুরী থেকে টোকা, ওইটে জাভার নাচে দেখেছি কিম্বা এ তো পাতি মোহিনীআট্যম! নানান নাচের ও কথার মিলন ও এমন চমৎকার সহজ আত্মীকরণ – যা এখন পুরোপুরি একটি ইন্ডাস্ট্রির রূপ নিয়েছে – তার পিছনে একটি অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও আর্টিস্টিক নাচিয়ে-মাথা না থাকলে এ সম্ভব হতনা। উদয়শংকর তাঁর কাজে নানা স্টাইলের সুন্দর মিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন। বছর দুই আগে নৃত্যগ্রামের ওডিসী আর শ্রীলঙ্কার চিত্রসেনা ডান্স কোম্পানির কাণ্ডিয়ান নাচের কোলাবরেশন, রিদমোজাইকের কত্থক-জ্যাজ কম্বিনেশন দেখে আনন্দ পেয়েছিলাম, কিন্তু সেগুলি কম্বিনেশনই – মজা, খাপে খাপ নয়।

মনোবিজ্ঞান আর সমাজবিজ্ঞান – বিশেষত লিঙ্গপ্রসঙ্গ বহু নৃত্যশিল্পীর কাজেই ফিরে ফিরে আসে – এও একধরণের কোলাবরেশন বটে। বহু ছোটবেলায় দেখা – তখনো মেয়েদের সামাজিক অবস্থান, দুঃখকষ্ট নিয়ে এত ভুরি ভুরি কাজ হতনা – শাশ্বতী সেনের কত্থক কম্পোজিশনের ভেতর দিয়ে পণপ্রথা নিয়ে তোলা প্রশ্নের রূপ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম মনে আছে। রঞ্জাবতীর নাচ দুর্ভাগ্যক্রমে আমার সামনে থেকে দেখার সুযোগ হয়নি, কিন্তু মনে হয় সামাজিক ও আত্মিক প্রশ্নের ব্যাপারে তাঁর চিন্তা ছিল গভীর। লিঙ্গ ও যৌনতা নিয়ে চন্দ্রলেখার নানা কাজ নাচের ক্ষেত্রে এবাবদে একটা বড় জায়গা নিয়ে আছে। বিশেষত ‘শরীর’ যেটা আমি নিজে দেখেছি চন্দ্রলেখার প্রাক্তন বাসভবন – যার একটি অংশ এখন প্রচলিত অডিটোরিয়াম ও মিউজিয়াম – সেই ‘স্পেসেজ’-এ তিশানি দোশি আর শাজি জনের পারফরমেন্সে। তিশানি কিন্তু আখেরে কবি আর শাজি কলেরিপায়াট্টুর গুরু। একজন কবির শরীর আর একজন মার্শাল আর্টিস্টের শরীর একটি ছন্দে বা একটি নিয়ম ধরে যে স্টেটমেন্ট তৈরী করে, ধরা যাক একজন বিশুদ্ধ ডান্সার আর একজন আর্কিটেক্টের শরীর সেই একই নিয়মে গতিশীল হয়েও কি সেই একই স্টেটমেন্ট তৈরী করবে, নাকি আলাদা? অবশ্য বিশুদ্ধ ডান্সারের শরীর বলে যে কিছু নেই, সেটাই এইসব কোলাবরেটিভ কাজগুলোর মধ্যে দিয়ে ক্রমশ যেন আরো বেশি করে ফুটে উঠছে।

পদ্মিনী চেত্তুরের কাজ অনেক বেশি শুদ্ধ শরীরধর্মী, যে শরীর পুরুষ বা নারীর নয়, শুধু হাড়-মাস্ল্-মস্তিষ্কের আধার, যাতে ইমোশন গৌণ – প্রায় লুকিয়ে থাকে। কোলাবরেশনের প্রশ্নে পদ্মিনীর কাজে বিশেষভাবে আসে শব্দের ব্যবহার – শব্দ বলতে আমি নৈঃশব্দও বোঝাচ্ছি। স্যাক্সোফোন প্লেয়ার তথা কম্পোজার মার্টেন ভিসারের সৃষ্ট আপাতভাবে মাধুর্য্যহীন কর্কশ মেটালিক শব্দের খেলা – বিশেষ করে ‘পেপার ডল’, ‘পুশ্ড্’ ইত্যাদি নাচে ব্যপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, যা কাগুজে পরচালিত যন্ত্রশরীরগুলির পৌত্তলিক নড়াচড়াকে হাইলাইট করেছে। আবার ‘ওয়াল ডান্সিং’-এর দীর্ঘ ঘন্টাব্যপী শব্দহীনতা নাচিয়ে ও দর্শক উভয়ের মনকেই সম্পূর্ণ শরীর ও স্পেসমুখী (ব্যক্তিভেদে ঘুমন্ত) করে তুলতে সাহায্য করে। অখিলার ‘কাউন্টার’-এ নাচের পুরো বারো-তেরো মিনিট জুড়েই চলে পুরনো মরচে পড়া ঘড়ির মত বীট, যা কখনো কখনো ওই বুড়ো ঘড়ির মতই স্ব-ইচ্ছায় একটু স্লো হয়ে পড়ে বা হঠাতই আবার তড়িঘড়ি বেগ তোলে। অখিলার এই প্রোডাকশনটির বক্তব্য ছিল একজন নৃত্যশিল্পী ও একইসাথে একজন পেশাদার সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে তাঁর শিল্পীসত্ত্বার বিভাজন, তাই দুজন ডান্সার যাঁরা এই নাচটি দেখান, তাঁরা এমনভাবে নড়াচড়া করেন যেন তাঁরা একটিই মস্তিষ্কের দুটি অংশ – মাল্টিটাস্কিংরত, কিন্তু এক সুতোয় বাঁধা। সেই দ্বৈত-অস্তিত্বের টানাপোড়েন ও দ্বৈত-শিল্পের জন্য যে প্রতি মুহূর্তের প্রাণপন টাইম-ম্যানেজমেন্ট – এই একটা গেল গেল ধর ধর ভাব – কতকটা যেন স্লো-মোশনে চাচী ৪২০-এ কমল হাসনের ”দৌড়া দৌড়া ভাগা ভাগা সা” – এটাই উঠে আসে দুটি শরীরের গতি ও ক্রমাগত চলমান যন্ত্রধ্বনি থেকে।

পদ্মিনীর বা আরও কিচ্ছু কোরিওগ্রাফারের কাজের এই সম্পূর্ণ অকাহিনিধর্মিতা – বিশেষত দৈনন্দিন জীবনের সাথে সম্পর্কবিযুক্ততা নিয়ে নানা প্রশ্ন তোলা যায়। যাই হোক এইধরণের বিশুদ্ধ শরীরধর্মী কাজ নিয়ে পরে আবার আরেকটু বিস্তারিত বলব। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে এইসমস্ত কাজের সার্থকতা খুঁজে পাই এইখানে যে ভালো হোক, মন্দ হোক, অন্তত গবেষণাটা তো চালু আছে – মার্গীয় নৃত্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে যেমন বদ্ধ জল হয়ে আছে, তার বিপরীতে। তাছাড়া সমাজ-সংসারের কতটা শিল্পে তুলে আনা যায়, তার কোনটা কে কিভাবে নেয় সেটাও একটা বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠতে পারে। যেমন আমরা ফটোগ্রাফারের চোখে বস্তির দৃশ্য দেখে প্রতিবাদে সরব হই; ‘যুগান্ত’ সিনেমায় রূপা গাঙ্গুলীর কোরিওগ্রাফিতে সমুদ্রে ভাসমান তেলে ধীরে ধীরে তলিয়ে যাওয়া পাখিদের নৃত্যরূপ দেখে যেমন তাঁর স্বামী বিদ্রূপ করে ওঠেন। আবার চন্দ্রলেখা যেমন বলেছেন –

”When people say “why don’t you portray social realities” they are invariably trying to transfer their feelings of guilt (about the way things are) to the artists.’”

অখিলার আরেকটি গ্রামীণ ওয়ার্কশপে দেখা কাজে উঠে আসে সদ্যবিবাহিত ইন্টারকাস্ট দম্পতির হেনস্থা ও হোমিসাইডের কাহিনী, যার বিষয়নির্বাচন, উপস্থাপনা ও প্রপ-ব্যবহার খুব পরিষ্কারভাবেই শিল্পীর দৃঢ় অব্রাহ্মন আইডেন্টিটি, ‘দলিত’ ইশ্যুটি নিয়ে চিন্তা ও সহমর্মিতা এবং থিয়েটার ব্যাকগ্রাউণ্ডের ফসল। এইধরণের কনটেম্পরারি নাচের কাজ কাহিনিমুখী হয়েও আধুনিক – মার্গীয় ও লোকনৃত্যের কাহিনিমুখিতার – অর্থাৎ কথকতা ও প্রাচীন নৃত্য-বিষয়ক শাস্ত্রগুলিতে যাকে নৃত্যের ‘নাট্য’ভাগ হিসেবে আইডেন্টিফাই করা হয় – সেই ট্রাডিশনের যথাযোগ্য উত্তরাধিকারী – এরকম উদাহরণ বোধহয় আগেও কিছু দিয়েছি। গৌরী রামনারায়ণ প্রমুখের ডান্স থিয়েটার – যেমন ‘যশোধরা’ – মার্গীয় নৃত্য ও থিয়েটারের মেলবন্ধন ঘটায়। ডান্স-থিয়েটারের প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের উল্লেখ না করলে অবশ্য এ আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তবে আবারও আমার ব্যক্তিগত মত বলছি – রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্যে গানগুলি এত জোরালো যে বাকি গল্প আর তার প্রকাশের কাজটা অনেকসময়ই কেমন অতিরিক্ত বা হালকা মনে হয়। আর এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তাঁর কাজ অত্যন্তরকম বহুব্যবহৃতও বটে। তামিল ডান্স-থিয়েটারের জগতে যেমন ‘সিলাপ্পতিকারম্’।

গৌরীর কাজের মূল গুরুত্ব অবশ্য বিখ্যাত তামিল ‘ভক্তি পোয়েট্রি’কে বহু মানুষের সামনে নিয়ে আসার মধ্যে ও তাকে হয়তো – সদর্থেই বলছি – খানিকটা আজকের স্তরে বিনোদনযোগ্য করে তোলার মধ্যে। সাহিত্যের সাথে কোলাবরেশনে আজকাল বহু ইন্টারেস্টিং কাজ হয় কিন্তু। এক্ষুনি হুট বলতে মনে পড়ছে – যদিও একটু আগেই কবীর বা রবীন্দ্রনাথ নিয়ে হাসি ঠাট্টা করছিলাম – মুম্বইবাসী কত্থক/কনটেম্পরারি শিল্পী সংযুক্তা ওয়াঘের কবীরের দোঁহা নিয়ে কাজ – সেই চার লাইনের সহজ গভীরতাকে ছোঁয়া বুঝি কত্থকের দেহের উপরিভাগ ও চোখের সূক্ষ্ম কাজগুলির মধ্যে দিয়েই সম্ভব; বা গত বছর দেখা প্রীতি আত্রেয়ার রবীন্দ্রনাথের লেখার উপর কাটাকুটি নিয়ে কাজ, যেখানে শিল্পী তাঁর শরীর দিয়ে মঞ্চের স্পেসে একরকমের আঁকিবুকি কাটেন এবং যে কবিতাটি নিয়ে কাজ তার মুডটি ধরার চেষ্টা করেন। ছবির কোথায় মনে পড়ল – চিত্রেশ দাস শুনেছি অনগোয়িং ছবি আঁকার সাথে কত্থক করেন – দেখিনি কখনো। ফিদা হুসেনের করা ‘গজগামিনী’ ছবিতে নাচের ধরণ ও কোয়ালিটি ভয়ানক উগ্র পুরুষী বিনোদনমার্কা হলেও গজগামিনী মাধুরী দীক্ষিতের একজন্মের গল্প থেকে আরেকজন্মের গল্পে, বা বলা যায় একটি নাচ থেকে আরেকটি নাচে যাওয়ার মাঝেকার বিমূর্ত রঙের ব্যবহার বেশ অসাধারণ রকমেরই ভালো লেগেছিল বলে মনে আছে। কাহিনিধর্মিতার ব্যাপারে – দৈনন্দিন জীবনের একেকটি কনসেপ্ট ধরে কাজের উদাহরণ তো অসংখ্য। কিন্তু তারই মধ্যে কিছু কিছু কাজ একটা আলাদা গভীরতার জায়গা তৈরী করে নেয়। এক্ষেত্রে ভারতীয় প্রোডাকশন না হলেও একটা উদাহরণ না দিয়ে পারছিনা। থীম – ভায়োলেন্স, যুদ্ধ, মানুষে-মানুষে বিশ্বাস-অবিশ্বাস – তাই নিয়ে স্টেটমেন্ট রেখেছিলেন য়োকো ওনো তাঁর ‘কাট পিস’-এ। পুরো সময় জুড়ে তিনি বসে রইলেন মঞ্চে আর দর্শকদের অধিকার দেওয়া হলো তাঁর পোশাক থেকে যেকোনো অংশ কেটে নিয়ে যাবার। লণ্ডনে নাকি দর্শকরা এতটাই উন্মত্ত হয়ে ওঠেন যে শেষে সিকিউরিটি গার্ডদের মঞ্চে নামতে হয়। এদেশে অবশ্য এমনিতেই এখন ঘরে-বাইরে সর্বত্র মেয়েরা য়োকো ওনো হচ্ছে – কাগজ খুললেই কনসেপ্ট আর্টের ছড়াছড়ি। অনধিকমিতি।

আধুনিক টেকনোলজির ব্যবহার আমাদের দেশের নাচে মালকড়ির অভাবে তত ব্যাপকভাবে দেখা না গেলেও বিদেশে সর্বত্র দেখা যায়। ভিডিওগ্রাফি ব্যবহারের কথা আগেই বললাম, আরও একটা মজার উদাহরণ মনে পড়ছে – খুব ছোট মাপের একটি জিনিস – কিন্তু বেশ কায়দাটি। গেল বছর ফ্রেঞ্চ ডান্সার ডেভিড রোঁলা চেন্নাই এসেছিলেন বেসমেন্ট ২১-এর সাথে কোলাবরেশনে একটি কাজ করতে। তাতে প্রতিটি পারফর্মারের কানে লাগানো ছিল একটি হেডফোন, যাতে আগে থাকতেই তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ বিষয়ে ইনস্ট্রাকশন রেকর্ড করা আছে, আর তাই দিয়ে যন্ত্রের মত চলছে পুরো নাচটা, যদিও দর্শকরা শুনছে অন্য সব শব্দ, যার সাথে ডান্সারদের কোনো আপাত সম্পর্ক নেই। এইভাবে কোরিওগ্রাফারের মাথার মধ্যেকার দুটি জগৎ সমান্তরালভাবে অভিনীত হচ্ছে মঞ্চে। নাচিয়েদের শরীর কাজ করছে রোবটের শরীরের মত – এই প্রোগ্রামড্ নাচের ধারণাটি বিশেষভাবে পাশ্চাত্যের, যদিও এখন ভারতীয় আধুনিক নাচে এর ব্যবহার অনেক।

ওই একই সূত্রে আলাপ হওয়া জার্মান কোরিওগ্রাফার থমাস লেম্যানের মত শিল্পীরা আবার টেকনিক বাদ দিয়ে মানুষের নানা অনুভূতিকে খুব ক্লিনিকালি ধরার চেষ্টা করেন নাচের মধ্য দিয়ে – আনন্দ, ভয়, জুগুপ্সা – এসবই তাঁর মতে একটা সাধারণ ছকে ফেলে সৃষ্টি করা যায় – যা আবার আমার নিজের মনে হয় একটু ফোর্সড্, একটু অতিসরলীকৃত। সত্যি বলতে গিয়ে তাই নিয়ে আমার সাথে ভদ্রলোকের একটু লেগেও গেছিল। তিনি আমাদের দশজন নাচিয়ে-বাজিয়ে-এক্টরকে ধরে বললেন তোমাদের পছন্দের একেকজন মানুষকে এই পারফর্মেন্সে ডেকে আনো, আর তাকে তোমার পারফর্মেন্সের মধ্যে দিয়ে একটা গিফ্ট দাও, তোমারও ভালো লাগবে, তারও ভালো লাগবে, আর দর্শকরাও খুশি হবে। আর এই কনসেপ্ট পারফর্মেন্সটির নাম হবে গিয়ে ‘এ পীস ফর ইউ’। তা আমার একে পছন্দের লোকই জোটেনা, তায় এমন মুরগি হবে কে! তাও এক পীস বন্ধুকে ভুজুং ভাজুং দিয়ে রাজি করালাম। তা যেকোনোরকম পি.ডি.এ বিষয়ে তার কম্ফর্টেবিলিটি আমার উপরেও আরেক কাঠি। তা থমাস যত এই কর সেই কর বলে শলা দিচ্ছেন, তত আমার মনে হচ্ছে মা ধরণী দ্বিধা হও। শেষে মিনমিন করে বললাম,আচ্ছা সে বেচারাকে যদি এই অব্দি টেনে আনিই, তারপর তাকে আর বিব্রত না করাটাই বোধহয় সবচেয়ে বড় গিফ্ট হবে বুইলেন কিনা…? তা সে জার্মান ব্যাটা কি এসব ভারতীয়নারীসুলভ লজ্জা-ইয়ার্কি বুঝতে চায়! কি ধাতানিটা দিলো! নেহাৎ দশটি হাজার টঙ্কা বেতন দিয়েছিল, তাই দিয়ে নাচের পরে বন্ধুতে-আমাতে চীনে রেস্টুরেন্টে গিয়ে বিশ্বসংসারের মুণ্ডুপাত করে খানিক শান্তি হলো…।

তবে ওই যে বললাম – সবচাইতে বড় প্রয়োজনটা হলো বিতর্ক তথা গবেষণাটাকে চালু রাখা। থমাস লেম্যানের মত শিল্পীরা মার্গীয় নৃত্যের (বিদেশেও তো মার্গীয় নৃত্য আছে, বিশেষত ব্যালে) বিনোদনী ভড়ংকে যুঝতে চান মঞ্চে একধরণের এক সততা বা সত্যতা প্রবর্তন করে, যেটায় আমার প্রবৃত্তি না থাকলেও উৎসাহ খুব আছে। উপরন্তু থমাসের মতামতের মধ্যে একটি আমার খুব পছন্দ – বিশেষত এই প্রযুক্তির বাজারে – যেটা পদ্মিনীর মুখেও অনেকবার শুনেছি – টেকনোলজি যত কম ব্যবহার করা যায়, নাচে মন দেওয়া যায় তত বেশি। রূপসজ্জা যত কম ব্যবহার করা যায়, জটিল কাহিনীর মোড় যত কম ব্যবহার করা যায় (যেটা রবীন্দ্র-নৃত্যনাট্যের ‘নাচ’ অংশটির একটি সমস্যা বলে আমার মনে হয়), সহমর্মী দর্শক নাচিয়ের বিশুদ্ধ শরীরে মন দিতে পারেন তত বেশি। তবে এর বিরুদ্ধে থমাসের অবজেক্টিভ যুদ্ধ যেমন কনসেপ্ট দিয়ে, পদ্মিনীর সাবজেক্টিভ যুদ্ধ তেমনি বিশুদ্ধ শরীর দিয়ে। নাচের এই বিশুদ্ধ শরীর কি? অবনীন্দ্রনাথ নাকি বলতেন – বিলিতি রং না পেলে দেশী রঙে আঁকব, দেশী রং না পেলে কাঠকয়লা দিয়ে আঁকব, আর কিছু না পেলে আঁকব হাতের আঙুল দিয়ে শূন্যে। সেই কি বিশুদ্ধ চিত্রশিল্প? বিশুদ্ধ শরীর কি তেমনই কিছু ? এই শরীরের রূপ ও বিচার নিয়ে পরে আবার কথা হবে।

অবশ্য নাচিয়েদের কিনা আবার মেনিফোল্ড অপ্সরা-কমপ্লেক্স থাকে কিনা, তাই ক বললেই কোলাবরেশন নাচের লাইনে করা সহজ নয়। ই বলতেই হরেকরকম ইগোর কিস্যা এসে পড়ে। মার্গীয় নাচে তো খেয়োখেয়ির গল্পটা খুবই সিধে – আমি নিজেই সৃষ্টির নাইভ আনন্দে দু-একজন নাচের সতীর্থের সাথে কোলাবরেট করতে গিয়ে তিন মাসের মধ্যে কোনো না কোনোভাবে লাগানিত ভাঙানিত হয়ে গুরুর কাছে মোক্ষম ঝাড় খেয়েছি কারণ ও লাইনে অনেক গুরু-ছাত্রই মনে করেন কেউ চোখ তুলে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়েছে মানেই সে মনে মনে গুরুর ও বাদবাকি সতীর্থদের কেরিয়ার, নামডাক, মায় প্রাণের পিছনেই পড়েছে বুঝি বা। আধুনিকে এপ্রোচটা আরেকটু সূক্ষ্ম হলেও অনেকসময় হরেদরে একই হয়ে দাঁড়ায়। আসলে এমন একটা ছিল্লিবিল্লি গ্ল্যামারময় জীবিকা এই নাচ যে মানুষের সহজ বুদ্ধি গুলিয়ে গেলেও দোষ দেওয়া যায়না – প্রোফেশনাল হ্যাজার্ড আর কি। আবার অন্যদিকে দেখতে গেলে – যেমন ইসাডোরা ডানকান – যাকে অনেকে কনটেম্পরারি নাচের জননী বলেন – যে পুরুষ আর্টিস্টের সাথেই দুদিন আড্ডা টাড্ডা দিতেন, কোলাবরেশন তো পরের কথা, আগেই তাঁরা নাকি ডানকানের প্রেমে পড়ে হাবুডুবু খেয়ে একসা কাণ্ড করতেন। মায় রঁদ্যা অব্দি – কি কেলো! ভদ্রমহিলা আত্মজীবনিতে অবশ্য বিস্তর বাজে কথা লিখেছিলেন, কিন্তু আখেরে সত্যি হোক বা মিথ্যে, তাঁর মাথার ভিতরে তো এই ঘটনাগুলোর একধরণের সত্যতা ছিল? সেটাও ওই অপ্সরা-কমপ্লেক্সের একটি রূপ। যাকগে আর ইয়ার্কি না করে এইখানে বলে রাখা ভালো যে কাজপাগল যথার্থ নৃত্যপ্রেমী শিল্পীর সংখ্যাও কিছু কম নয় – তাই ভরসা হারিয়ে এক্ষুনি ব্রিজ থেকে ঝাঁপ না খেলেও চলবে।

আবাহন প্রশ্নে শেষ দুকথা বলব আর্কিটেকচারের সাথে কোলাবরেশনের বিষয়ে। কলকাতার আর্টি-দর্শক জার্মান কোরিওগ্রাফার সাশা ওয়াল্টজের ‘ডায়ালগ ২০১৩’ দেখে থাকবেন জোড়াসাঁকোর রাজবাড়িতে – বাড়ির একেকটি অংশে একেকটি তৎকালীন দৈনন্দিন জীবনের ছবির পুনরাবৃত্তি – আবার মাঝের বিরাট উঠোনখানিতে এই ঐতিহাসিক, সামাজিক ও স্থাপত্যমূলক প্রাচীনত্বের রিঅ্যাকশনে সাশার নৃত্যভাবনা – এর বেশি বলতে পারবনা মাপ করতে হবে, আমি নিজেও আগামাথা তেমন বুঝতে পারিনি, তবে আর্কিটেকচারের সাথে সম্পর্কটা প্রকট ছিল। পুরনো ভাঙা বাড়ির প্রেক্ষাপটে লাল নীল হলদে ন্যাকড়া পরে সাহেব-মেমেরা লাফালাফি করছে, এব্যাপারটার মধ্যে বেশ একটা ইয়ে তো ছিলই। গুটিকতক ভারতীয় নাচিয়েও ছিলেন, বোধহয় আধুনিকের সাথে মার্গের তফাত ডিনোট করতে, তা তাঁদের অন্ধকারে তত দেখা যাচ্ছিলনা। আমার দেখার মধ্যে ‘ডায়ালগ ২০১৩’ ছাড়া আর্কিটেকচার-বিষয়ী কাজ দেখেছি পদ্মিনীর ‘ওয়াল ডান্সিং’; সত্যি বলতে শুধু দেখিনি, তাতে পার্ট-ও করেছি – একটি ঘরের দেয়ালের নানা তল ও কোণাঘুঁজি, তার সাথে নাচিয়েদের দেহের সম্পর্ক আবার নাচিয়েদের শরীরের পারস্পরিক ভার দেওয়া ও নেওয়ার নানা সম্পর্ক – এর উপরে কাজ। তিন ঘন্টা লম্বা ইন্টেন্স একটি প্রোডাকশন (আমার নিজের মা অব্দি বসে দেখতে রাজি হননি। তবে এমনিতেও মায়ের মতে ওসব আঁতেল নাচ করতে ভালো হতে পারে, বসে দেখা যায়না। যাক সে দুঃখের কথা)। অনুশকার ‘রেস্ট্রিকটেড ভিউ’-ও পারফর্মেন্স-স্পেসের নানা তলের সাথে ডান্সারের শরীর ও নানা আলো-ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে সেই শরীরের বিভিন্নরকম ছায়াপাতের সম্বন্ধ – এই নিয়ে তৈরী – স্থাপত্যের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। সাধারণভাবেও স্থাপত্য ও পারফর্মেন্স অঙ্গাঙ্গী যুক্ত কারণ কোন ধরণের স্পেসে নাচিয়ে তাঁর শিল্প পরিবেশনা করলে সিংহাসনে রাজা-রাজড়া থেকে চিকের আড়ালে রাণী-দাসীবর্গ থেকে বাইরে গাছের ডালে পাতি প্রজাদল অব্দি সক্কলে যাতে দেখার চান্স পায় (বা না পায়) – এই নিয়ে চিন্তাভাবনা সুপ্রাচীন। যাই হোক এই আলোচনায় স্থাপত্যের ব্যাপারটায় এইজন্যে জোর দিচ্ছি, যে যাকে উপরে বিসর্জন নাম দিয়েছি – সেই ভাবনা থেকে জাত মিনিমালিজ্মের ধারণাটি সর্বশিল্পমধ্যে আর্কিটেকচারেই সবচেয়ে ভালো দেখা যায় বলে মনে হয়।

বিসর্জন

”The minimum could be defined as the perfection that an artefact achieves when it is no longer possible to improve it by subtraction. This is the quality that an object has when every component, every detail and every junction has been reduced or condensed to the essentials. It is the result of the omission of the inessentials. The emphasis here is visual. The idea of simplicity is a recurring ideal shared by many cultures – all of them looking for a way of life free from the dead weight of an excess of possessions.” Minimun, John Pawson

”The difference between a good and a poor architect is that the poor architect succumbs to every temptation and the good one resists it.” – Ludwig Wittgenstein

বছর দশ-এগারো আগে রামগোপাল ভার্মার ব্যানারে ‘নাচ’ বলে একখানা সুপার ফ্লপ হিন্দি ছবি হয়েছিল। উপরে গতির ন্যূনতা বিষয়ে যে আলোচনাটা করছিলাম, তাতেই খেয়াল পড়ল – হিরোয়িন সেখানে বম্বে শহরে এক ভাগ্যান্বেষী কোরিওগ্রাফার আর তার প্রেমিক এক উচ্চাকাঙ্খী যুবক যে বলিউডে হিরো হতে চায়। ছবির মাঝামাঝি তার প্রেমিকের পাওয়া এক সিনেমার অফারে সে একটি মিনিমালিস্টিক নাচ তৈরী করে যাতে নাচিয়ে শুধুই একটা চেয়ারে বসে আছে এবং গানের বিটের সাথে সাথে শুধু চোখের ভাষায় ও শরীরের অত্যল্প নড়াচড়ায় মুডটা ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করছে। নাচটা যে খুব ভয়ানক উঁচুদরের হয়েছিল তা বলবনা, কিন্তু ওইধরনের নাচ – এখন যেটা বলিউডের ঘরে ঘরে – তখন ততটা প্রচলিত ছিলনা, তাই এক্সপেরিমেন্টটা বেশ নতুনরকম লেগেছিল। অবশ্যই সেই কোরিওগ্রাফি তার প্রেমিকের গতানুগতিক বিনোদনবাদী বস গ্রহণ করেননা, তার বদলে লাল-নীল প্যান্ট-শাড়ি পরিহিত নাইনটিজের হাম-তুম মার্কা নাচ ঢুকিয়ে দেওয়া হয় আর তখনই যৌবনধর্মে যা যা সমস্যা হবার শুরু হয় আর কি। যাই হোক ছবিটা আমার বেশ লেগেছিল আর ওতে শুরুতেই অন্তরা মালীর একটা চমৎকার নাচগানের সিকোয়েন্স ছিল। তাতে বলছে কি – সবের মধ্যেই নাচ – এই রোদের মধ্যে হঠাৎ বৃষ্টি পড়ছে, লোকজন ভিজছে, দৌড়চ্ছে, প্রেম করছে, কিছু বাচ্চা লাফালাফি করছে, কিছু ছেলে ফুটবল খেলছে, শহর, ভিড়ভাট্টা – এই সবেতেই উপস্থিত ক্রমাগত যে গতি একটা গলে পড়া আরামের মত ভেসে যাচ্ছে সেটা নাচ। সেটা এই সমগ্রের মধ্যে থেকেও আবার এদের সবাইকে ধারণ করে আছে একটা প্যারাডক্সের মত। সিনেমাটা প্রেম-ট্রেম আজেবাজে রাবিশ-টাবিশগুলো বাদ দিয়ে যে দুটো জিনিস দেখাতে পেরেছিল, তা হলো

এক, একজন নাচিয়ে তাঁর নাচ নিয়ে কি করবেন এই প্রশ্ন অবান্তর, নাচটা তাঁর নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের মতই একটা সর্বক্ষণের সত্য। সিনেমার একটি হাই পয়েন্ট তৈরী হয়, যখন সম্পর্ক আর কাজের ক্ষেত্রে জীবনের প্রথম বড় রিজেকশন আসার পর অন্তরার কান্না, হতাশা মিশে যায় ঘোর বৃষ্টিতে, মাটিতে – নাচের ভিতর দিয়ে, যেখানে মাটির সারফেসের সাথে নাচিয়ের শরীর এক হয়ে যায়, আবার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত শরীর বাঁকিয়ে কোমর ভাঙা কুকুরের মত উঠে আসার চেষ্টা, যেন ধনুকে টঙ্কার পড়ছে …

দুই, যথেষ্ট দেহ-খোলা জামাকাপড়, তারপর নেংটির সঙ্গে নোলক, আঁচলের সঙ্গে উটপাখির পালক এইসব নানান হাবিজাবি পরলেও – এটা নাচের গুণেও হতে পারে, আবার অন্তরার দেহের একধরণের মাস্কুলার নিউট্রালিটির জন্যেও হতে পারে – নাচিয়ের শরীর এখানে বাকি বাহ্যিক উপাদানগুলোকে ছাড়িয়ে উঠতে পেরেছিল। তাছাড়া এসময় থেকেই বলিউডে নাচ মানেই যে ডিস্কো নয়, বরং স্বাভাবিক চলাফেরা-কথাবলা বা জড়ভরত হয়ে বসে থাকাটাও যে একটি নাচ হয়ে উঠতে পারে এই কনটেম্পরারি ধারণাটি ফর্মালি নানাভাবে এক্সপ্লোর করা শুরু হয়।

উপরে যে দুটি পয়েন্টের কথা বলেছি, তার একের নম্বরের বিষয়টা নিয়ে বলতে গেলে গাঁ উজোড় তাই একটা ছোট্ট কথা বলে থেমে যাব। সেকথাটাও বলছি কারণ সেটা দ্বিতীয়টার সাথে সম্পর্কিত। নাচ নিয়ে একজন নাচিয়ে শেষ পর্যন্ত কি করেন? আগেকার দিনে যেমন মেয়েদের ভালো বিয়ে দেওয়ার জন্য কলেজ পাশ করানো হত – তেমনি – তা বলিউড বলুন যা বলুন মিলনান্তক বিনোদন মানেই তাতে প্রেমের জয় কেন বলতে পারেন? এই ‘নাচ’ সিনেমাটায়ই দেখতে গেলে, বা ‘তাল’ বলে ঐশ্বর্য রাই-এর জমজমাট মিউজিকালের কথা যদি মনে থাকে, মায় যশ চোপড়ার ‘দিল তো পাগল হ্যায়’-তে একজন মেয়ে খেটেখুটে তার ক্রিয়েটিভিটির উত্তুঙ্গ বিকাশ ঘটিয়ে শেষে ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করতে করতে কোনো না কোনো ফর্মে সেই প্রেমিকের গলায় গিয়ে না ঝুললে কি তার জীবনের সার্থকতা নেই? ভালো মনে পড়ল, আমার নিজের এক হস্তীসদৃশ বন্ধু কিছুদিন আমার কাছে কত্থক শেখার বিফল চেষ্টা করেছিল। ও মা তাপ্পর তার বিয়ে ঠিক হতে একদিন এসে বলে কিনা – আমায় চটপট দুটো আইটেম শিখিয়ে দিবি? এমনিতে তো আর নাচবনা, তা ওই বর যদি দেখতে চায়…। মশাইরা, আমি নাথবতী অনাথবৎ হাপ্ নাচিয়ে গঙ্গারাম এর উত্তরে কি বলেছিলাম? রেটোরিকাল প্রশ্ন তুলে সময় নষ্ট করবনা, তবে শক্তিশালী ট্যালেন্টেড কাহিনীকাররা তাঁদের গল্পের মধ্যে দিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেও তার এক্সপ্লোরেশনের মধ্যে না গিয়ে ব্যাপারটা হাওয়ায় ভাসিয়ে দিচ্ছেন এটা দেখতে একটু হতাশও লাগে কখনো কখনো। বিশেষত আমাদের গোষ্ঠী পাকানোয় ওস্তাদ সংস্কৃতিতে প্রেমিক মানে শুধু সহমর্মী সহধর্মী বান্ধব তো নয়, তাই এসব গল্পের মুডটাই যেন – অনেক আর্ট মারিয়ে মেয়েটি শেষে একটি সুখী পরিবারের রাজ্ঞী হতে গেল। তাও ভাগ্যিস ঋতুপর্ণর মত ডাইরেক্টররা ওরই মধ্যে বুদ্ধি করে একটু একটু প্রতিবাদ ঢুকিয়ে দেন – যেমন ‘উনিশে এপ্রিল’-এর সরোজিনী। নিজের মেয়ের সাথে আঠেরো বছর পর যখন তাঁর প্রথম মন খুলে একটা বোঝাপড়া হচ্ছে, তখনো এই ভরতনাট্যম শিল্পী বলতে পারেন, যে বিয়ে করাটাই বোধহয় তাঁর উচিত হয়নি – তার মানে এই নয় যে তাঁর মেয়ের ব্যাপারে স্নেহ, টান বা চিন্তা নেই, কিন্তু তাঁর ক্রস হলো তাঁর নাচ, যেটা বহন করার জন্য তাঁর জন্ম বলে তিনি উপলব্ধি করেন। সিনেমার শেষ দৃশ্যে তাই তিনি তাঁর মেয়েকেও তার নিজের ক্রসটি পছন্দ করে বুঝে নিতেই সাহস দেন না কি?

এখানে অবশ্য ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পুরুষতন্ত্রের কথা চলে আসছে। একটু খিল্লি করে নিই। নাচের জগতে – মার্গীয় নাচে তো বটেই, তবে কনটেম্পরারিতেও – যেহেতু ভারতে আধুনিক নাচের হোতাদের ভিতর উদয়শংকর, নরেশ কুমার, আস্তাদ দেবু (নতুনের হোতা তো সবসময়েই পুরুষেরা!) আর পরবর্তীকালে নভতেজ সিং জোহর, মনদীপ রাইখি, জয়চন্দ্রণ, রনি শাম্বিক ঘোষ প্রমুখ অনেক পুরুষ থাকলেও বাজারে প্র্যাকটিসের ব্যাপারে ছেলেদের সংখ্যা এখনো মেয়েদের তুলনায় কিছুটা কম। তাই ক্লাসে-অনুষ্ঠানে-ফেস্টিভালে ছেলে ডান্সারদের অবস্থা প্রায়ই হংস মধ্যে বকো যথা হয়ে পড়ে। এটা ম্যানেজ দিতে গিয়েই কি বহু পুরুষ ডান্সারের শরীরে সেই কুখ্যাত নারীভাব? নাচের সাথে নারীভাবের এই সম্পর্ক নিয়ে নীচে আরো বিস্তারিত কিছু প্রশ্ন রাখব। তবে এটুকু মনে হয়, যে ভরতনাট্যমশিল্পী নর্তকী নটরাজের মত নাচিয়েরা যদি শরীরে পুরুষ হয়ে বাইরে ও ভিতরে সম্পূর্ণ নারীভাব বজায় রাখতে পারেন – তাঁদের সংকটটা তো অনেক বেশি গভীর! – তাহলে দেহেমনে পুরুষ বহু নাচিয়ে কেন তাঁদের শরীরে এই অদ্ভুত ঢং পুষে রাখেন! আবার একদল পুরুষ নৃত্যশিল্পী এর মোকাবিলা করার চেষ্টা করেন স্বভাবগত ভায়োলেন্সচর্চার মধ্যে দিয়ে। প্রতিমা বেদীর আত্মজীবনী ‘টাইমপাস’-এ এইধরণের নানা ঘটনার উল্লেখ আছে। এমনিতেই প্রতিমার মত অসম্ভব এনার্জি হ্যাণ্ডেল করার মত মানুষ তো যেখানে সেখানে খুঁজে পাওয়া যায়না, তো সেই শক্তিস্বরূপা যদি আবার নৃত্যবিষয়ে বস হয়ে এমন একজন নর্তকের মাথার উপর বসেন, যিনি শুধু পুরুষ বলে নয়, উপরন্তু যিনি সেই নৃত্যশিল্পের (এবং তাঁর বিখ্যাত পিতারও বটে) ছত্রছায়ায় বেড়ে উঠেছেন, তবে যা যা হতে পারে, নৃত্যগ্রামে ঠিক তাই তাই হয়েছিল। নৃত্যগ্রামের প্রসঙ্গে বলছি – এখনো এইধরণের বিপর্যয় সেখানে বিরল নয়। বিজয়িনী সৎপতির মুখে শুনেছি – কোনো পুরুষ ছাত্র বা শিক্ষক ওখানে তেমন বেশিদিন টিকতে পারেননা। দৃঢ়চেতা আত্মবিশ্বাসী নারীরা সেখানে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নেন এটাই তার কারণ কিনা কে জানে!

যাই হোক একটু আগে কথায় কথায় চলচ্চিত্রে গিয়ে পড়েছিলাম – সেটা এই কোলাবরেশানের বাজারে নেহাৎ অপ্রাসঙ্গিক না হলেও আর বাড়াবনা। যা বলছিলাম – ওই দ্বিতীয় বিষয়টা যেকোনোরকম নাচেই আমার কাছে খুব ইন্টারেস্টিং বলে মনে হয়। মানে, নাচিয়ের শরীর বলতে আমি এখানে কোন শরীরের কথা বলছি – মঞ্চে যে শরীর নাচছে, মঞ্চ থেকে নেমে যে শরীর ফ্যান-মিডিয়াবর্গের সাথে বাতচিত করছে, বাড়ি ফিরে পরিবারের সামনে হাঁটছে-চলছে-কথা বলছে বা মন্দিরে ঈশ্বরের সামনে চোখ বুজে দাঁড়াচ্ছে – এ কি সেই একটিই শরীর? মন তো আলাদা বটেই, কিন্তু দেহ? এবিষয়ে আগে দু-একবার খানিক খানিক বলতে শুরু করে থেমে গেছিলাম, যে মানুষ তো তার আত্মিক ও সামাজিক আইডেন্টিটির ব্যাপারে শরীরের উপর নানাভাবে নির্ভরশীল। সেই নির্ভরতার জায়গা থেকে সে নাচকে কেমন ভাবে দেখে।

কুমুদিনী লাখিয়ার নির্দেশনায় জাপানী শিষ্যা য়ুকো ইনুয়ের কত্থকের কোনো একটি ভিডিও দেখেছিলাম; দেখে মনে হয়েছিল একদেহে লখনৌ ও জাপানের এমন আত্মীকৃত মিলমিশ দুটি সংস্কৃতিকেই পুরোপুরি গুলে না খেলে হয়না। অবশ্য এদের মধ্যে একতো হলো সত্যিই এক দেশীয় সংস্কৃতি – শুধু তাই না – একজন মানুষের বিশ-ত্রিশ বছরের সমস্ত জীবন, আর অন্যটা শরীরের গতিবিষয়ে এক সেট নিয়মমাত্র। কতটা গভীরভাবে প্রভাবিত করলে প্রথমটা দ্বিতীয়টার সাথে সমানে সমানে যুঝে শরীর – বিশেষত মস্তিষ্কের অর্ধাংশ দাবি করে নিতে পারে?

অনেক কনটেম্পরারি নাচের গ্রুপেই যেটা আজকাল দেখা যায়, নাচের স্টেপগুলোর ভিতরে ছেলে-মেয়ের অত বাছবিচার নেই। পোষাকে আছে। স্টেপেও আছে বটে, মানে ওই কে কার কোমর ধরে শূন্যে তুলে দিল, কে কার কোলে বসলো – এইসব – কিন্তু সেটা শুধুই সামাজিক স্টিরিওটাইপের জয়গান – ওতে শরীর বিষয়ে কোনো চিন্তা নেই। যাই হোক, সভ্যসমাজে পোষাকটাও তো একটা আইডেন্টিটি। মিনিমালিজ্মধর্মী নাচের মধ্যে এই বিশেষ আইডেন্টিটি বর্জনের কাজটা কিভাবে ঘটে থাকে? নাচিয়ের দেহের চরম নিউট্রালাইজেশনে বিশ্বাসী বহু কোরিওগ্রাফারও কিন্তু তাঁর মেয়ে ডান্সারদের স্টেজে ওঠার সময় পা-বগল কামিয়ে না এলে রেয়াত করেননা, পুরুষ ডান্সারদের করেন। তবে মার্গশরীরের সাথে এই আধুনিক শরীরের তফাত কোথায়? অবশ্য বলতে নেই, মার্গীয় মার্কেটে পোষাক নিয়ে মাথা কতকটা বাড়াবাড়িরকমেরই ঘামানো হয় – কত্থকে ওড়না মাথায় দেবে না বুকে, ভরতনাট্যমে ফ্যানের সাইজ কত হবে – এইসব কত হাবিজাবি। মোহিনীআট্যম শিল্পী বেচারা বিনীতা নেদেঙ্গুড়ি স্কার্টের বদলে ধুতি কস্টিউম দিব্যি নেচেও বদনাম হয়ে গেলেন। যাই হোক এইধরণের তুচ্ছ বাহ্যিক বিষয়গুলো নিয়েও যদি আমাদের এতটা নাক সিঁটকোনোর ভাব থেকে থাকে, তবে নাচ নামক এই বিশুদ্ধ বিনোদনবিরোধী শরীরশিল্পের ফর্মটির অগ্রগতির বিষয়ে আমাদের অগ্রগতি কতখানি? এটা কিন্তু ইয়ার্কি না – বডি-হেয়ার কালচার-মার্কেটে একটি রীতিমত বিষয়। জুলিয়া রবার্টস্ বগল না কামিয়ে এওয়ার্ড ফাংশনের মঞ্চে হাত নেড়ে শোরগোল ফেলে দিয়েছিলেন। যখন চেন্নাইতে থাকতে একটি মার্গীয় নাচের ক্লাসে যেতাম, তখন আমার গুরু একবার আমার সালোয়ার-গোটানো পা দেখে বলেছিলেন – মা তোমার বয়ফ্রেন্ড তোমার পা কোনোদিন দেখেছে? তারপরেও সে তোমার সঙ্গে শোয়?

আসলে শরীরকে দেশ-কাল-বিনোদন-সমাজ ব্যতিরেকে দেখার কাজটা ভীষণ কঠিন, হয়তো এদেশে আরো বেশি। শারীরিক নৈকট্য যে পর্যায়ের অন্তরঙ্গতা সৃষ্টি করে বলে ইনস্টিংক্ট আমাদের মেসেজ পাঠায়, তার কতটা ইনহেরেন্ট আর কতটা সামাজিক সে তর্কের আমি এক্সপার্ট নই, কিন্তু এটা নাচের ক্ষেত্রে একটা বড় ভূমিকা পালন করে। এইজন্যেই নাচের গুরু আর শিষ্যের মধ্যে এক বিশেষ যোগ সৃষ্টি হয় যা অন্যান্য শিল্পের গুরুশিষ্য সম্পর্কের চেয়ে আলাদা — একটা শারীরিক সম্পর্ক, যা যৌনতার আওতায় না থেকেও আছে — একটা জান্তব অধিকারবোধ। এর বশেই হয়তো অনেক ছাত্রছাত্রী তাঁদের পায়েপিঠে গুরুর মারের দাগ দেখিয়ে গর্ববোধ করেন। ব্যাপারটা ভাবতে গেলে খুবই অসুবিধাজনক, কিন্তু এর অস্তিত্ব অস্বীকার করা যায়না। গেল মাসে ‘সীতা’জ কার্স’ বলে একখানি বোরিং বই পড়তে গিয়ে নিজেকে কষ্ট দিয়েছিলাম; কিন্তু তার শুরুতেই ছিল পঞ্চদশী নায়িকার সঙ্গে, যে কিনা ভয়ানক ভালো নাচে আর ফাটাফাটি শরীরের গড়ন, তার নৃত্যশিক্ষকের একটি যৌন দৃশ্য। বইটা ইয়ে হলেও এই যে দৃশ্যরচনা, তা এটাকে সত্যি বলেই ধরি কি সিম্বল বলে, এর পিছনে একটা বাস্তবতার ভিত্তি আছে। মায়ের সাথে সন্তানের সম্বন্ধের মতই একজন মানুষের শরীরকে যখন আরেকজন মানুষ কোনো এক ফর্মে গঠনমূলকভাবে পরিচালনা করে, তখন অনেকসময় অবাঞ্ছিত হলেও পরিচালকের মনে একরকমের অধিকারবোধ, আবার পরিচালিতের মনে একরকমের – কি বলব – শারীরিক কৃতজ্ঞতাবোধ জন্ম নিতে বাধ্য। আবার লং টার্ম ছাত্র-শিক্ষিকার নৃত্যজীবনে এই ভূমিকার নানারূপে অদলবদল হয়ে শেষে একটা খুব রিচ জটিলতার সৃষ্টি করে, যা শুধুমাত্র নিজের জোরেই একটা বেশ বিষয় আর কি। অনেক নাচের শিক্ষিকাই প্রিয় ছাত্রীদের খাবার অভ্যেস থেকে শুরু করে পুরুষ বন্ধুর গুণবিচার ইত্যাবধি নানা জিনিসে নাক গলিয়ে তাদের জীবন দুর্বিষহ করে তোলেন। এটাকে তুচ্ছ বিচিং বলে ভাসিয়ে দিলে নাচিয়ের শরীর-মনের এই কূটসম্পর্ককে ছোট করে দেখা হবে। প্রকৃত শরীরভাবী নৃত্যশিল্পীরা বহুদিন ধরে শরীরকে ব্যবহার করতে করতে যেমন শরীরের ভার্চ্যু সম্পর্কে একরকমের ক্লিনিকাল নিস্পৃহতা তৈরী করেন, তেমনি আবার অন্যদিকে শরীরের সাথে তাঁদের আইডেন্টিফিকেশনের ধরণটা আর পাঁচজন মানুষের থেকে আলাদা হয়। অর্থাৎ একদিকে তাঁরা শরীর ও মনকে আলাদা করে দেখতে শেখেন, আবার অন্যদিকে তখন এই দুটি ভিন্ন ধনের মর্মোদ্ধার, সংরক্ষণ ও ভোগ করবার জন্যে তাঁদের দুটি আলাদা সিস্টেম তৈরী করতে হয়। নাচের মিনিমালিজ্ম বলতে এই সেপারেশন বা শুদ্ধ শরীরমুখী ভাবনার কথা বলতে চাইছি।

বেসমেন্ট ২১ – বিশেষত পদ্মিনী চেত্তুরের সাথে কাজ করতে গিয়ে নাচিয়ের শরীর – তার মার্কেটিং ও পলিটিক্স নিয়ে অনেক কথাই ঘুরে ফিরে মনে এসেছে, আসতে বাধ্য – কারণ এইরকম বলিষ্ঠ, জিদ ধরে অবিনোদনী কাজ এ বাজারে খুব কমই দেখা যায়। নাচের মঞ্চে সাধারণত কাহিনিধর্মিতা, বিনোদন, স্টেজ-ফ্রাইট বা প্লেইন এণ্ড সিম্পল ভাবনার অভাব – এইসব নানা কারণে দেঁতো হাসি হাসাই বিহিত, বা গল্পের সাথে তাল মিলিয়ে এক ছটাক অভিমান, এক ছটাক ভয় ইত্যাদি – তা সেগুলোও অনেকসময় ওই দেঁতো হাসিরই নামান্তর, কারণ কেরালার কিছু ক্লাসিকাল ফর্ম ছাড়া নাচে অভিনয়ের ব্যাপারটি কোথাওই আজ আর তেমন গুরুত্বের সাথে বৈজ্ঞানিকভাবে দেখা হয়না। বা কনটেম্পরারি নাচ হলে সেই গুল্লি গুল্লি চোখে এংস্ট – সত্যযুগ হলে দর্শক ভস্মই হয়ে যেত। এই সামান্য জিনিসগুলিকে কেন এতদিন নিজে প্রশ্ন না করে কারুর পথ দেখাবার অপেক্ষায় বসে ছিলাম, তার উত্তর দিতে গিয়ে নিজেকে এই ডাঁটের মাথায় লজ্জিত করবনা। কথা হচ্ছে – নাচের লাইনে যাঁরা করে খান তাঁদের অধিকাংশেরই বুদ্ধির বা সেন্সিটিভিটির কোনো অভাব নেই। তবু এই প্রশ্নগুলো আরো ব্যাপকভাবে ওঠেনা কেন? নৃত্যশিল্পীর মানবমন ছাড়াও তাঁর শরীরের যে আরেক মন থাকে, তাকে খোঁজার প্রয়াস সত্যিই এত অল্পসংখ্যক – সে কি আলস্য, নাকি নাচিয়েরা এই ক্ষীরসদৃশ প্রয়াস শুধু নিজের জন্যে সঙ্গোপনে করে থাকেন, আননাচিয়ে অর্বাচীনের সামনে শুধু বিনোদনের দুধটুকু ঠেলে দিয়ে?

অথচ পদ্মিনীর কাজেও শরীর কিন্তু পুরোপুরি তার লিঙ্গের বাইরে যেতে পারেনা। আমি আজ অব্দি ভারতীয় শিল্পীদের মধ্যে কারুর নাচেই এমনটি দেখিনি যেখানে শরীর সম্পূর্ণ নৈর্ব্যক্তিক। এটা কি একটা জাতীয় বিষয়? পুরুষের শরীর, নারীর শরীর, মায়ের, বেশ্যার, দাসের বা ব্রাহ্মণের শরীর – এই শতসহস্র পরিচয় যা আমরা আমাদের শরীরের সাথে মঞ্চে ও মঞ্চের বাইরে এসোসিয়েট করি, তার বাইরে কি কোনো শরীর আছে – যা এদের সবাইকে ধারণ করে? সেই শরীরের কি আছে এক নিজস্ব সত্বা বা মনন?

আমাদের দেশে একজন সদ্য নাচিয়ের অন্তর্জগতে কিন্তু এই শরীর বিষয়ে ভাবনা শিক্ষক বা সতীর্থের সাহায্য ছাড়া যথেষ্ট জটিল বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে, কারণ আমাদের শিল্পে-সংস্কৃতি-ফ্যাশনে পোষাক খোলাখুলির ছড়াছড়ি, আবার অন্যদিকে শরীর এক নিদারুণ ট্যাবু। দক্ষিণ ভারতে নাচ তার মন্দির-সংস্কৃতির সাথে এমন অঙ্গাঙ্গী জড়িয়ে আছে – তার পিছনের দেবদাসীপ্রথার কথায় নাহয় নাই গেলাম – যে নাচ ওখানে একটা অন্য ধরণের স্বীকৃত বস্তু, কিন্তু খাস কলকাতা শহরেই আমরা যারা ছেলেবয়েসে নাচ শিখতাম, তাদের অনেককেই পাড়ার কাকিমা-দিদিমাদের কটাক্ষ, পরে বড় হয়ে শাশুড়িশ্রেণীর মুখনাড়া-টাড়া কিছু কম শুনতে হয়নি। পাড়া-কালচার ছেড়ে দিই, পদ্মিনীর মঞ্চের একপাশে দ্রুত পোষাক-পরিবর্তন দেখে বহু বাঘা শিল্প-সমঝদার আঁতকে উঠেছিলেন, চন্দ্রলেখাকে বহু মানুষে এমনি চিনুক ছাই না চিনুক – সেই শাদা-চুল ডান্সার যিনি ব্রেসিয়ার পরতেননা – এই বলে চেনে। পরের কথা কি কইব, গেল বছর দিল্লীতে নাচতে গিয়ে ড্রেস রিহার্সালের সময় ডেভিড বলল – এই তোমরা দুজনে চট করে টি-শার্টদুটো বদলে নাওতো, কম্বিনেশনটা ঠিক মানাচ্ছেনা। আর আমি – সে কি এখেনে খুলবো নাকি! – বলে গুটি গুটি স্টেজের বাইরের দিকে হাঁটা লাগাতেই সক্কলে হেসে খুন। কি ইল্লুতে কাণ্ড!

উদয়নে ছাত্রী থাকাকালীন একবারই ওখানকার বার্ষিক অনুষ্ঠানে পারফর্ম করেছিলাম – আমাদের সল্টলেক-ক্লাসের সবাই মিলে একটি নাচ, তাতে মাঝের দিকে আমাদের এক সতীর্থ দাঁড়াতেন, যিনি একবার রিহার্সালের শেষের দিকে বড় বকা খেয়েছিলেন। বোধহয় চন্দ্রোদয় ঘোষ সেদিন মহড়া দেখতে এসেছিলেন – তা সে ভদ্রমহিলা বোধ করি নাচের বেশিরভাগ সময়টাই তাঁর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে নেচেছিলেন। তা দোষটা কি হয়েছিল! আম্মো জীবনের প্রথম নাচটা – সেই মেঘের কোলে রোদ হেসেছে – আগাগোড়া মায়ের দিকে ফিরে এবং দর্শকের দিকে পিছন ফিরে নেচেছিলাম। আসলে মমতাশংকর, চন্দ্রোদয় এদেঁর পরিচয় আমছাত্রীবৃন্দের কাছে শুধু তো উদয়নের সূত্রে নয়, এঁরা তার বাইরেও সেলিব্রিটি, ফলে চোখ চলে গিয়েছিল আর কি, বা ছিল এটেনশন পাবার ইচ্ছে, যা আমাদের নিশ্চয় সকলেরই ছিল – ওনার হয়তো এক্সপ্রেশনটা একটু বেশি ব্যক্ত হয়ে গেছিল শরীরী ভাষায়। যাহোক তাই নিয়ে কি ঝাড়টা খেলেন তিনি! এখন ভাবতে গেলে মনে হয় – ওই যে হাসি হাসি মুখে মসলিনবস্ত্রে দেহপল্লব অংশত ঢেকে আমরা চল্লিশজন ওই নাচটা নেচেছিলাম – কার চোখ টানার উদ্যেশ্যে ছিল সেই হাসি? একা রাস্তায় করলে যা অদ্ভুত, গোষ্ঠীনিয়ম মেনে দলগতভাবে স্বীকৃত প্রসেনিয়ামে করলে তা পারফর্মেন্স হয়ে ওঠে – এটা আমার নাচের বাইরেও খুব ইন্টারেস্টিং মনে হয়।

বাবা বার্জারের আরেকটি বাণী দিয়ে এবার আস্তে আস্তে গোটাতে শুরু করব –

”Compare the expressions of these two women: one the model for a famous painting by Ingres and the other a model for a photograph in a girlie magazine. Is not the expression remarkably similar in each case? It is the expression of a woman responding with calculated charm to the man whom she imagines looking at her – although she doesn’t know him. She is suffering offering up her femininity as the surveyed.”

শুদ্ধ শরীরচর্চা হিসেবে নাচের এই বিশ্লেষণের তত্ত্ব নিয়ে অনেক ভাঁটালাম, এবার দু-চারটে বাজে টেকনিকাল কথা বলি। ভারতীয় কনটেম্পরারি নাচের কাঠামোয় ‘য়োগা’ (যাকে ন্যাকা বাংলায় আমরা আজকাল যোগা বলি), ‘পিলাটেস’ প্রভৃতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই শরীরশাস্ত্রগুলিতে এক, দেহের কেন্দ্রকে ধরে রেখে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবহারের সাথে দেহের গতিশীলতার উপরে জোর দেওয়া হয়, যা নাচে ব্যলেন্স, দম ও একধরণের এসথেটিক নির্মাণে অপরিহার্য্য; দুই, পেশীর ন্যূনতম ব্যবহার ও মূলত হাড়ের গতির সাহায্যে দেহের গতি পরিচালনা শেখায়, যা নিজের শরীর ও তার গতিকে সহজ করে তুলতে আর সাধারণভাবে বুঝতে ভীষণ সাহায্য করে। আশ্চর্যের কথা এই যে দেহের উপর এইমাত্রার কন্ট্রোল না থাকলে কিন্তু দেহকে আবার সুরক্ষিতভাবে যেকোনো গতি অভিমুখে সম্পূর্ণ ছেড়েও দেওয়া যায়না – বাংলায় যাকে প্রাণ খুলে নাচা বলে, তার টেকনিকাল ভার্শনের কথা বলছি। তবে বাড়াবাড়ি রকমের পড়াশুনো করলে লোকে যেমন একটু বোকা হয়ে যায়, এই প্রচন্ড দেহমুখী নাচ তেমনি আবার শরীরী-মস্তিষ্ককে অত্যধিক সচল করে তুলে শরীরে একধরণের জড়তা বলবনা, কিন্তু অনর্থক গতির প্রতি অনীহা তৈরী করে। সেই শরীর নিয়ে তখন আবার সবরকমের ধাঁইকিড়ি নাচ করা যায়না – অন্তত করতে বিরক্তি তৈরী হয়। যাকগে এইসব টেকনিকালিটি গাণিতিক গবেষণার মতই নাচ বোঝার ব্যাপারটাকে খটমট করে তোলে, যেটা আবার প্রোফেশনাল শিল্পীদের পক্ষে শুভকর না হলেও একদিক থেকে আমার মনে হয় ভালই – অনেক বেনো জল বেরিয়ে যায়। আমায় তো আর নাচ শিখিয়ে খেতে হচ্ছেনা!

গত বছর আমার এক প্রাক্তন মার্গীয় নৃত্যের গুরুর এক শো দেখতে গিয়ে একজন পুরনো সতীর্থের সাথে এই নিয়ে দু-একটা কথা হচ্ছিল। সে বেচারী বোধহয় তখন সদ্য সদ্য পদ্মিনীর ‘ওয়াল ডান্সিং’-এর (যদ্দূর মনে আছে, প্রথম কুড়ি মিনিট) শিকার হয়েছে। তো সে ন্যায্য কথাই বলছিল – কী তোরা করিস ছাতার মাথা কিছু মানে হয়না। আমি একটু চেষ্টা করলাম ওই শরীরের কেন্দ্র ধরে ব্যালেন্স রাখার, শরীরকে হালকা করার ব্যাপারটা বোঝাতে; সে খানিক্ষণ হাঁ করে আমায় দেখে আমাদের আরেক বন্ধুকে ফোন করে বলল – শোন মধুশ্রীর মাথাটা না খারাপ হয়ে গেছে, পেটের কাছটা খামচে ধরে কিসব যেন বোঝাবার চেষ্টা করছে …

শরীর, শরীর, তোমার মন নেই?

শেষ পর্বের এই ছোট্ট প্যারাটিকে বাকি লেখাটার এন্টিথিসিস বললে ভুল বলা হবেনা, কিন্তু আগেই বলেছি – নাচের ব্যাপারে আমি তো এমনি এমনি খাই, তাই দুরকমটা একসাথে ঠিক মনে হলেও কেউ আমার দোষ ধরতে যাবেনা।

অঙ্কের গবেষণার কথায় বলেছিলাম দরের প্রশ্নটা ওখানে গৌণ, কাজের আনন্দটাই আসল। কথাটা ঠিক নয়। গবেষণা প্রোফেশনটা দাঁড়িয়ে আছে ফাণ্ডিং-এর উপর। স্বাভাবিকভাবেই নাচের ক্ষেত্রেও তাই। কিন্তু আবারও বলছি – ওই কে দাঁড়িয়ে আছে, কে নেই এই প্রশ্নটাকে যদি যেনতেন প্রকারে মাথার একেবারে বেসমেন্টে ঠেলে দেওয়া যায়, তাহলে আর এই মানি ফ্যাক্টরটি নাচের শৈল্পিক অগ্রগতির কাজে বাধাসৃষ্টি করে বলে আমার বিশ্বাস নয়। শরীরের ডাক এলে – নিজের হাত-পা-চোখ-মাথা-বুক-পিঠ-আঙুল কতভাবে কত ডিগ্রিতে বেঁকিয়ে চুরিয়ে যে কি আনন্দ সেটা যাদের একবার ছুঁয়েছে, কোনোরকম ছন্দ কানে এলেই পা শুড়শুড় করার বাই যাদের আছে, জীবনের প্রতিটি গল্প, ঘটনা, বক্তব্য, অনুভূতি শব্দ দিয়ে প্রকাশ না করে দেহ দিয়ে প্রকাশ করা যাদের স্বভাব, এক কথায় নাচে যাদের ছুঁয়েছে তাদের ঠেকানো মুশকিল। আর এ সবের মধ্যিখানে আছে নিয়তি। প্রতিমা বেদীর ছিল রুমাল হলো বেড়ালের গল্প মনে আছে? ছিলেন সুপার মডেল, কি পাকেচক্রে বৃষ্টি পড়ছিল বলে না কিজন্য একটা হলে ঢুকে দেখেন কি, না বাপের জন্মে যে জিনিসের নাম শোনেননি সেই ওডিসী নাচ হচ্ছে। সেই যে মজলেন, পরের দিনই স্বামীসন্তান ফেলে মুম্বই থেকে একলাফে উড়িষ্যা, বাকিটা তো ইতিহাস। নাচের বা শিল্পের এই টান দেশ-কাল-সমাজ-অর্থ-শিক্ষা মানেনা বলেই তা এত মনোহর। এই একটা জায়গায় কনটেম্পরারি বোঁ করে ক্লাসিকালকে ছাড়িয়ে যায়, কারণ শরীরমুখী কনটেম্পরারির – অন্তত থিয়োরেটিকালি – কোনো পুরুষ,নারী, ব্রাহ্মন,শূদ্র,তামিল, মারাঠি নেই। খালি এস উৎসুক চিত্ত এস আনন্দিত প্রাণ। আবার এই জায়গাটি থেকেই লোকনৃত্য আমার কাছে আকর্ষণীয়, কারণ আদতে তা ধর্ম-তত্ত্ব-সভ্যতার কচকচি বাদ দিয়ে সেই শরীরের টানের সেলিব্রেশন। লোকনৃত্য কথাটা ব্যবহার করা ঠিক হলো কিনা জানিনা কারণ আমি বলছি ফোক, ভাসান, তাসাপার্টি, ফেস্ট, বাসস্ট্যাণ্ডে আড্ডারত শুঁটকো যুবকের হঠাৎ হাস্যমুখ টুইস্ট, হপ্তাবাজারে ভিখিরি শিশুর তিড়িং বিড়িং, পাড়ার ধুনুচি নাচে বেতো জেঠিমার উদ্দাম কোমর দোলানো, এমনকি যা দৈনন্দিন জেসচারমাত্র, যা হঠাৎ কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই একটি দারুণ গতিমুহূর্ত নির্মাণ করে, যেমন উত্তেজনায় টেবিল চাপড়ে ওঠা, খেলতে খেলতে আছাড় খেয়ে হেসে ওঠা, কথা বলতে বলতে হঠাৎ হাত ছাড়িয়ে চলে যাওয়া, হাত বাড়িয়ে কলমটি তুলে অন্যের হাতে দেওয়া – এই সমস্ত অসংখ্য শরীর-পেশীবাজি-যৌনতা-ফ্রাস্ট্রেশন-ক্রোধ-গর্ব-আনন্দ-ঘাম-শান্তি-নির্ব্যক্তি মেশানো বোম্বাচাকের কথা। ব্রুহেলের ‘দ্য ওয়েডিং ডান্স’ বা লত্রেকের মুলা রুঁজ বা সার্কাসের অসম্ভব গতিময় সব ছবি, ইলোরার পাথরে খোদাই রাবণকর্তৃক কৈলাশ উত্তোলনে টালমাটাল শিব-পার্বতী, আবার হঠাতই মেল ট্রেনে চড়ে যাবার পথে ঢিপির মাথায় কৃষককন্যার উদ্ধত শিল্যুয়েট যেমন দেশকালসীমানা ছাড়িয়ে একজন নৃত্যশিল্পীর নাড়ির বেগ বাড়িয়ে দিতে পারে। মিথোলজি নয়, সত্যি সত্যি মানুষের রোজকার জন্মমৃত্যুর উল্লাস, যা নৃত্যশিল্পের গোড়ার কথা – শরীর নাড়াতে হবেই। বাকি পুরোটাই হলো এই শরীরকে নাড়িয়ে যেতে হলে যে নানারকম মশলাপাতি-ফোড়ন-আদা-পেঁয়াজ দরকার তারই যোগাড়। হয়তো নাচিয়ের শরীরের বা গতির যে মন বা আত্মা তাকে একবার আবিষ্কার করতে পারলে বাহ্যিক দেহটিও একদিন অতিরিক্ত হয়ে পড়বে। সুধা চন্দ্রন কাঠের পা লাগিয়ে নেচেছিলেন, নাচিয়ের শুদ্ধ শিল্পীসত্বা একদিন শরীরত্যাগ করে হাওয়ায় ডিগবাজি খাবে।

************************

References

My Life – Isadora Duncan
Timepass – Protima Bedi
Chandralekha – Woman, Dance, Resistance – Rustam Bharucha
Moon Walk – Michael Jackson
Ways Of Seeing – John Berger
Dance (Celebrations In Art) – Jennifer Bright
Minimum – John Pawson
The Language Of Kathakali – G. Venu
অভিনয় দর্পণ (অশোকনাথ শাস্ত্রীর অনুবাদ)
হস্তলক্ষণদীপিকা
দক্ষিণের বারান্দা – মোহিতলাল মজুমদার
http://pad.ma
http://basement21.wordpress.com
http://gatidance.com/
http://attakkalari.org/
http://www.mamatashankarballettroupe.org/
http://www.kadamb.org/
http://www.rhythmosaic.com/

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s