সম্মান ও অধিকারের দাবিতে নারিকুরাভাদের সাংবিধানিক লড়াই

 

(দুর্বার, মার্চ ২০১৬)

ফেব্রুয়ারি ৬, ২০১৬ , রাউন্ডটেবল ইন্ডিয়া (http://roundtableindia.co.in/ )-র প্রতিবেদন থেকে অনুদিত

অনুবাদকের ভূমিকা

নারিকুরাভাদের সাথে চেন্নাই শহরে ঘুরতে ফিরতে দেখা হয়। বাসস্ট্যান্ডের পাশে বা সমুদ্রের ধারে ময়লা চট পেতে পুঁতির মালা বিক্রি, ফুটপাতে ছেলে-মেয়ে-কুকুর-বিড়াল নিয়ে ভরভরন্ত সংসার পেতে দিবানিদ্রা, পরিবারবর্গ সমেত দল-কে-দল ‘হারিয়ে গেছি, সাহায্য করুন’ বলে মোড়ে মোড়ে হাত পেতে দাঁড়ানো এই যাযাবর ‘জিপসি’ নারিকুরাভন উপজাতি সত্যিই ভারতীয় সমাজব্যবস্থার ইতিহাসে, বৈষম্যবাদী আইনের গলিপথে হারিয়ে যাওয়া এমন আরও লক্ষ লক্ষ মানুষের অন্যতম প্রতিনিধি। অন্যদিকে আবার এ দেশের কোনো প্রতিষ্ঠানেই এঁদের অবস্থার কথা তুলে ধরার মত কোনো প্রতিনিধি নেই।

নারিকুরাভন তামিলনাড়ুর দরিদ্রতম উপজাতিগুলির মধ্যে একটি। এঁদের ভাষা তামিল, তেলেগু ও মারাঠি মেশানো, যার নাম ভাগরি বোলি। ‘নারি’ শব্দের অর্থ ‘শিয়াল’, ‘কুরাভার’ – মানুষ। শিয়াল ধরার ফাঁদ বানাতে ওস্তাদ এই উপজাতির আদি জীবিকা ছিল শিকার। ক্রমশ এঁরা নিজেরাই জাত-ভেদ, প্রশাসনিক অত্যাচার, এবং একচোখো সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন ও নগরায়নের শিকার হয়ে কর্মসংস্থান হারান। অরণ্যে প্রবেশ ও শিকারের উপর আইনি বাধানিষেধ সৃষ্টির ফলে (ঊনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে এ প্রসঙ্গে অনেকগুলি আইন জারি হয়) ও সাধারণভাবে সমাজের বহুমুখী চাপে কোণঠাসা হতে হতে এঁরা অন্যান্য খুচরো পেশা বেছে নিতে থাকেন – যেমন নানান পুঁতির মালা, ঝুড়ি প্রভৃতি তৈরি ও বিক্রি, বাসনপত্র ও জড়িবুটি বিক্রি, জ্যোতিষচর্চা, কাগজ কুড়নো – সবই রাস্তায় ঘুরে ঘুরে। ফলে এভাবেও বলা যায় যে, সমাজ এঁদের যাযাবর হতে বাধ্য করেছিল। এদিকে হতদারিদ্র্য, বৈষম্য ও জীবনধারণের ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধার অভাবে এঁদের মধ্যে ‘অপরাধী’র সংখ্যা বাড়তে থাকে – অন্তত প্রচলিত আইনি দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী। চুরিডাকাতি, জালিয়াতি, চোরাশিকার ইত্যাদি নানা খুচরো অপরাধে এঁদের গ্রেপ্তার করা হয় প্রায়ই। কারণ দেশের সামগ্রিক অপরাধের মাত্রা বিচারে এঁদের অপরাধের ভার তুচ্ছ হলেও এঁদের গ্রেপ্তার করা সহজ, সহজ এঁদের উপর দোষ চাপিয়ে দেওয়া।

১৮৭১ সালে ব্রিটিশ সরকার নারিকুরাভন সমেত এ দেশের ১৫০টি জনগোষ্ঠীকে ‘ক্রিমিনাল’ বা অপরাধী তকমা দেয়। এই গোষ্ঠীগুলির প্রতিটিই দরিদ্র ও তথাকথিত ‘নীচু জাত’, অর্থাৎ কিনা যাঁদের ঘাঁটালে সমস্যা নেই, উপরন্তু যাঁদের ধরপাকড় করলে পুলিশি তৎপরতার পরাকাষ্ঠা দেখানোর একটা সহজ পথ খুলে যায়, কেননা এ দেশের তথাকথিত ‘উচ্চ’ বর্ণের মানুষও এঁদের এইভাবে দেখতেই অভ্যস্ত ছিলেন। শাসনব্যবস্থার এই কার্য-সমীকরণ আজও ব্যাহত হয়নি। যদিও ১৯৫২ সালে এই গোষ্ঠীগুলিকে ‘ডিনোটিফায়েড’ করা হয়, অর্থাৎ অপরাধীর তকমা খুলে নেওয়া হয়, কিন্তু তাতে তাঁদের প্রতি বাদবাকি সমাজের ব্যবহার বিশেষ বদলায়নি। নারিকুরাভনদের কথাই ধরা যাক – বর্তমানে তামিলনাড়ুর শহর ও মফস্বলের নোংরা বস্তিতে বা ছোট ছোট প্রান্তিক গ্রামে এঁদের বসবাস। অসুখ, অশিক্ষা, দারিদ্র্য, সামাজিক ঘৃণা ও পুলিশি ধরপাকড় এঁদের নিত্যসঙ্গী। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ছাড়াও যে সমস্ত সুযোগ-সুবিধা আমরা অনেকেই স্বাভাবিক অধিকার বলে জেনে এসেছি, তেমন বহু ক্ষেত্রেই এঁদের প্রতিনিয়ত লড়াই চালিয়ে যেতে হয় –  যেমন নিত্যব্যবহার্য জল, স্থায়ী বসবাসের জমি ও তার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ব্যাঙ্ক লোন ইত্যাদি, কিন্তু এই লড়াই সবচাইতে বেশি সম্মানের, সহমর্মের। ভারতবর্ষের অধিকাংশ ‘ডিনোটিফায়েড’ উপজাতিরই এই একই ইতিহাস।

নারিকুরাভারা বর্তমানে রাজ্য সরকারের বিচারে ‘মোস্ট ব্যাকওয়ার্ড ক্লাস’ (MBC) বলে গণ্য হন। এঁরা তফশিলি উপজাতিভুক্ত (ST) হওয়ার জন্য আন্দোলন চালিয়ে আসছেন দশকের পর দশক ধরে। হালে, ২০১৫-র লোকসভায় এই লড়াই আরও একবার অসাফল্যের মুখ দেখল। এ নিয়ে আন্দোলন চলাকালীন তামিলনাড়ু নারিকুরাভন কুরুভিকরন ওয়েলফেয়ার ফেডারেশন (TNKWF)-এর কো-অর্ডিনেটর এম জয়শঙ্কর বিবৃতি দেন যে, নারিকুরাভারা যদি MBC থেকে ST হিসেবে গণ্য হতে পারেন, তাহলে উচ্চ সরকারি পদে তাঁদের চাকরি পেতে সুবিধা হতে পারে এবং তাতে সামগ্রিকভাবে তাঁদের গোষ্ঠীর উন্নতিসাধন হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে, বর্তমানে ত্রিশ-চল্লিশ হাজার নারিকুরাভার মধ্যে মাত্র একজন মহিলা – ইন্দিরা – এ জাতীয় সরকারি পোস্টে আছেন (ফরেস্ট রেঞ্জ অফিসার, চেন্নাই)।

এইসব নিয়েই এই প্রতিবেদন।

রাউন্ডটেবল ইন্ডিয়া-র প্রতিবেদন

NDMJ-NCDHR (ন্যাশনাল দলিত মুভমেন্ট ফর জাস্টিস-ন্যাশনাল ক্যাম্পেন অন দলিত হিউম্যান রাইটস)

প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে নারিকুরাভন কুরুভিকরন গোষ্ঠী তফশিলি উপজাতি (শিডিউল ট্রাইব বা ST) হিসেবে ছাড়পত্র পাওয়ার সাংবিধানিক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

নারিকুরাভন একটি যাযাবর উপজাতি। ওঁরা নানারকম গয়না, বিশেষত জপমালা – যেমন রুদ্রাক্ষের মালা – তৈরি করেন। দক্ষিণ ভারতে মন্দির-অর্থনীতির সাথে এই মালার বিক্রিবাটা চিরদিনই অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে, যেমন কেরালার বিখ্যাত সবরিমালার আইয়াপ্পা তীর্থযাত্রীদের মধ্যে এর চাহিদা প্রচুর। এছাড়া নারিকুরাভারা প্লাস্টিকের বাসনপত্র এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনের নানান খুঁটিনাটি জিনিসও বিক্রি করেন। তামিলনাড়ুতে প্রায় ত্রিশ হাজার নারিকুরাভার বসবাস। দেশের কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক স্তরেই এঁদের কোনো প্রতিনিধি নেই। বর্তমানে এঁরা তামিলনাড়ুতে ‘মোস্ট ব্যাকওয়ার্ড ক্লাস’ (MBC) এবং কেন্দ্রীয় সরকারের তালিকায় ‘আদার ব্যাকওয়ার্ড ক্লাস’(OBC)-এর অন্তর্গত।

নারিকুরাভাদের পক্ষে তাঁদের বংশগত পেশা ছেড়ে বেরোনো প্রায় অসম্ভব। MBC বা OBC সার্টিফিকেট বার করা আর ব্যবহার করা দুটোই এত জটিল যে অধিকাংশ যুবকযুবতীই তাঁদের পুরুষানুক্রমে চলে আসা ব্যবসাতেই ফেরত যান। এই প্রজন্মের যে নারিকুরাভারা তাঁদের অধিকারের দাবি নিয়ে এগিয়ে যেতে চাইছেন, তাঁরা মূলত আধুনিক জীবনধারার সুযোগ-সুবিধাগুলির অধিকার এবং শিক্ষার অধিকার – এই দুটি বিষয়কেই প্রাধান্য দেন।

১৯৬৫ সালে লোকুর কমিটি[i] থেকে নারিকুরাভন (কুরুভিকরন) উপজাতিকে তফশিলি উপজাতিভুক্ত করতে সুপারিশ করা হয়। এই কমিটির মূল উদ্দেশ্য ছিল নানান জাতি ও উপজাতির ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক প্রেক্ষাপট ও তাঁদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষার অবস্থার মূল্যায়ন করা। নারিকুরাভাদের ক্ষেত্রে এই সুপারিশ অবশ্য কার্যকরী হয়নি। কমিটির রিপোর্টে নারিকুরাভন উপজাতিকে নিজস্ব বিশেষ রীতিনীতিসমৃদ্ধ ‘ভেরি ব্যাকওয়ার্ড ট্রাইব’ বলে বর্ণনা করা হয়েছিল।

১৯৮০ সালে তৎকালীন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম জি রামচন্দ্রন কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে নারিকুরাভাদের তফশিলি উপজাতি বলে মেনে নেওয়ার প্রস্তাব রাখেন। তখন বা তারপরেও এ নিয়ে আর কোনো কাজ বিশেষ এগোয়নি। শেষ পর্যন্ত ২০১৩ সালের ১৮ই ডিসেম্বর ইউপিএ সরকার প্রায় বাধ্য হয় একটি বিল[ii] (১৬০/২০১৩) পেশ করতে যার মাধ্যমে এঁদের তফশিলি নথিভুক্ত করা যেতে পারত। এর কারণ ছিল এই যে, নারিকুরাভারা ডিএমকে প্রেসিডেন্ট করুণানিধি এবং মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতা – এই দুজনকেই তাঁদের দাবির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করাতে সক্ষম হয়েছিল। এ সত্ত্বেও ২০১৪ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি লোকসভায় একজন সাংসদও এই বিল সমর্থন না করায় এটি শেষ পর্যন্ত কার্যকরী করা যায়নি।

নারিকুরাভারা চেয়েছিলেন লোকসভার শীতকালীন অধিবেশনে ওই বিলটি পাস করানো হোক। এই উপলক্ষে প্রায় পঞ্চাশ জন নারিকুরাভা নারী, শিশু ও পুরুষ তামিলনাড়ু নারিকুরাভন কুরুভিকরন ওয়েলফেয়ার ফেডারেশন (TNKWF) ব্যানার নিয়ে তামিলনাড়ু থেকে দিল্লী যান। সেখানে সাংসদদের ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের সাথে দেখা করার জন্য তাঁরা ২০১৫-র ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু করে প্রায় দু’সপ্তাহ পাহাড়গঞ্জের একটি ছোট্ট লজে থাকেন। চৌঠা ডিসেম্বর থেকে তাঁরা দিল্লীর যন্তর মন্তরে একটি অনশন আন্দোলনও শুরু করেন। কেন্দ্রীয় সরকার থেকে বলা হয় যে, অবিলম্বে এই বিলটি পাস করানো হবে।

পার্লামেন্টের নানান সদস্য ও মন্ত্রীদের সাথে বেশ কয়েকবার কথাবার্তা হওয়ার পর ৯ই ডিসেম্বর পি রাধাকৃষ্ণণ (মন্ত্রী, স্টেট ফর রোড ট্রান্সপোর্টস, হাইওয়েজ এন্ড শিপিং) জুয়াল ওরম-কে (মন্ত্রী, ট্রাইবাল অ্যাফেয়ারস) একটি চিঠি লেখেন, যাতে নারিকুরাভাদের তফশিলি জাতিভুক্ত করার বিষয়টিতে রীতিমত জোর দেওয়া হয়। রাধাকৃষ্ণণ লেখেন যে, এই উপজাতি যাযাবর, ভবঘুরে, অত্যন্ত দরিদ্র এবং তামিলনাড়ুর সবচাইতে অসহায় উপজাতিগুলির মধ্যে একটি। এঁদের ৮৭% মানুষ সম্পূর্ণ অশিক্ষিত এবং এঁদের মধ্যে মাত্র ০.০২% মানুষ গ্র্যাজুয়েট হয়ে উঠতে পারেন। এঁদের এই অবস্থার উন্নতিসাধনের চেষ্টাতেই এঁরা তফশিলি উপজাতি হিসেবে নথিভুক্ত হতে চেয়ে দাবি রেখেছেন।

শীতের লোকসভাতেও এই বিলটি পাস করানো যায়নি। এই উপজাতির লড়াই আজও চলছে। এঁদের সম্পর্কে আরও বিস্তারিত প্রচার করলে, সচেতনতা বাড়ালে ও সমাজের নানা স্তরে এঁদের অধিকারের দাবিতে সোচ্চার হওয়ার সমবেত চেষ্টা করলে পরবর্তী পার্লামেন্ট সভায় এই বিলটি পাস করানো সম্ভব হতে পারে।

 

[i] ‘ট্রাইব’ বা ‘উপজাতি’ শব্দের প্রকৃত সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও লোকুর কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘স্পেশিয়াল অরগ্যানাইজেশন’ বা স্থানিক সংগঠন (বিচ্ছিন্ন ও সমাজ-বহির্ভূত অস্তিত্ব), স্বতন্ত্র সংস্কৃতি, আদিম রীতিনীতি, বাদবাকি সমাজের সাথে যোগাযোগ গড়ে তুলতে অস্বস্তি এবং আর্থ-সামাজিক ও শিক্ষাবিষয়ক পশ্চাদপদতা।

[ii] কনস্টিটিউশন (শিডিউল ট্রাইবস) অর্ডার (দ্বিতীয় সংশোধন) বিল, ২০১৩।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s