শ্রমজীবী শ্রেণির উপর নিপীড়ন এবং শ্রমিক সংগঠনগুলির লক্ষ্য (ফোকাস : তামিলনাড়ু)

(অনুবাদ লেখা)

লেখকঃ চন্দ্রিকা রাধাকৃষ্ণণ

(তামিলনাড়ুতে অবস্থিত টি.এন.লেবার বা ‘তোলিলালার কুডম’ ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য)

 

(আয়নানগর, বইমেলা, জানুয়ারি ২০১৮)

মূল লেখা (ইংরিজি) – আয়নানগর অনলাইন মে ২০১৬আয়নানগর অনলাইন মে ২০১৭

অনুবাদকের কথা

এই লেখা ছাপা হবার মাসখানেক আগে, ডিসেম্বরের শেষে, বিজেপি সরকার ঝাড়খণ্ডে মজদুর সংগঠন সমিতি (এমএসএস) নামক রেজিস্টার্ড সংগঠনটিকে অলীক অজুহাতে বেআইনি ঘোষণা করে। সংগঠনটির ব্যাপক জনপ্রিয়তাই বর্তমান সরকারের গভীর নিরাপত্তাহীনতায় ইন্ধন জুগিয়েছে, সে বিষয়ে সন্দেহের খুব একটা অবকাশ থাকে না। অথচ একটি সম্পূর্ণ আইনি ভাবে রেজিস্টার্ড এই সংগঠনের উপর এই আকস্মিক নিষেধাজ্ঞা নিয়ে নিয়ে ট্রেড ইউনিয়ন জগতে খুব বেশি আন্দোলন বা প্রতিবাদ শোনা যায়নি এখনও। চন্দ্রিকা রাধাকৃষ্ণণদের টি.এন. লেবার ব্লগে এ নিয়ে সম্প্রতি একটি বিস্তারিত লেখা ছাপা হয়, যেখানে শ্রমিক সংগঠনের সরকারি অবদমন নিয়ে প্রত্যক্ষ উৎকণ্ঠার পাশাপাশি শ্রমিক সংগঠনগুলির কর্মপদ্ধতি, পারস্পরিক সম্পর্ক ইত্যাদি নিয়ে এক গভীর পরোক্ষ উৎকণ্ঠাও অনুভব করা যায়। চন্দ্রিকার বর্তমান লেখাটিও সেই একই উৎকণ্ঠার এক গঠনমূলক ফসল, যা আয়নানগরে অনলাইন প্রকাশিত হচ্ছে ধারাবাহিক ভাবে, ইংরিজিতে। দুটি ইতিমধ্যেই প্রকাশিত লেখার বাংলা অনুবাদ ছাপা হল এখানে।

ভূমিকা

২০১১ সালে রাজস্থানের টাপুকেরায় দা হোন্ডা মোটরসাইকেল অ্যান্ড স্কুটারস ইন্ডিয়া ফ্যাক্টরি (এইচ.এম.এস.আই.) চালু হয়। এতে মূলত আই.টি.আই. প্রশিক্ষণ পাওয়া ৩৬০০ জন কর্মীকে কাজে নেওয়া হয়। দিনে ৫০০০টি গাড়ি নির্মাণের লক্ষ্যে তৈরি এই ফ্যাক্টরিতে এঁদের মধ্যে মোটে ৪৬৬ জন শ্রমিককে স্থায়ী চাকরি দেওয়া হয়।[১] বাকি তিন হাজারেরও বেশি কর্মী অস্থায়ী চুক্তি-শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে থাকেন। উন্নত স্বয়ংচালিত যন্ত্র বা অটোমেশনের ব্যবহার সত্ত্বেও দিনে ৫০০০টি গাড়ি তৈরির ঝলমলে হিসেবের পিছনে শ্রমিকদের কাজের অতিরিক্ত চাপ এবং বাধ্যতামূলক ওভারটাইমের ইতিহাস লুকিয়ে ছিল। কনট্র্যাক্ট-শ্রমিকদের মাইনে শুরু হচ্ছিল মোটে ১০০০০ টাকা থেকে; যাঁদের চাকরি পাকা ছিল তাঁরাও ২২০০০ টাকার বেশি মাইনে পাচ্ছিলেন না। সমস্ত স্থায়ী কর্মীরা প্রথম তিন বছর প্রশিক্ষণের মধ্যে দিয়ে গিয়েছিলেন; তারপর আরও ছ’মাস তাঁদের প্রোবেশনে রাখা হয়। সেসময় তাঁদের অবমাননাকর প্রাত্যহিক অবস্থার ভিতরে থেকে কাজ করতে হয়েছিল। শুধুমাত্র চাকরি পাকা হবার ভরসায় তাঁরা মানিয়ে চলতে বাধ্য হন। অবশ্য প্রোবেশনের শেষে পাকা চাকরিও তাঁদের ‘শপ-ফ্লোরে’ সুপারভাইজারদের দুর্ব্যবহার, দৈনন্দিন কাজের শারীরিক ও মানসিক চাপ এবং নিরাপত্তার অভাব থেকে মুক্ত করতে পারেনি।

২০১৫ সালে এই কোম্পানির স্থায়ী ও অস্থায়ী শ্রমিকরা মিলে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন এবং মাইনে বাড়াবার, ও সাধারণভাবে কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতির দাবিতে মালিকপক্ষের সাথে কথা শুরু করার চেষ্টা করতে থাকেন।[২] সংগঠনের রেজিস্ট্রেশন জমা পড়ার কয়েক মাসের মধ্যে সংগঠনের প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারি সমেত চারজন কর্মীর চাকরি চলে যায় এবং আরও পাঁচজনকে সাসপেন্ড করা হয়। শ্রমিক এবং মালিকপক্ষের এই দ্বন্দ্ব চূড়ান্ত অবস্থায় পৌঁছয়, যখন একজন অস্থায়ী কর্মী পরপর তিন দিন টানা ওভারটাইম করার পর চার দিনের দিন আর ওভারটাইম করতে অস্বীকার করেন, এবং এই কারণে তাঁকে একজন সুপারভাইজারের নিপীড়নের সম্মুখীন হতে হয়। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রায় ২০০০ জন স্থায়ী ও অস্থায়ী শ্রমিক স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে একটি অবস্থান করেন। তাঁদের যে শুধু পুলিশ দিয়ে মার খাইয়ে তুলে দেওয়া হয় তা-ই নয়, সরাসরি চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। বহু স্থায়ী শ্রমিকের উপর উল্টে পুলিশকে আক্রমণ করার নকল চার্জশিট দাখিল করা হয়।

শ্রম এবং পুঁজির সাম্প্রতিক ইতিহাসে হোন্ডা মালিকপক্ষের এই অত্যাচার কোনো অভিনব ঘটনা নয়। বেশ কয়েক বছর আগে চেন্নাইয়ের কাছে শ্রীপেরাম্বুদুর শিল্পাঞ্চলে হুন্ডাই কোম্পানি, যা ছিল ভারতে একদম প্রথমদিককার একটি অটোমোবাইল এম.এন.সি., এই একই ঘটনা ঘটিয়েছিল। ১৯৯৬-এ তৈরি এই ফ্যাক্টরিতে শ্রমিকরা সংগঠন তৈরির অধিকার নিয়ে ২০০৭ সাল থেকে লড়াই চালিয়ে আসছিলেন। হোন্ডার মতোই, রাষ্ট্র এবং মালিকপক্ষ হাত মিলিয়ে সংগঠনের নেতাদের চাকরি থেকে ছাঁটাই এবং দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ট্রান্সফার সমেত নানান শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে নিপীড়ন পদ্ধতি জারি করে। মালিকদের তরফ থেকে একটি শ্রমিক সংগঠনও খাড়া করা হয়, যাঁরা মালিকের হয়ে কথাবার্তা চালাবার কাজ করেন। কিন্তু কোনোভাবেই কোনো প্রচলিত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে – যেমন গোপন ব্যালটের মাধ্যমে – শ্রমিকদের নিজেদের গড়ে তোলা সংগঠনকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না।

ভারতীয় বাজারের উদারনৈতিক অর্থনীতি যত বৃদ্ধি পেয়েছে, ‘ম্যানুফ্যাকচার বেস’ হিসেবে ভারতের পরিচয় পৃথিবী জুড়ে যত ছড়িয়ে গেছে, তামিলনাড়ু (হুন্ডাই, প্রাইকল, ফক্সকন), রাজস্থান (শ্রীরাম, হোন্ডা টাপুকেরা), হরিয়ানা (মারুতি, হোন্ডা), গুজরাট (টাটা) সমেত গোটা দেশের শ্রমিকদের অবস্থা ততই খারাপ হয়েছে, তাঁদের অধিকার ততই খর্ব হয়েছে। কম মজুরি, চুক্তি-শ্রমের আধিক্য, যথেচ্ছ ‘হায়ার অ্যান্ড ফায়ার’ পলিসি, কাজের মাত্রাতিরিক্ত চাপ – শ্রমিকদের শপ ফ্লোরের দৈনন্দিন জীবন-অভিজ্ঞতা বলতে এইসবই। সংগঠিত ভাবে তাঁদের অধিকারের দাবি রাখার চেষ্টা করা ছাড়া এই অবস্থার প্রতিরোধের আর কোনো উপায় নেই।

ভারতীয় সংবিধানের আরটিক্ল্‌ ১৯ অনুযায়ী সংগঠন শ্রমিকদের মূলগত অধিকার। ট্রেড ইউনিয়ন অ্যাক্ট এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিসপিউটস অ্যাক্ট শ্রমিকদের হাতে সংগঠন তৈরি করার এবং নানান অন্যায্য ব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার অধিকার তুলে দেয়। অথচ এইসব আইন থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় শ্রমিকরা ক্রমাগতই রাষ্ট্র এবং মালিকপক্ষের তরফ থেকে নানা অধিকারের বিরুদ্ধে বাধার সম্মুখীন হয়ে চলেছেন। ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল লবি’ এবং কর্পোরেটের কাছে বিকিয়ে যাওয়া সরকারি দপ্তর এবং মিডিয়া সর্বক্ষণ শ্রমিক সংগঠনগুলিকে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিপন্থী বলে প্রচার করে চলেছে। আমরা উদাহরণসমেত দেখব, কীভাবে এই আইনগুলি থাকা সত্ত্বেও পুঁজি বিভিন্ন আইনি ও বেআইনি পথে শ্রমিকদের শোষণ করে চলে।

শোষণের এই নতুন পথগুলি শ্রমিক সংগঠনগুলির সামনে নিত্যনতুন ‘চ্যালেঞ্জ’ ছুঁড়ে দিচ্ছে। নতুন পথ সন্ধানের পাশাপাশি ইউনিয়নগুলিকে আবার একই মারুতি, প্রাইকল, ব্যাঙ্গালোরের বস্ত্রশিল্প-শ্রমিকদের মতো জোরদার শ্রমিক আন্দোলন নির্মাণের কাজও করে যেতে হচ্ছে, হবেও।

এক

 কর্পোরেট সেক্টরে মালিকপক্ষ কীভাবে এই আইনগুলিকে অগ্রাহ্য করে?

ভারতীয় শ্রমিক আইনের মধ্যে যেগুলি শ্রমিক ও মালিকের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলে, তার বেশিরভাগই স্বল্প সংখ্যক ‘পাবলিক সেক্টর’ এবং ‘ফর্মাল (ম্যানুফ্যাকচারিং) সেক্টরের’ বাইরে কোথাও ব্যবহার করা সম্ভব নয়। ৯২%-এর বেশি শ্রমিক হয় তাঁদের চাকরির ধরন আলাদা হবার কারণে, নয় আইনের আওতার বাইরে থাকার কারণে এর সুযোগ নিতে পারেন না। তার উপর শিল্প-পুঁজিও ফর্মাল সেক্টরের শ্রমিকদের বঞ্চিত করার নানা নতুন উপায় বার করে চলেছে।

যেমন, শিল্পক্ষেত্রে ক্রমাগত বাড়তে থাকা চুক্তি-শ্রম, যা আসলে চুক্তি-শ্রম আইনের (কনট্র্যাক্ট লেবার অ্যাবোলিশন অ্যান্ড রেগুলেশন অ্যাক্ট) উল্টো পথে হাঁটছে। এই আইনের সূত্রপাত হয় ফর্মাল সেক্টরে চুক্তি-শ্রম কমাবার উদ্যোগে। এই আইন মূল পণ্য উৎপাদনে স্থায়ী ভাবে চুক্তি-শ্রম প্রয়োগের বিরুদ্ধতা করে। অথচ উদ্দেশ্য মহৎ হওয়া সত্ত্বেও এই আইনে নানান সংজ্ঞা অস্বচ্ছ রাখা হয়েছে এবং কীভাবে এর প্রয়োগ হবে সে বিষয়েও পরিষ্কার বক্তব্য রাখা হয়নি। কাকে ‘স্থায়ী’ বলা হবে, তার সংজ্ঞা রাষ্ট্রের হাতে না রেখে শিল্পমালিকদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। শ্রীপেরাম্বুদুরের নোকিয়া এস.ই.জেড.-এ নোকিয়ার উদাহরণটি নেওয়া যাক। এখানে ১৪০০০ কর্মীকে চাকরি দেওয়া হুয়, যার মধ্যে ২০ শতাংশেরও বেশি ছিলেন চুক্তি-শ্রমিক। যদিও নোকিয়া দাবি করে, যে তারা মূল পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে এই চুক্তি-শ্রমিকদের ব্যবহার করেনি, রাজনৈতিক কর্মীরা তার প্রতিবাদে জানান, যে চুক্তি-শ্রমিকদের ক্ষেত্রগুলিও আসলে নোকিয়ার মূল উৎপাদনে অবশ্যপ্রয়োজনীয়ই ছিল।[৪]

নোকিয়ার নিজস্ব সাপ্লায়াররা অবশ্য মূল উৎপাদনেই চুক্তি-শ্রম ব্যবহার করে। নানান ছাড়ের মাধ্যমে রাজ্য সরকারও এতে মদত যোগায়।[ক] বিভিন্ন গবেষণা ও রিপোর্ট থেকে দেখা গেছে যে স্থায়ী শ্রমের পরিমাণ ১৯৯৫ সালে ৬৮% থেকে ২০১০ সালে ৫২%-এ নেমে গেছে, আর ঐ একই সময়ে চুক্তি-শ্রম বেড়েছে সাড়ে দশ শতাংশ থেকে পঁচিশ শতাংশে।[৩] বড় বড় কোম্পানি, যারা ৫০০০-এর বেশি শ্রমিক নিয়োগ করে, তাদের শ্রমিকদের মধ্যে ৫০ শতাংশেরও বেশি অস্থায়ী চুক্তিবদ্ধ। মানেসরের মারুতি সুজুকি প্ল্যান্টে, ২০১২-য় শপ ফ্লোরের দ্বন্দ্ব যেখানে প্রায় জঙ্গি চেহারা নিয়েছিল, ৮০ শতাংশেরও বেশি কর্মী চুক্তি-শ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন।[৫] ২০১৪ সালে তামিলনাড়ুতে যখন নোকিয়া আর ফক্সকন তাদের কারখানা বন্ধ করে দেয়, চুক্তি-শ্রমিকরাই সবার আগে চাকরি ফিরে পাবার ব্যাপারে হাল ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। তাঁদের ভাগ্যে ছাঁটাই-এর কোনো ক্ষতিপূরণও জোটেনি।

ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিসপিউট অ্যাক্ট শ্রমিকদের বেধড়ক ছাঁটাই আটকাতে এবং শ্রমিক-রাষ্ট্র-মালিকক্ষের ত্রিমুখী আলোচনার মাধ্যমে মালিক-শ্রমিক দ্বন্দ্বের সমাধান করতে সহায়তা করে। যেকোনো শ্রমিক যিনি ২৪০ দিনের বেশি একই কোম্পানিতে কাজ করেছেন, তিনি এই অ্যাক্ট-এর আওতায় পড়েন। অথচ আইনি অনুসন্ধানের সময় ‘ফ্যাক্টরি ইন্সপেকশন’ বা ঐ জাতীয় পদ্ধতি নিয়োগ করে শ্রমিকদের চাকরির রেকর্ড পর্যবেক্ষণ করার বদলে, উল্টে শ্রমিকদের উপরেই তাঁরা কতদিন চাকরি করেছেন, কবে কাজ শুরু করেছিলেন, সেইসব প্রমাণ করার দায় এনে ফেলা হয়। এদিকে আমাদের দেশে ৭৫%-এরও বেশি শ্রমিকের চুক্তিপত্র বেআইনি – প্রায় বাজে কাগজের ঝুড়িতে ফেলে দেবার সামিল।[৩] এইভাবে এ দেশের আইন কনট্র্যাক্ট লেবার অ্যাক্ট বা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিসপিউট অ্যাক্ট-এর আইনি সুযোগসুবিধা থেকে শ্রমিকদের বঞ্চিত করে, তাঁদের নিরাপত্তার বিষয়টি সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে, মালিকপক্ষের ভজনা করে চলে।

তার উপর শ্রমের নতুন নতুন বিভাজন ঘটিয়ে কোনো কোনো বিভাগের কর্মীকে যথাযথ অর্থে শ্রমিক বলে আর স্বীকারই করা হয় না। আগে যেমন ৩ থেকে ৬ মাসের প্রোবেশন পিরিয়ডের পর কর্মীদের স্থায়ী শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ করে নেওয়া হত, সে দিন আর নেই। এখন শ্রমিকরা কাজে ঢোকেন ‘ট্রেইনি’ বা প্রশিক্ষণে থাকা কর্মী হিসেবে। এই পদ্ধতিটি একেবারেই শ্রমিক আইন-বহির্ভূত। বর্তমান ইন্ডাস্ট্রির নিয়ম হল এই ট্রেইনিরা আসলে শ্রমিকপদবাচ্য নন, এমনকি এঁদের মজুরি পাবার সাধারণ অধিকারটুকুও নেই, যদিও এঁরা সবসময়েই স্থায়ী ও অস্থায়ী কমরেডদের পাশাপাশি একই ভাবে শ্রম দান করে চলেছেন।

এইসব নিত্যনতুন বেআইনি খুঁটিনাটির সুযোগ নিয়ে মালিকরা এই শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির অধিকার, সংগঠন গড়ে তোলার অধিকার এবং আরও নানা আইনি সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে থাকেন। ২০১৫-য় চেন্নাইয়ের লুকাস টিভির ট্রেইনিদের প্রতিবাদের ঘটনা থেকে এটি পরিষ্কার বোঝা যায়। প্রায় ২০০০ প্রশিক্ষণে থাকা কর্মচারী (‘ট্রেইনি’ এবং ‘অ্যাপ্রেন্টিস’) সঠিক মজুরি এবং খাদ্যের দাবিতে একটি তাৎক্ষণিক কর্মবিরতি (‘ফ্ল্যাশ স্ট্রাইক’) ডাকার পর, সম্পূর্ণ অকর্মণ্য লেবার ডিপার্টমেন্টের সুযোগ নিয়ে মালিকপক্ষ তাঁদের চাকরি থেকে ছাঁটাই করে।[৬] এই নতুন শ্রমিক-বিভাজন পদ্ধতি বিষয়ে রাষ্ট্র যে শুধু কোনো বিরুদ্ধতা করছে না তাই নয়, উল্টে ‘স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামে’র মাধ্যমে শপ ফ্লোরে অ্যাপ্রেন্টিসদের দিয়ে কাজ চালানোর আরও বেশি সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। আসলে এটা শিল্পমালিকদের নানাভাবে আরও বেশি ছাড় পাইয়ে দেবারই একটি পদ্ধতি।

আইন যখন ছিদ্রময়, শ্রমিকদের পরাজয় কি অবশ্যম্ভাবী?

কনট্র্যাক্ট লেবার অ্যাক্ট আর ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিসপিউট অ্যাক্ট-এর ক্ষেত্রে যেমন দেখা গেছে, সেইভাবে প্রায় সমস্ত শ্রমিক আইনই শিল্পক্ষেত্রে মালিকপক্ষের হাতে শ্রমিকদের অধিকার খর্ব করার আরও বেশি সুযোগ তুলে দেবার প্রয়োজনেই ব্যবহার করা হয়। ট্রেড ইউনিয়ন অ্যাক্টে এতটুকু অব্দি লেখা নেই, যে মালিকদের বাধ্যতামূলক ভাবে শ্রমিক ইউনিয়নগুলিকে শ্রমিকদের আইনি মুখপাত্র হিসেবে মেনে নিয়ে কথাবার্তা চালাতে হবে। কোনো কোনো রাজ্য আইন বদলে এই প্রতিনিধিত্ব কার্যকরী করেছে বটে। কিন্তু তামিলনাড়ু সমেত বেশিরভাগ রাজ্যে ইউনিয়নগুলির এই আইনি অধিকার নেই। ফলে মালিকপক্ষ সহজেই ইউনিয়নগুলিকে পাত্তা না দিয়ে তাদের কাজ চালিয়ে যেতে পারে – যেমন ফক্সকন-এর ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিলো।[৭] ফক্সকন একটি তাইওয়ানিজ মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি যারা অ্যাপল আইফোন তৈরি করে। চীনে এই কোম্পানি যেভাবে শ্রমিকদের শোষণ করেছে বলে জানা যায়, তা প্রায় প্রবাদপ্রতিম।[১৯] তামিলনাড়ুতে ফক্সকন ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড নোকিয়া কোম্পানির সাপ্লায়ার হিসেবে কাজ করছিল, ২০১০-এ এর কর্মচারীরা ৩৭ দিনে ধরে কর্মবিরতি চালিয়ে যায়। এই শ্রমিকরা প্রথমে তামিলনাড়ুর ডিএমকে গোষ্ঠীর লেবার প্রোগ্রেসিভ ফ্রন্ট(এল.পি.এফ.)-এর নেতৃত্বে সংগঠিত হয়েছিলেন। কিন্তু ক্রমশ তাঁদের মনে হতে থাকে এল.পি.এফ. শ্রমিকদের সুবিধার চাইতে মালিকপক্ষের সুবিধা নিয়েই বেশি চিন্তিত। তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা সি.পি.এম.-এর সিটু-র অধীনে ইউনিয়ন তৈরি করবেন। স্বাভাবিকভাবেই, যথাযথ ইলেকশন পদ্ধতিতে শ্রমিকদের মুখপাত্র বেছে নেওয়ার ব্যাপারটি অস্বীকার ক’রে ফক্সকন এল.পি.এফ.-এর সাথে মজুরি বিষয়ে একটি চুক্তি সই করে, এবং শ্রমিকদের অন্য কোনো সংগঠনে যোগ না দিতে চাপ দিতে থাকে। শ্রমিকরা তখন আইনের শরণাপন্ন হন। ২০১৪ সালে যতদিনে ম্যাড্রাস হাই কোর্ট গোপন ব্যালটের মাধ্যমে শ্রমিকদের ইউনিয়ন তৈরি করার পক্ষে রায় দেয়, ততদিনে ফক্সকন তামিলনাড়ুতে তাদের কারখানা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে।[৪]

শ্রমিকদের বঞ্চনার ক্ষেত্রে ইউনিয়নকে অস্বীকার করা কোম্পানিগুলির সবচেয়ে পছন্দের পদ্ধতি। সেটা সম্ভব না হলে অনেক কোম্পানি তাদের নিজেদের ইউনিয়ন খাড়া করে, কিম্বা কোন ইউনিয়ন মালিকপক্ষকে মদত দিতে রাজি থাকবে, তার সন্ধান শুরু করে (তামিলনাড়ুতে হুন্ডাই-এর ক্ষেত্রে এটা ঘটেছিল)। এইসব ক্ষেত্রে লেবার ডিপার্টমেন্টের সাহায্য নেওয়া বা অন্যান্য আইনি পথ খুঁজে নেওয়া, অথবা কর্মবিরতির ডাক দেওয়া ছাড়া শ্রমিকদের সামনে আর কোনো রাস্তা খোলা থাকে না।

শ্রমিকরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিসপিউট অ্যাক্ট অনুযায়ী পিটিশন করে বা স্ট্রাইকের নোটিস দিয়ে লেবার ডিপার্টমেন্টের কাছে দাবি রাখতে পারেন। কিন্তু রাজ্যস্তরে শ্রম বিভাগের হাতে আসলে এরকম কোনো অধিকার নেই যাতে মালিকপক্ষকে বাধ্য করা যায় শ্রমিকদের সাথে আলোচনায় বসতে; এ ধরনের আলোচনার ফলাফলের উপরেও এই ডিপার্টমেন্টের আসলে কোনো প্রভাব নেই। বেশিরভাগ সময় মালিকপক্ষ ইচ্ছে করে দেরি করিয়ে দিয়ে বা অনুপস্থিত থেকে এই জাতীয় আলোচনা বানচাল করে দেয়, ফলে সামান্যতম সিদ্ধান্তটুকু নিতেও কয়েক মাস লেগে যায়। অথচ শিল্পমালিকদের এই চালাকি সর্বজনবিদিত হওয়া সত্ত্বেও লেবার ট্রাইব্যুনাল বা অন্যান্য আইনি সহায়তা পাবার আগে শ্রমিকদের প্রতিটিবার এই পদ্ধতির মধ্যে দিয়েই যেতে বাধ্য করা হয়।

এদেশের আইনি প্রক্রিয়া ক্রমশই আরও বেশি করে শ্রমিকদের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। চণ্ডীগড় হাই কোর্ট থেকে ১৪৮ জন মারুতি শ্রমিকের (২০১২ সালে মারুতির মানেসর প্ল্যান্টে যাঁদের দাঙ্গা ও খুনের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়) জামিন বাতিলের সম্পূর্ণ অন্যায্য ঘটনায় এটি স্পষ্ট হয়ে যায়। কোর্টের তরফে এই সিদ্ধান্তের পিছনে কারণ হিসেবে, আসল কেসের বিষয়ে কথা না তুলে, বৈদেশিক লগ্নির উপর এই জামিনের কি প্রভাব হতে পারে, তার একটি মনগড়া চিত্র নির্মাণ করা হয়।[৮] প্রাইকল শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও, যখন তাঁদের একজন এইচআর ম্যানেজারের খুনের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়, কোর্টের পক্ষ থেকে ঐ একই পদ্ধতির পুনরাবৃত্তি দেখা যায়। বহু কোম্পানি, যেমন তামিলনাড়ুতে একটি সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানি, ফ্যাক্টরির ১০০ মিটারের মধ্যে শ্রমিকদের বিক্ষোভ প্রদর্শনের অধিকার আইনি ভাবে কেড়ে নিতে সক্ষম হয়।[৯] এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রতিবাদের দৃশ্যমানতা এবং প্রভাব কমতে থাকে।

২০০৩ সালে জয়ললিতা মুখ্যমন্ত্রী পদে থাকাকালীন সুপ্রিম কোর্ট দেড় লাখেরও বেশি সরকারি কর্মচারীর ছাঁটাই মঞ্জুর করে। সরকারি কর্মচারীরা এবং শিক্ষকরা মাইনে এবং পেনশন সমেত নানান দাবিতে মুখর হয়েছিলেন। তার জবাবে কয়েক হাজার ইউনিয়ন নেতাকে অ্যারেস্ট করা হয় এবং এসেনশিয়াল সার্ভিস মেইনটেন্যান্স অ্যাক্ট(যা পাবলিক সেক্টরে কর্মরত মানুষদের স্ট্রাইক ডাকার অধিকার অনেকটাই খর্ব করে)-এর বিরুদ্ধতার ‘অপরাধে’ কয়েক লক্ষ কর্মীকে ছাঁটাই করা হয়! এই অ্যাক্ট অনুযায়ী ইউনিয়নগুলিকে স্ট্রাইক ডাকার ছয় সপ্তাহ আগে নোটিস দিতে হবে এবং যদি লেবার ডিপার্টমেন্ট ইতিমধ্যে স্ট্রাইকের দাবির মীমাংসা বিষয়ে কথাবার্তা চালু করে দিয়ে থাকে, তাহলে আর স্ট্রাইক ডাকা যাবে না। সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয়, যে স্ট্রাইক সরকারি কর্মচারীদের মৌলিক অধিকার নয়। তবে এই রায় আদতে পাবলিক সেক্টরের জন্য হলেও ফর্মাল সেক্টরেও এই রায়ের প্রভাব থেকে যায়, যখন রাজ্যগুলি কায়দা করে বেসরকারি কোম্পানিগুলিকে এই আইনের পরিধির ভিতরে নিয়ে আসতে শুরু করে। যেমন তামিলনাড়ুতে এস.ই.জেড.-এর মতো নানা ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনকে – বিশেষ করে অটোমোবাইল সেক্টরকে ‘পাবলিক ইউটিলিটি’র আওতায় আনার পরে এইসব কোম্পানিগুলিতে তাৎক্ষণিক কর্মবিরতির ডাক দেওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। শপ ফ্লোরে শ্রমিকদের অবস্থা নিয়ে যাবতীয় সমস্যা নিয়ে লেবার ডিপার্টমেন্ট-এর মুখাপেক্ষী হওয়া ছাড়া আর উপায় না থাকায় প্রতিটি মীমাংসাই হরেদরে পুঁজির পক্ষে নেওয়া হচ্ছে – এমনটিই আজকের অবস্থা।

স্ট্রাইক কি আইনশৃঙ্খলার পরিপন্থী?                                              

হোন্ডা স্ট্রাইকের সময় যেমন দেখা গেছে, রাজ্য সরকারগুলি সর্বদাই শ্রমিকদের কর্মবিরতির ডাককে তাদের অধিকারের জন্য লড়াই হিসেবে না দেখে, যেনতেন প্রকারে আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গকারী গুন্ডামি বলে দেখাতে চায়। পুলিশ এবং ভাড়া করা গুণ্ডাদের ব্যবহার করে শ্রমিকদের প্রকাশ্য প্রতিবাদের মুখ বন্ধ করার ঘটনা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। ২০১২-য় মারুতির মানেসর প্ল্যান্টে যখন উত্তেজনা তুঙ্গে, সেসময় সেখানে কোম্পানির তরফে ভাড়া করা গুন্ডার উপস্থিতি আজ প্রমাণিত। ২০১৩ এবং ১৪-য় তামিলনাড়ুতে এশিয়ান পেইন্টস-এর স্ট্রাইকরত শ্রমিকদের মিছিলকে এই পদ্ধতিতেই ফ্যাক্টরির দরজায় আটকে দেওয়া হয়। রাজস্থানের শ্রীরাম পিস্টন ফ্যাক্টরিতে শ্রমিকরা এবং অ্যাক্টিভিস্টরা যখন ফ্যাক্টরি অঞ্চলে ‘প্যামফ্লেট’ বিলির কাজ করছিলেন, তাঁদের গুন্ডা দিয়ে মার খাওয়ানো হয়েছিল।[১০]

অন্যদিকে পুলিশকে ব্যবহার করা হয় শ্রমিকদের প্রকাশ্য প্রতিবাদ নির্মম ভাবে দাবিয়ে রাখতে। ২০০৫ সালে হোন্ডা শ্রমিকদের উপর যে পুলিশি লাঠিচার্জ হয়, তাতে একজন শ্রমিক মারা যান এবং অনেকেই বিপজ্জনক ভাবে আহত হন। ২০১২-তে মারুতি প্ল্যান্টে দাঙ্গার ঘটনার পরে হরিয়ানা সরকার সমগ্র অঞ্চলটিকে ১৪৪ ধারার আওতায় আনে, যা আজও বহাল এবং যার ফলে যেকোনো রকমের প্রকাশ্য সমাবেশ আজও সেখানে বেআইনি। শ্রমিকদের প্রতিবাদ ও কর্মবিরতির আহ্বানকে পুলিশি মারধোর, ধরপাকড় এবং নানাবিধ অত্যাচারের মাধ্যমে নির্মূল করার চেষ্টা আজ এক অতীব সাধারণ ঘটনায় এসে দাঁড়িয়েছে। হুন্ডাই এবং ফক্সকন (তামিলনাড়ু), টাটা (গুজরাট), শ্রীরাম পিস্টন এবং হোন্ডা (রাজস্থান), মারুতি এবং হোন্ডা (মানেসর) এবং অগণিত এমনই ছোটবড় নানা ফ্যাক্টরির শ্রমিকরা এই অত্যাচারের মুখোমুখি দাঁড়িয়েই জীবনযাপন করে চলেছেন।

একদিকে রাজ্যগুলি সক্রিয় ভাবে শ্রমিকদের যেকোনো রকমের সঙ্ঘবদ্ধ প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে কর্পোরেট কোম্পানিগুলিকে মদত দিয়ে চলে, আরেকদিকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ম্যানেজমেন্টও শপ ফ্লোরে শ্রমিকদের একত্রিত হবার উদ্যোগকে পরাহত করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে সাময়িক বা পাকাপাকি বরখাস্তকরণ অথবা বদলির মাধ্যমে। মানসিক অত্যাচারও কোম্পানিগুলির হাতে এক অস্ত্র হয়ে ওঠে, যেমন তামিলনাড়ুর অটোমোবাইল পার্টস নির্মাণকারী কোম্পানি কমস্টার-এর শ্রমিক নেতাদের সাথে ঘটেছিল। যে যে শ্রমিকরা সংগঠিত হতে চেষ্টা করছেন বলে ম্যানেজমেন্ট সন্দেহ করে, তাঁদের একটি বিচ্ছিন্ন এলাকায় রেখে কয়েক মাস ধরে সম্পূর্ণ অর্থহীন কাজ করতে বাধ্য করার পাশাপাশি আরও নানা প্রাত্যহিক সমস্যাজনক পরিস্থিতি তৈরি করা হয় এবং নানাভাবে – কখনো গুন্ডাদের সাহায্যেও – তাঁদের স্বেচ্ছায় রিটায়ারমেন্ট-এর দরখাস্ত করতে চাপ দেওয়া হয়।[১১]

রাষ্ট্র এবং পুঁজির এই ক্রমবর্ধমান যুগ্ম শোষণের প্রভাব শ্রমিক বিক্ষোভে জঙ্গিয়ানার ধরনও বদলে দিচ্ছে। ২০১২-র জুলাই মাসে মারুতি মানেসর প্ল্যান্টে দাঙ্গার খবর সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ঐ ঘটনার আগে নিয়মিত ভাবে স্থায়ী ও অস্থায়ী কর্মীদের সংগঠিত হবার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছিল, কর্মক্ষেত্রে নানা মূলগত অধিকারটুকুও তাঁদের ছিল না। দাঙ্গাপূর্ব শ্রমিক বিক্ষোভের পিছনে তাৎক্ষণিক মূল বিষয়টি ছিল সুপারভাইজারের দুর্ব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার ‘অপরাধে’ একজন দলিত স্থায়ী কর্মচারীর সাময়িক বরখাস্তকরণ। কোম্পানি যখন কিছুতেই ঐ শ্রমিককে কাজে ফেরত নিয়ে রাজি না হয়, ফ্যাক্টরিতে একটি দাঙ্গা-পরিস্থিতি তৈরি হয়, যা একটি অগ্নিকান্ডে পর্যবসিত হয়, যার ফলে একজন এইচআর ম্যানেজারের মৃত্যুও ঘটে। এই ঘটনার সুযোগ নিয়ে কোম্পানি কয়েক হাজার শ্রমিককে ছাঁটাই করে। খুনের মিথ্যা দায়ে ১৪৮ জন শ্রমিক গ্রেপ্তার হন, যাঁদের মধ্যে বাকিরা জামিন পেলেও ১৩ জন বাছাই শ্রমিক এখন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে জেলে রয়েছেন। জঙ্গিয়ানার ঘটনা দেখা গেছে ২০১৫ সালে নয়া-উদারনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে সেন্ট্রাল ট্রেড ইউনিয়ন-এর ন্যাশনাল জেনারাল স্ট্রাইকেও।[১২] ব্যাঙ্গালোরে বস্ত্রশিল্পক্ষেত্রে কর্মরত কয়েক লক্ষ মহিলা কর্মীর পুঞ্জিভূত বিক্ষোভ টানা দু’দিন শহরের প্রাত্যহিক জীবনকে রুখে দিয়েছিল।[২০]

বর্তমান শ্রমিক আন্দোলনে ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ কি অবশ্যম্ভাবী নয়? প্রাইভেট সেক্টরগুলি এখন সেন্ট্রাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিকিউরিটি ফোর্স (সি.আই.এস.এফ.)-এর সশস্ত্র বাহিনী ব্যবহার করে শ্রমিক আন্দোলনকে দাবিয়ে রাখছে। অথচ এই সশস্ত্র বাহিনীর ব্যবহার শুধুমাত্র সরকারি ক্ষেত্রে করার আইন রয়েছে। ২০১৪ সালে সি.আই.এস.এফ.-এর একজন সদস্য নেইভেলি লিগনাইট কর্পোরেশন-এর এক অস্থায়ী কর্মীকে হত্যা অব্দি করেন।[১৩] রিলায়েন্স এবং আরও নানা কোম্পানির স্বার্থে সি.আই.এস.এফ.-এর ব্যবহার শ্রমিক শ্রেণির ক্ষোভ আরও বাড়াতে থাকবে – এমনটাই তো স্বাভাবিক।[১৪]

শ্রমিক সংগঠনগুলির সামনে মূল লক্ষ্য কি হতে পারে?

শ্রমিক আইনগুলির প্রয়োগ বাস্তবে যতই অকার্যকরী হোক, তাদের যথাযথ ব্যবহার ইউনিয়নগুলিকে শপ ফ্লোরে শ্রমিকদের সংগঠিত করে তাদের অধিকারের প্রশ্ন নিয়ে লড়াই করার সুযোগ দেয়। এইভাবেই এতদিন ইউনিয়নগুলি কাজ করে এসেছে। তবে ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল লেবার ল’-র ভূমিকা মোটের উপর সরকারি এবং ফর্মাল সেক্টরেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।

১৯৮০-তে মাত্র ২% শ্রমিক ছিলেন সংগঠিত। সেই হিসেবটা ২০০২-তে ৬.৩%-এ এসে পৌঁছলেও শ্রমিক সংগঠনের বাস্তব চিত্রটি খুব আশাব্যাঞ্জক নয়। বস্তুত ২০০৫ থেকে রেজিস্টার্ড শ্রমিক ইউনিয়নের সংখ্যা বেশ দ্রুত কমে চলেছে।[১৮]

ফ্যাক্টরিগুলিতে যেভাবে এখন শ্রমিকদের ব্যবহার করা হয় (স্থায়ী, অস্থায়ী ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত – তিন ভাগে ভাগ করে), তাতে শুধু যে মালিকপক্ষের তরফে অতিরিক্ত বা সারপ্লাস মূল্যের পরিমাণ বাড়িয়ে নেবার সুযোগ তৈরি হয় তা-ই নয়, শ্রমিক শ্রেণির তরফে একত্রিত হবার সুযোগও কমে আসতে থাকে। শ্রম আইনের আওতায় থাকা শ্রমিক ইউনিয়ন এবং স্থায়ী শ্রমিকদের পক্ষে সর্বদা নিজেদের স্বার্থ ত্যাগ করে ক্রমবর্ধমান অস্থায়ী চুক্তি-শ্রমিকদের সাহায্য করাও কঠিন হয়ে পড়তে থাকে। কোনো আইনি বাধা না থাকা সত্ত্বেও একই সংগঠনের অধীনে এই দুই জাতীয় শ্রমিক এবং তাঁদের দাবিদাওয়াকে আনার কাজটিও বাস্তবে প্রায়ই অসম্ভব হয়ে পড়ে। শিল্প-উৎপাদন সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র এবং তার বর্তমান আইনি ব্যবস্থার উপর অত্যধিক নির্ভরতাই এর পিছনে মূল কারণ। স্থায়ী শ্রমিকরা স্বাভাবিক নিয়মে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিসপিউট অ্যাক্ট-এর আওতায় আসেন, কিন্তু অস্থায়ীদের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁদের চাকরির প্রামাণ্য তথ্য জোগাড় করতে হয়। ফলে স্থায়ী শ্রমিকদের স্বার্থ (শ্রমিক ইউনিয়নগুলি মূলত যার প্রতিনিধিত্ব করে) সময় ও অর্থ – দুদিক থেকেই ব্যাহত হতে থাকে। ম্যানেজমেন্ট এই বিভাজনটিকেই দক্ষতার সাথে ব্যবহার করে থাকে। স্বল্পসংখ্যক স্থায়ী শ্রমিকদের আপাতভাবে গুরুত্ব দিয়ে তাঁদের মূল অস্থায়ী শ্রমিক স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। এইভাবে অস্থায়ী শ্রমিকদের সংগঠিত হবার সুযোগসুবিধা থেকেও স্বাভাবিক ভাবেই বঞ্চিত করে রাখা যায়, কারণ তাঁরা ইউনিয়নের আইনি দাবিদাওয়ার ভিতরে তাঁদের সমস্যার প্রতিচ্ছবি দেখতেও পান না। যেমন এশিয়ান পেইন্টসের পার্মানেন্ট এমপ্লয়ীজ ইউনিয়ন এ.আই.সি.সি.টি.ইউ. থেকে আই.এন.টি.ইউ.সি.-তে বদলে যাবার ঘটনাটি। শ্রমিকদের সাথে কথাবার্তা বলে জানা যায়, যে এর পিছনে একটি বড় কারণ ছিল এই, যে পূর্ববর্তী ইউনিয়নের নেতৃত্ব অস্থায়ী শ্রমিকদের সমস্যা বিষয়ে চিন্তিত ছিলেন, যা স্থায়ী শ্রমিকদের কাছে তা একটি চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।[৯] আর্থিক দাবির ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময় স্থায়ী শ্রমিকদের সেইরকম সংগঠনই কাম্য, যা মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে মধ্যবর্তী পক্ষ হিসেবে মীমাংসা করতে পারে। কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলির মধ্যে বি.এম.এস. এবং আই.এন.টি.ইউ.সি.-ই এ যাবৎ এই জাতীয় মধ্যপক্ষের ভূমিকায় সবচাইতে জনপ্রিয় ভাবে কাজ করেছে।[খ] এই দুটি ইউনিয়ন যথাক্রমে কর্পোরেটের হাতে হাত মিলিয়ে চলা নয়া-উদারনৈতিক দল বি.জে.পি. এবং কংগ্রেস-এর নিজস্ব শ্রমিক শাখার প্রতিনিধি।[১৮]

স্থায়ী শ্রমিক শ্রেণি এবং বামপন্থী শ্রমিক সংগঠনগুলি অস্থায়ী কর্মীদের সাথে একজোট না হয়ে নিঃসন্দেহে এ বাবদে অদূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে, কারণ এইসব জটিল ভেদাভেদির কারণে স্বভাবতই স্ট্রাইক দিয়ে আজকাল আর উৎপাদন পুরোপুরি রুখে দেওয়া যায় না, তাই তার প্রভাবও কমে আসে। ৫০% অস্থায়ী শ্রমিকদের ব্যবহার করে কোম্পানিগুলি তাদের উৎপাদন সহজেই চালিয়ে যেতে পারে। তামিলনাড়ুতে ফক্সকন, এস.পি.ই.এল., ডায়মন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং প্রভৃতি কোম্পানিতে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে। উন্নত প্রযুক্তির পিছনে ক্রমবর্ধমান পরিমাণে পুঁজি লগ্নি হবার ফলে, এবং সেই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে নতুন কর্মচারীদের দীর্ঘ প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা, এবং তার ফলে নতুন শ্রমিকদের উপর পুঁজির লগ্নিও ক্রমশ কমে আসছে। ফলে সহজেই চুক্তির সময়সীমা কমিয়ে এনে আরও কম মজুরিতে বারবার আনকোরা শ্রমিকদের নিয়ে এসে কোম্পানিগুলি সংগঠনগুলির সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ রাখছে। এই অবস্থায় সংগঠনগুলির মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে শ্রমিকদের চাকরির স্থায়িত্ব বজায় রাখার চেষ্টা। যদিও এটা স্বীকার করতেই হবে, যে এইসব ভেদাভেদের বন্ধন না মেনে শ্রমিকদের মধ্যে সাম্প্রতিক কালেই একাধিক সফল প্রতিবাদের ঘটনা ঘটে গেছে। এইচ.এম.এস.আই.-এর হোন্ডা শ্রমিকদের ঘটনা তার মধ্যে অন্যতম।[১২] এখানে স্থায়ী শ্রমিকরাই মেরুকরণ অতিক্রম করে সংগঠিতকরণের পথে পা বাড়িয়েছিলেন।

বিশ্বায়িত উৎপাদনের এই জাল ক্রমশ জটিল ও সর্বব্যাপী হয়ে পড়ছে। স্থানীয় ভাবেই হোক বা অন্যত্র, ম্যানুফ্যাকচারের কাজ মূলত ‘চেইন-ম্যানুফ্যাকচার’ পদ্ধতি প্রবর্তন করা (একচেটিয়া) কোম্পানিগুলির কাছে ‘আউটসোর্স’ করাই এখন ধরন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন অ্যাপল-এর আইফোন-এর নির্মাণকার্য পুরোপুরি ফক্সকন-এর কাছে আউটসোর্স করা হয়। বিভিন্ন জায়গায় নির্মিত টুকরো জোড়া দিয়ে অন্তিম পণ্য নির্মাণও এখন প্রযুক্তিগত কারণে বেশ সহজ এবং সস্তা হয়ে পড়েছে। অথচ পুঁজির এই জটিল ও গতিময় চলাচলের সাথে পাল্লা দিয়ে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন তার গতি পরিবর্তন করে উঠতে পারেনি – সে দেশীয় স্তরেই হোক, বা আন্তর্দেশীয়। যেমন, যখন তামিলনাড়ুতে নোকিয়া কোম্পানি তাদের সাপ্লাই চেইন-এর উৎপাদন বন্ধ করে দিল, তখন প্রতিবাদ সম্ভব হয়েছিল শুধুমাত্র স্থানীয় ফ্যাক্টরি স্তরে; বিভিন্ন ফ্যাক্টরিতে যুগ্ম আন্দোলন চালাতে গেলে তাদের ভিতর যেটুকু যোগাযোগ নির্মাণ করা উচিত ছিল, তা-ও করে ওঠা সম্ভবপর হয়নি।

ভারতে এক ডজনেরও বেশি ট্রেড ইউনিয়ন রয়েছে, তার সাথে রয়েছে হাজারেরও বেশি স্বাধীন শ্রমিক সংগঠন। শ্রমিক শ্রেণির নানান মেরুকরণ – বিশেষত এতগুলি কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলির মধ্যে সামগ্রিক শ্রমিক শ্রেণির বিভাজন, এবং তার উপর নানা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ শ্রমিক আন্দোলনের অসাফল্যের পিছনে একটি বড় কারণ।[১৮] তার উপর ট্রেড ইউনিয়নগুলির মধ্যে অনেকগুলিই রাজনৈতিক দলগুলির সরাসরি প্রতিনিধি। নানান সেক্টরগুলির মধ্যে কৌশলগত জোটবদ্ধতার অবশ্যপ্রয়োজনীয় রয়েছে, যাতে সঙ্ঘবদ্ধ আন্দোলন ও স্ট্রাইকের মাধ্যমে পুঁজিকে পদাবনত করা যায়। হয়তো সাম্প্রতিক কালে সেন্ট্রাল ট্রেড ইউনিয়নগুলির মধ্যে এক ধরনের মৈত্রীভাব দেখা যাচ্ছে, কিন্তু আঞ্চলিক এবং সেক্টোরাল স্তরে এই জোটবদ্ধতা একেবারেই অনুপস্থিত।

ট্রেড ইউনিয়নের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, অথচ সংগঠনীয় দৌর্বল্য নিয়ে ইন্টারন্যাশনাল লেবার অরগ্যানাইজেশন(আই.এল.ও.)-র গবেষণায় কিছু কথা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।[১৮] দেখা যাচ্ছে, পার্লামেন্টে এবং আইনি ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় ও রাজ্য স্তরে ট্রেড ইউনিয়নের প্রতিনিধিত্ব কমছে। এর থেকে বোঝা যায়, বাম দৃষ্টিভঙ্গিতে, এমনকি কমিউনিস্ট দৃষ্টিভঙ্গিতেও ভোটকেন্দ্রিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে শ্রমিক আন্দোলনের গুরুত্ব কমছে। সংগঠিতকরণের পথে নানা বাধা এসে পড়ায় ক্রমহ্রাসমান সদস্য সংখ্যার বিচারে, মুখে শ্রমিক শ্রেণির কল্যাণের কথা বললেও রাজনৈতিক দলগুলি আর হাতেকলমে তাঁদের প্রতিনিধিত্বের প্রয়োজন বোধ করছে না, যা বস্তুত এক গভীর দুশ্চিন্তার বিষয়। আবার শ্রমিক আন্দোলনকে জোর করে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানোও আমাদের কাম্য নয়। এই মুহূর্তে প্রয়োজন বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মাথায় রেখে, বাম আন্দোলনে শ্রমিক সংগঠনের এক যথাযথ মূল্যায়ন এবং তার পরিবর্তিত রূপ বা পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে গভীরে পথসন্ধান। ফ্যাক্টরি স্তরে যেমন, বৃহত্তর রাজনৈতিক স্তরেও তেমন, এই অন্তঃদৃষ্টি ও বহিঃদৃষ্টির মেলবন্ধন ছাড়া হয়তো ইউনিয়নগুলির অসাফল্য গোটা শ্রমিক শ্রেণির অসাফল্য বলেই প্রতিভাত হবে – যা সম্পূর্ণ অসত্য।

উন্নত প্রযুক্তির প্রভাব ও আরও নানা কারণে গভীরতর বিভাজন

শিল্প-শ্রমিকরা শপ ফ্লোরে এমনিতেই নিত্যনতুন শোষণের ধরন বুঝে নিতে নাজেহাল, শ্রম আইনগুলি প্রহসনের নামান্তর, প্রতিটি সরকারই পুঁজির বিকাশের অভিমুখে এবং শ্রমিকদের অধিকারের বিপরীতে আইনি পরিবর্তন আনার পক্ষে, যাতে কোম্পানিগুলির পক্ষে তাদের ‘হায়ার অ্যান্ড ফায়ার’ (সাধারণ ভাবে ‘হায়ার’-এর চাইতে ‘ফায়ারে’ই শিল্পপতিদের উৎসাহ বেশি) পলিসি চালিয়ে যাওয়া সহজ হয়, যাতে শ্রমিকদের অবস্থা নিয়ে কোনো পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা না থাকে, শ্রমিক সংগঠনের অস্তিত্ব যাতে একেবারেই নির্মূল করে দেওয়া যায়। রাজ্য সরকার এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল লবি মূলস্রোত মিডিয়ার সাথে হাত মিলিয়ে প্রচার করে থাকে, যে বর্তমান ‘শ্রমিক রাজ’ ভারতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং যুবসম্প্রদায়ের জন্য আগামী ২৫ বছরে যে ব্যাপক চাকরির সংস্থান নাকি ঘটতে চলেছে, তার পরিপন্থী। এই জাতীয় প্রচার শ্রমিক শ্রেণি, ভবিষ্যৎ শ্রমিক শ্রেণি এবং সাধারণ ভাবে মানুষের সামনে এক বৈপরীত্যের মায়াচিত্র সৃষ্টি করছে; যেন, চাকরিক্ষেত্রে শোষণের বিরোধিতা করার অর্থ চাকরি জিনিসটারই বিরোধিতা করা!

নানা গবেষণা থেকে জানা যায়, যে গত দুই দশকের ৮% অর্থনৈতিক উন্নয়ন শ্রমিকশক্তিকে চাকরির সংস্থান-অর্থে কোনো সাহায্য করেনি। প্রযুক্তিগত উন্নতি এবং জিনিসপত্রের কমতে থাকা দাম ভারতীয় ম্যানুফ্যাকচার সেক্টর-এ ‘অটোমেশন’ বা স্বচালিত মেশিনের উন্নয়ন ঘটিয়েছে। ২০০০ থেকে ২০১০-এর মধ্যে ম্যানুফ্যাকচার সেক্টর-এ মোট লাভের ৮.৪% বৃদ্ধি ঘটেছে, কিন্তু চাকরির ক্ষেত্রে সেই বৃদ্ধি মোটে ১.৮%।[১৫] এই হিসেবের ভিতরেও মূলত ফর্মাল সেক্টরে ইনফর্মাল কাজের জন্য লোক নেওয়া হয়েছে, যারা অনেকাংশেই শ্রম আইনের আওতার বাইরে। এর পাশাপাশি সাধারণ ভাবে ফর্মাল সেক্টর-এর তুলনায় ইনফর্মাল সেক্টর-এর বৃদ্ধি ক্রমশই বর্তমান শ্রমিক শক্তিকে শ্রম আইনের সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত করে চলেছে।[১৬] শ্রমের কাঠামো পরিচালনায় নানা বিভাজন ও কড়াকড়ি এবং শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দেবার নামে কম মজুরিতে অস্থায়ী ভাবে ব্যবহার করে যাওয়া আসলে পুঁজির আরও বেশি সঞ্চয়ের লক্ষ্যকেই চিহ্নিত করে।

অটোমেশনের ফলে টিকে থাকা কর্মীদের কাজের চাপ বাড়ছে সাঙ্ঘাতিক হারে, প্রশিক্ষণ-এ থাকা ট্রেইনি ও অ্যাপ্রেন্টিস-দের চতুর ভাবে শ্রমিক-এর সংজ্ঞায় ফেলা হচ্ছে না, তরুণ শ্রমিকরা তাঁদের কুড়ি বা তিরিশের কোঠায় ‘রিটায়ার’ হয়ে যাচ্ছেন, স্থায়ী চাকরির অভাবে নানা অসাম্য ও আর্থিক সমস্যার – বিশেষত বিশ্বব্যাপী মন্দার সহজ শিকার হয়ে পড়ছেন। শ্রমিকদের সামাজিক বিভাজন (অভিবাসী বা মাইগ্রেন্ট শ্রমিক, শ্রমিকদের মধ্যে লিঙ্গ, ধর্ম ও জাতি ভেদ) এবং শপ ফ্লোরে তাঁদের মধ্যে উঁচু-নীচু ভেদাভেদি তাঁদের সংগঠিত হবার পথে এক বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

এ সত্ত্বেও, যেমন ২০১৫ সালের ন্যাশনাল স্ট্রাইকে দেখা গিয়েছিল, আরও বেশি সংখ্যক শ্রমিক ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন, একত্রিত হচ্ছেন এবং জোরের সাথে তাঁদের দাবি রাখছেন।[১৭] এই আন্দোলনের নেতৃত্বে যাঁরা থাকছেন, এটা এবার তাঁদের এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হয়ে দাঁড়াচ্ছে, যে তাঁরা শ্রম-পুঁজির এই দ্বন্দ্বে বর্তমান আইনি ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে নতুন ভাবে ভাবতে শুরু করুন।

দুই

সংগঠিতকরণ – সে কি সত্যি শ্রমিকদের জন্য?

 ঘটনাটা শুরু হয়েছিল বেশ জোরের সাথে। একটি তাৎক্ষণিক স্ট্রাইকের ডাক দিয়ে শ্রমিকরা বসেছিলেন তাঁদের কয়েকজন সহকর্মীকে বরখাস্ত করার প্রতিবাদে। তাঁদের ফ্যাক্টরিতে সেটাই ঘটছিল, যা আর পাঁচটা ফ্যাক্টরিতে ঘটে থাকে – কম মজুরিতে, খাবার এবং যাতায়াত সমেত অন্যান্য সুযোগসুবিধা কাটছাঁট করে, শ্রমিকদের সংগঠিত হবার জন্য শাস্তি দেবার চেষ্টা। শ্রমিকদের সামনে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠছিল কীভাবে পুঁজি তার সঞ্চয়ের পথের বাধা দূর করতে শোষণের সাহায্য নেয়। তাঁরা একটি কমিউনিস্ট দলের সাহায্যে সংগঠন গড়ে তোলেন এবং মালিকপক্ষের সামনে তাঁদের দাবি রাখতে শুরু করেন।

ম্যানেজমেন্ট স্ট্রাইকের মোকাবিলা নানাভাবে করে থাকে। ইতিমধ্যেই অসংগঠিত অস্থায়ী কর্মীদের কাজে লাগিয়ে উৎপাদন চালানো শুরু হয়ে গিয়েছিল। কোর্ট থেকে ২০০ মিটারের মধ্যে শ্রমিকদের জমায়েত বেআইনি ঘোষণা করিয়ে নেবার পর পুলিশ দিয়ে শ্রমিকদের সরিয়েও দেওয়া হয়েছিল। তাঁরা তখন তাঁদের আন্দোলনকে ফ্যাক্টরি পরিসীমার বাইরে নিয়ে যান। রাষ্ট্রের সাথে আঁতাতের ফলে দু’মাসেরও বেশি সময় ধরে উৎপাদন চলছিল নিরবচ্ছিন্ন ভাবে। লেবার ডিপার্টমেন্ট-এ পিটিশন দিয়ে শ্রমিকরা একের পর এক মিটিং করে চলেছিলেন, কোনো ফল হচ্ছিল না। শেষে সংগঠনের তরফে শ্রমিকরা আন্দোলন মুলতবি রাখার সিদ্ধান্তে আসেন; ঠিক হয়, যে ঘটনাটিকে লেবার কোর্টে বেআইনি বরখাস্ত হিসেবে দায়ের করা হবে।

মাসের পর মাস চলে যায়, মালিকপক্ষের শোষণ বাড়তে থাকে। কোনো শ্রমিকই ঠিক সময় মাইনে পাচ্ছিলেন না। শ্রমিকরা যখন সংগঠনের কাছে শপ ফ্লোরের সমস্যা নিয়ে দাবি রাখার প্রস্তাব দেন, সংগঠনের উকিল তাঁদের জানান, যে কোর্টে কেস চলাকালীন তাঁদের পক্ষে আইনি ভাবে এই আন্দোলন শুরু করা সম্ভব হবে না, তাতে কেসটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেফটি অ্যান্ড হেলথ বিভাগে (পরে ফ্যাক্টরিজ অফ ইন্সপেকটোরেট-এ) অভিযোগ জানানো হয়, কিন্তু সেখান থেকে মালিকপক্ষকে একটা লোক দেখানো সতর্কতার বার্তা দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করা হয় না। শ্রমিকদের মনে হতে থাকে, সংগঠন যেন তাঁদের স্বার্থ বিষয়ে অন্ধ। বছর দুই কেটে যায়। তার মধ্যে কয়েকটি প্রতিবাদমূলক প্রদর্শন হয় বটে, কিন্তু কোনোটিই বাস্তব অর্থে কোনো ফল দেয় না। এবার শ্রমিকরা হাল ছেড়ে দিয়ে পুঁজিবাদের সমর্থক একটি রাজনৈতিক দলের নিজস্ব শ্রমিক সংগঠনের সাথে কাজ করতে শুরু করেন।

আমরা সাধারণত সংগঠন বলতে যা বুঝি, সেটা প্রচলিত অর্থে পুঁজিবাদের উৎপাদন ও শোষণ পদ্ধতি, যা ১৮ শতকের আধুনিক শিল্প উন্নয়নের সাথে সাথে উঠে এসেছিল, তার উপর নির্ভর করে থাকে। পুঁজিবাদের আদিকাল থেকেই শ্রম এবং পুঁজির স্বার্থ বিপরীত, কিন্তু একে অন্যকে ছাড়া তাদের অস্তিত্বও নেই। পুঁজির কাছে শ্রমশক্তি বিক্রি না করলে শ্রমিকের রোজগার বন্ধ হয়ে যায়, আর শ্রমিককে তার ন্যায্য ভাগ থেকে বঞ্চিত করেই ঘটে পুঁজির সঞ্চয়। এই অন্তহীন বৃত্তে শ্রমিকদের যদি নিজেদের স্বার্থে, নিজেদের ন্যায্য মজুরির দাবিতে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয়, সংগঠিত হওয়া ছাড়া যে তাঁদের আর কোনো উপায় নেই। কিন্তু সামাজিক সম্পর্কগুলির বিচারে এই সংগঠিতকরণের পদ্ধতিটি একই সাথে শ্রমিকদের পক্ষে ও বিপক্ষে কাজ করতে পারে; ঐতিহাসিক ভাবে এমনটিই দেখা গেছে। তার উপর এই সংগঠিতকরণের পদ্ধতিও যে নিজেরই গভীরে শিকড় গেড়ে থাকা পুঁজিবাদের নিয়মগুলিকে আদতে বদলে দিতে পারে, এমনটা নয়; তাই অনেকসময়ই দেখা যায় সংগঠন একটি তাৎক্ষণিক জোটবদ্ধতা হিসেবেই থেকে যায়।

তবে কমিউনিস্ট পার্টিগুলি শ্রমিক সংহতিকে সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের ব্যবহারিক কেন্দ্র হিসেবেই দেখে, যার মাধ্যমে পুঁজির শোষণকে সবচাইতে সহজে লোকসমক্ষে আনা যায় এবং শ্রেণিসাম্যের ধারণা প্রচারের পাশাপাশি মানুষের একজোট হয়ে দাবি আদায় করে নেবার ক্ষমতাকেও সামনে নিয়ে আসা যায়। বাম দলগুলির এই পদ্ধতি কি আজ তাদের লক্ষ্যে কার্যকরী হচ্ছে? শ্রমিকরা কি সত্যিই যূথবদ্ধতার গুরুত্ব ও সাম্যের নানান অর্থ গভীর অর্থে বুঝতে বা বিশ্বাস করতে পারছেন? এ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে আমরা তামিলনাড়ুর কিছু উদাহরণ তুলে আনব, যাতে ট্রেড ইউনিয়ন-এর রাজনীতি সম্পর্কে আমাদের ধারণা আরও কিছুটা পরিষ্কার হয়ে ওঠে।

আইনি ব্যবস্থার উপর ভরসার ফল

২০০৯ ও ২০১১-র মধ্যে তামিলনাড়ুর শ্রীপেরাম্বুদুর-এর শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক বিক্ষোভ বেশ বড় চেহারা নেয়। যে এম.এন.সি.-গুলিকে (হুন্ডাই, নোকিয়া, ফক্সকন, বিওয়াইডি ইত্যাদি) রাজ্যের ও দেশের উন্নয়নের নাম করে দালালি দেওয়া হয়েছিল, তাদের শ্রমিকরা নানান দাবিতে প্রতিবাদ তোলেন এবং কর্মবিরতিরও ডাক দেন। শিল্প বিভাগ এবং মিডিয়া যথারীতি এই অবস্থার নিন্দা করে এই জবানিতে, যে এই ঘটনাগুলি লগ্নিকারীদের কাছে এ দেশের ব্যবসা ও অর্থনীতি সম্পর্কে এক ভুল ছবি দেবে।

ইকোনমিক টাইমস অনুযায়ী পুলিশ এ বিষয়ে শিল্প লবিকে কথা দিয়েছিল, যে যেকোনো শ্রমিক বিক্ষোভকে ‘আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গকারী ঘটনা’ হিসেবেই দেখা হবে এবং তার বিধানও সেইভাবেই করা হবে। যেই কথা সেই কাজ। তামিলনাড়ুর নানা ফ্যাক্টরির শ্রমিকদের সাথে পুলিশ ঘৃণ্য অপরাধীদের মতোই ব্যবহার করে আসছে। তা সত্ত্বেও ২০১০ সাল থেকে তামিলনাড়ুর শ্রমিকরা শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘমেয়াদি স্ট্রাইক করতে সক্ষম হয়েছেন, যেমন, সি.এম.আর. টয়টসু, এশিয়ান পেইন্টস, জিনটেক – ৮০ দিনের স্ট্রাইক, ফক্সকন – ৩০ দিনের, এসপিইএল ইত্যাদি।[২১] তাৎক্ষণিক কর্মবিরতি এবং ‘অনসাইট’ প্রতিবাদ উঠে আসছে খুব গভীর এক আঘাতের যন্ত্রণা ও অসম্মান থেকে – সে লুকাস টিভির ২৪০০+ প্রশিক্ষকই হোক, বা অ্যাপোলোর ১০০০+ কর্মচারীই হোক, বা সানমিনার ৪০০+ শ্রমিকই হোক।

এই শ্রমিকরা নয়া-উদারনৈতিক সমাজের নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রতিরোধ চালাবার চেষ্টা করে চলেছেন – চুক্তি-শ্রমের বাড়বাড়ন্ত, নানাভাবে আউটসোর্সিং-এর মাধ্যমে উৎপাদন ক্ষেত্রে নানা বিভাজন, সাপ্লাই চেইন কর্মপদ্ধতি এবং তার সাথে জড়িত পণ্য উৎপাদন ও পণ্য বিক্রয়ের মধ্যে ক্রমবর্ধমান চ্যুতি ইত্যাদির বিরুদ্ধে। তাঁরা তাঁদের কর্মক্ষেত্রের কাছাকাছি উপস্থিত বাম সংগঠনগুলির কাছে থেকে সহযোগিতা খুঁজে নিয়েছেন – সে কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নই হোক, বা স্বাধীন ভাবে কর্মরত কোনো সংগঠন। ভরসার কথা এই, যে এইসব আন্দোলন চলাকালীন প্রতিবাদী শ্রমিকদের মধ্যে শ্রমিকবিরোধী আইনকানুন সম্পর্কে সচেতনতা ও বোধশক্তি কিন্তু নানাভাবে প্রকট হয়ে উঠেছে।[২২]

দুর্ভাগ্যবশত অধিকাংশ সময়েই এই সহযোগিতাকারী সংগঠনগুলি ঘুরেফিরে সেই একই আইনকানুনের মারপ্যাঁচ দিয়ে মালিকপক্ষের সাথে আলোচনা-দরদামের মাধ্যমে মীমাংসা করার চেষ্টা করে থাকে। সেই একই বহুব্যবহৃত পথ – ইউনিয়ন রেজিস্টার করা, ইতিমধ্যেই বিরূপ মালিকপক্ষের সামনে দাবির তালিকা ধরে দেওয়া, অসহানুভূতিশীল লেবার ডিপার্টমেন্ট-এর সামনে ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিসপিউট’ দাখিল করা, এবং শেষটায় লেবার কোর্ট থেকে হাই কোর্টে দৌড়োদৌড়ি, যেখানে এত সব করা সত্ত্বেও পরাজয় প্রায় অবশ্যম্ভাবী। আইনের দিক থেকে সবচাইতে বেশি যা ব্যবহার হয়, তা হল ট্রেড ইউনিয়ন অ্যাক্ট এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিসপিউট অ্যাক্ট। এই দুটি আইন ইউনিয়ন গঠন সমর্থন করে, কিন্তু শপ ফ্লোরের সমস্যায় শ্রমিকদের কোনও সুবিধা দিতে অসফলই থেকে যায়।[২৩]

এমনটাই হবার কথা, কারণ এই কর্মপদ্ধতি আসলে রাষ্ট্র বা পুঁজির ব্যবহার সম্পর্কে যে ধারণার উপর ভিত্তি করে নির্মিত, তা কমিউনিস্ট মতে বুর্জোয়া স্বার্থ ও তদজনিত ব্যবহার-এর সাথে মেলে না। একদিকে এই কর্মপদ্ধতি আশা রাখে যে রাষ্ট্র শ্রমিকের পক্ষে নানা আইন (সে যতই ফাঁকে ভর্তি হোক) বাস্তবায়িত করবে, আবার অন্যদিকে ভেবে নেওয়া হয়, যে পুঁজিপতিরা সেইসব আইন বিনা বাক্যব্যায়ে মেনে নেবে, যখন কিনা ঐতিহাসিক ভাবে এটা প্রমাণিতই বলা যায়, যে এমনটি কখনই হয়নি, হবেও না।

উত্তর চেন্নাইয়ে গুম্মিডিপুন্ডি-র গ্রিভস কটন শ্রমিকদের কথা ধরা যাক। তাঁরা ২০১৩ সালে ডি.টি.ইউ.সি.-র সাথে মিলে একটি ইউনিয়ন তৈরি করেন। মালিকপক্ষ ইউনিয়ন নেতাদের চাকরি খেয়ে শ্রমিকদের এই বেছে নেওয়া পথের ব্যাপারে তাদের কি দৃষ্টিভঙ্গি তা পরিষ্কার বুঝিয়ে দেয়। শ্রম বিভাগের তরফ থেকে এক বছর ধরে মীমাংসার চেষ্টা কোনো ফল দেয় না। শেষে লেবার কোর্টে এটা নিয়ে কেস শুরু হলে লেবার ডিপার্টমেন্ট থেকে ‘ফেলিওর নোটিস’ (যা লেবার কোর্টে পিটিশন হিসেবে দেওয়া প্রয়োজন ছিল) দিতে প্রায় ১০ মাস দেরি করা হয়। শ্রমিকরা যেই কোর্টে কেসটি নিয়ে যেতে সক্ষম হন, অমনি কোম্পানি বেআইনি ভাবে কারখানা তুলে দেয় – প্রায় ১০০ শ্রমিককে কর্মচ্যুত করে। তার প্রতিবাদ করতে গেলে পুলিশ ডেকে তাঁদের ফ্যাক্টরি এলাকা থেকে বার করে দেওয়া হয়। শ্রমিকদের কাছে কোর্টের একটি ‘স্টে অর্ডার’ ছিল, যে মালিকপক্ষ কারখানা থেকে মেশিনগুলি সরিয়ে নিয়ে যেতে পারবে না। অথচ মালিকরা সেই স্টে অর্ডার অগ্রাহ্য করে নিজেদের স্বার্থমত আরেকটি স্টে অর্ডার বার করে ফেলে, যার সাহায্যে তাঁদের পুলিশের সহায়তায় কারখানা খালি করার অনুমতি দিয়ে দেওয়া হয়। স্বভাবতই পুলিশ এই দ্বিতীয় স্টে অর্ডারটিকেই প্রাধান্য দেয় এবং শ্রমিকদের বলা হয় তাঁরা যেন তাঁদের সমস্যা নিয়ে কোর্টের দ্বারস্থ হন। তখন থেকে এই শ্রমিকরা কোনো আশু সমাধানের সম্ভাবনা ছাড়াই আইনি পথে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন – হয়তো বৃথাই।

আসলে শ্রমিক আইনগুলি ইউনিয়ন কীভাবে কাজকর্ম করবে তার চারপাশেও – সরাসরি ভাবে না হলেও – যথেচ্ছ বেড়া দিতে থাকে। যেমন, লেবার ডিপার্টমেন্ট ও মালিকপক্ষকে নোটিস না দিয়ে প্রায় কোনো স্ট্রাইকই ডাকা হয় না। অথচ দু’সপ্তাহের নোটিস পেলে মালিকরা তার মধ্যে শুধু যে কীভাবে স্ট্রাইক রুখে দেওয়া যায় সে নিয়ে ছক কষে ফেলতে পারেন তা-ই নয়, প্রয়োজনমত শ্রমিকদের সাথে কায়দা করে নিজেদের সুবিধা বজায় রেখে ফয়সালায় অব্দি চলে আসতে পারেন; উপরন্ত স্ট্রাইক যাতে উৎপাদনের বিশেষ ক্ষতি করতে না পারে, তার ব্যবস্থা করা এবং প্রতিবাদের পুরোভাগে থাকা নেতাদের শাস্তিবিধান করার ব্যবস্থাপনাও করে ফেলা সম্ভব হয়ে যায় অনেক ক্ষেত্রেই। অর্থাৎ আইন শ্রমিকদের স্ট্রাইক করতে অনুমোদন করলেও, এর প্রচলিত কর্মপদ্ধতি এমনই হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা পদে পদে শ্রমিক আন্দোলনের পথে বাধা সৃষ্টি করছে। সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনও অনেকসময় এইভাবে আইনি প্যাঁচে পড়ে কোর্টচত্ত্বরে খাবি খেতে থাকে।

যেমন এ.আই.সি.সি.টি.ইউ.-এর অধীনে সানমিনা কোম্পানির শ্রমিকরা, যাঁরা একজন শ্রমিকের প্রতি এক ম্যানেজারের (মৌখিক) দুর্ব্যবহারের বিরুদ্ধে শাস্তির দাবি জানিয়ে ফ্যাক্টরির ভিতরে স্ট্রাইক ডাকেন। মালিকপক্ষ এ নিয়ে শ্রমিকদের সাথে কোনওরকম কথাবার্তাতে যেতেই রাজি হয় না, শাস্তিবিধান তো দূরের কথা। যখন পুরুষ-নারী-নির্বিশেষে শ্রমিকরা ফ্যাক্টরি এলাকার ভিতরেই থাকতে শুরু করেন, সেখানকার তহশিলদার বাধ্য হয়ে মালিকপক্ষকে সে যাত্রা আলোচনায় নামতে জোর করেন। কিন্তু যখন আবার কিছুদিন পরে আরেকজন ম্যানেজার দু’জন শ্রমিকের সাথে একই রকম দুর্ব্যবহার করে, তখন শ্রমিকরা আইনি নোটিস পাঠিয়ে প্রচলিত পথে লড়তে বাধ্য হন।

আরও সহজ একটি উদাহরণ – অ্যাপোলো টায়ার-এর সহস্রাধিক স্থায়ী কর্মী স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে কর্মক্ষেত্রে আপত্তিজনক অবস্থার প্রতিবাদ জানিয়ে প্রতিবাদ শুরু করেন। কিন্তু যখন সিটু মাঠে নামে, ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা শ্রমিকদের এই জোটকে সমালোচনা করে, অপ্রচলিত কর্মপদ্ধতির অছিলায় স্ট্রাইক বানচাল করে দেন।

গত কুড়ি বছরে শ্রমিকদের অধিকার নানা ভাবে খর্ব করা হয়েছে। রাষ্ট্র ও পুঁজির বিরোধিতার উপর বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে ট্রেড ইউনিয়নগুলির তরফে সেই একই ধাঁচের আইনি পদ্ধতি বেছে নেওয়ার প্রবণতা। এর ফল বৃহত্তর শ্রেণি-রাজনীতির উপরেও গিয়ে পড়ে।

সংগঠিতকরণের অপর্যাপ্ত উদ্যোগ

প্রতিটি ইউনিয়ন সংগঠক এবং ফ্যাক্টরিতে কাজ করা শ্রমিক এক কথায় স্বীকার করবেন, যে চুক্তি-শ্রমিকের আধিক্য শ্রমিকদের সবচাইতে বেশি বিভাজন ঘটাচ্ছে। অথচ, তামিলনাড়ুর কথা ধরতে গেলে, এল. অ্যান্ড টি., বি.ওয়াই.ডি. ইলেক্ট্রনিক্স প্রভৃতি অল্প কয়েকটি নাম বাদ দিলে এই চুক্তি-শ্রমিকদের সঙ্ঘবদ্ধ ও সংগঠিত করার চেষ্টা প্রায় কোথাওই দেখা যায় না। বরং উল্টে বেশিরভাগ প্ল্যান্টে বর্তমান ইউনিয়নগুলি আইনি ভাবে এর বিপরীত পথই নিয়ে থাকে – সংগঠিতকরণের সুযোগ শুধুমাত্র স্থায়ী কর্মীদের জন্য বহাল রেখে। এর একটা বড় কারণ আমরা আগেই জেনে নিয়েছি – যে ২৪০ দিন কাজ করলে তবেই একজন শ্রমিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিসপিউট অ্যাক্ট-এর অধীনে আসবেন, এবং ইউনিয়নের পক্ষেও তাঁর অধিকার নিয়ে কাজ করা তখন সুবিধাজনক হয়ে পড়বে।[২৪]

এ কথা জানে বলেই কোম্পানিগুলি চুক্তিবদ্ধ অস্থায়ী শ্রমিকদের সংখ্যা বাড়িয়ে চলেছে। শ্রীপেরাম্বুদুরে সি.এম.আর. টয়টসু কোম্পানি যেমন। এখানে এ.আই.সি.সি.টি.ইউ.-এর সদস্য ঊনিশ-কুড়ি জন স্থায়ী শ্রমিক ১০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে, অন্যান্য সদস্যদের থেকে এবং স্থানীয় জনগণের সহায়তায়, সাহসের সাথে স্ট্রাইক জারি রেখেছিলেন। কিন্তু ঐ ফ্যাক্টরির ৯০% শ্রমিক ছিলেন চুক্তি শ্রমিক (সংখ্যায় প্রায় ৩০০), যাঁরা স্ট্রাইকে অবস্থানকারী স্থায়ী শ্রমিকদের সহযোগিতা জানালেও তাঁদের সংগঠিত করার মত কোনো দল এগিয়ে না আসার ফলে শেষ পর্যন্ত এই আন্দোলনে যোগ দিয়ে উঠতে পারেন না। স্থায়ী শ্রমিকরা যখন তাঁদের কর্মবিরতি তুলে নেন, মালিকপক্ষের তরফ থেকে তাঁদের আর ফ্যাক্টরিতে ঢুকতে দেওয়া হয় না। এইসব হতাশাব্যাঞ্জক ঘটনার পাশাপাশি এটাও খেয়াল রাখতে হবে, যে এল. অ্যান্ড টি.-র মত কোম্পানিতে যখন স্থায়ী ও চুক্তি-শ্রমিকরা (সিটু-র অধীনে) কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্ট্রাইক ডেকেছেন, তখন তাতে শ্রমিকরা কিন্তু অনেক বেশি লাভবান হতে পেরেছেন।

এমন নয় যে শ্রমিকরা এটা বোঝেন না, যে তাঁরা স্থায়ী হন বা অস্থায়ী, মালিকপক্ষ তাঁদের একইভাবে শোষণ করে থাকে। কিন্তু উৎপাদন পদ্ধতির গঠন সহজেই তাঁদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে। তামিলনাড়ুর ক্ষেত্রে যেমন দেখা যায়, চুক্তি-শ্রমিকরা অনেকেই অভিবাসী বা দলিত বা নারী শ্রমিক, আর স্থায়ী শ্রমিকরা মূলত স্থানীয় পুরুষ। ভাষা, জাতি, ধর্ম ও লিঙ্গগত সামাজিক ভেদ পুঁজিপতিদের আখের গুছিয়ে নিতে বেশ বড় রকমের সাহায্য করে থাকে। তার উপর উৎপাদন পদ্ধতিতে (মালিকপক্ষের তরফ থেকেই) স্থায়ী কর্মচারীদের সাধারণত অস্থায়ী বা চুক্তি-শ্রমিকদের তুলনায় খানিকটা উঁচুতে জায়গা দিয়ে রাখা হয়। কাজের চাপ যত উপর থেকে নীচের দিকে নামে, তার ভার ততই বাড়ে। অনেকসময়ই চুক্তি-শ্রমিকরা অভিযোগ করে থাকেন, যে স্থায়ী শ্রমিকরা নিজেদের কাজ চুক্তি-শ্রমিকদের – বিশেষ করে প্রশিক্ষণে থাকা শ্রমিকদের – দিয়ে করিয়ে নেন। এইসব কারণে শ্রমিকদের জোটবদ্ধতা দূর হতে আরও দূরতর এক লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।

উৎপাদন একটি ফ্যাক্টরি কেন্দ্র করে না হয়ে নানান ফ্যাক্টরিতে ভাগ করে হবার ফলেও স্ট্রাইক অনেকসময় অর্থহীন হয়ে পড়ে। এই নানান ফ্যাক্টরিগুলি ছড়িয়ে থাকতে পারে গোটা পৃথিবী জুড়ে। অন্যান্য ফ্যাক্টরি থেকে শ্রমিকদের আনিয়ে কাজ করে নেওয়াও মালিকপক্ষের হাতে একটি অস্ত্র। সারা ভারতে সি.এম.আর. টয়টসুর ৬টি ফ্যাক্টরি আছে এবং তামিলনাড়ুতে স্ট্রাইকের সময় উত্তর ভারত থেকে কর্মচারী সরবরাহ করেই এই কোম্পানি কাজ চালিয়ে নিয়েছিল। ইউনিয়নগুলি সাধারণত শুধুই ফ্যাক্টরি-স্তরে সংগঠন নিয়ে মাথা ঘামিয়ে থাকে। তবে তার মানে এ-ও নয়, যে ভিন্ন ভিন্ন ফ্যাক্টরির শ্রমিকরা এক অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল নন। সি.এম.আর. টয়টসু এবং জিনটেক – দুটি কোম্পানির ক্ষেত্রেই অন্য ফ্যাক্টরির শ্রমিকরা স্ট্রাইকরত শ্রমিকদের আর্থিক ও অন্যান্য নানা সহযোগিতা করে গেছেন পুরোমাত্রায়।

যেটা একেবারেই করা যায়নি, সেটা হল, এক ফ্যাক্টরি থেকে আরেক ফ্যাক্টরিতে প্রতিবাদের রেশ ছড়িয়ে দেওয়া। শ্রীপেরাম্বুদুরে যখন অটোমোবাইল সেক্টরে ‘সাপ্লাই চেইন’ পদ্ধতিকে রুখে দেবার চেষ্টায় স্ট্রাইক ডাকা হয়, তার প্রভাব অনেকদূর অব্দি গড়াতে পারত। অ্যাপোলো শ্রমিকরা যখন কাজ থামিয়ে দেন, ভিতরের খবর বলে, যে রেনল্ট নিসান-এর উৎপাদনে তার প্রভাব গিয়ে পড়েছিল। অথচ আবার জিনটেক-এ স্ট্রাইকের সময় হুন্ডাই-এর শ্রমিকদের থেকে আর্থিক ছাড়া আর কোনো সাহায্য আসেনি, হুন্ডাই জিনটেকের খরিদ্দার হওয়া সত্ত্বেও। সেন্ট্রাল ট্রেড ইউনিয়ন, যারা আকার ও জনসংযোগের ক্ষেত্রে সবথেকে বড়, তাদেরও ইতিহাসে এজাতীয় যোগাযোগের ঘটনা ঘটেনি বললেই হয়।

অন্তঃসলিলা আমলাতন্ত্রের কুপ্রভাব                                                                                

লেবার ডিপার্টমেন্ট আর লেবার কোর্টের হাজার একটা মিটিং, কেসের পক্ষেবিপক্ষে নানা সংস্থা থেকে প্রমাণ সংগ্রহর দায়, উকিলের সাথে কথাবার্তা ইত্যাদি, তার উপর নানা আইনি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা অনেক সময় শ্রমিকদের জোট বাঁধার পথে ও স্ট্রাইক করার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

লেবার ডিপার্টমেন্ট, কোর্ট এবং পুলিশ এমনিতেই শ্রমিকদের পক্ষে কাজ করে থাকে, নাকি বিপক্ষে তা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে শ্রমিকদের যে দুর্ভোগ পোয়াতে হয়, এদের থেকে তার কোনো সুরাহা আশা করা বাতুলতা। যে সংস্থাগুলি থেকে প্রমাণ সংগ্রহ ইত্যাদি করতে হয়, সেগুলিও খুব সহজ ঠাঁই নয়। ফলে এই গুরুদায়িত্বও গিয়ে পড়ে শ্রমিকদের এবং ইউনিয়ন সংগঠকদের উপরেই। অথচ এই প্রমাণ সরবরাহকারী সংস্থাগুলির তরফে কাজ হয়তো অল্পই, তা সত্ত্বেও তাদের থেকে কাজ বার করতে প্রায়ই শ্রমিকদের এবং সংগঠকদের কালঘাম ছুটে যায়। অবশ্যপ্রয়োজনীয় সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক আলোচনা, যোগাযোগ নির্মাণ, মাটির কাছাকাছি থেকে সত্যিকারের গঠনমূলক কাজকর্ম, জোটবদ্ধ শ্রমিক শ্রেণির সাথে গণতান্ত্রিক আলোচনা ও সিদ্ধান্ত – এসবের পরিবর্তে সংগঠকদের কাজ হয়ে দাঁড়ায় যে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাঁদের লড়াই, সেই ব্যবস্থারই ফসল সংগঠিতকরণ ও প্রতিবাদের এক অন্তহীন নিষ্ফল চক্র ঘুরিয়ে যাওয়া। যে সময় দেওয়া প্রয়োজন ছিল বিভিন্ন ফ্যাক্টরির ভিতর যোগাযোগ গড়ে তোলার কাজে, সেই সময় ব্যায় হয়ে যায় কোর্টে প্রায় নিশ্চিত ভাবে হেরে যাওয়া কেস লড়তে লড়তে, প্রমাণ সরবরাহকারী সংস্থাগুলির দরজায় থানা গেড়ে থাকতে থাকতে।

আরেক রকমের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, যা ইউনিয়নগুলিকে সামলে চলতে হয়, তা হল তাদের নিজস্ব কাগজপত্র ও বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে হালনাগাদ। সিটুর এক সংগঠক একবার বলেছিলেন, অনেকসময় ফ্যাক্টরি-স্তরে সংগঠন করতে গিয়েও তাঁদের প্রায় চার পাঁচ বছরের সদস্যপদের সমস্ত কাগজপত্র ঘেঁটে দেখতে হয়, যাতে মালিকপক্ষের তরফে স্ট্রাইকে অবস্থানকারী শ্রমিকদের অসংগঠিত বলে চালিয়ে না দেওয়া যায়।

বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের ইউনিয়নগুলির কাজকর্মের উপর ক্রমবর্ধমান শ্যেন দৃষ্টি রাখছে; তার পাশাপাশি রয়েছে এই সরকারের তরফে, শ্রমিক আইনের যথেচ্ছ অপলাপ সত্ত্বেও, কোম্পানিগুলিকে আইনি বিচারে স্ব-শংসাপত্র দানের সুযোগ করে দেবার কাহিনী। এখন অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, যে কাগজপত্রের সামান্য চ্যুতির সুযোগ নিয়ে রাজ্যগুলি অপর্যাপ্ত তথ্যের অভিযোগে একটি ইউনিয়নকে বাতিল বলে দেগে দিতে পারে। অসংগঠিত শ্রমিকদের জন্য এন.আর.ই.জি.এ., পি.ডি.এস. ইত্যাদি ‘সোশ্যাল সিকিওরিটি ওয়েলফেয়ার’-এর ক্ষেত্রে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অন্যদিকে ইউনিয়নগুলিও রাষ্ট্রের এই শোষণমূলক ব্যবহারের নিন্দা করলেও একে নিজেদের এবং শ্রমিক সদস্যদের তরফ থেকে সম্পূর্ণ বর্জন করা বা এর কোনো বিকল্প দাবি করার কোনো পদ্ধতি ভেবে উঠতে পারছে না।[২৫]

সাধারণ মানুষ ও সাধারণ রাজনৈতিক কর্মীদের হতাশা

যখন ফ্যাক্টরিতে নতুন নতুন সমস্যা দেখা দেয়, প্রচলিত পদ্ধতিতে চট করে তার সমাধান খুঁজে পাওয়া যায় না। আবার একেকটি বিশেষ সমস্যা বা বিশেষ আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য বিচার করে অপ্রচলিত পথ খোঁজার উদ্যোগও বড় একটা দেখা যায় না। শ্রমিকদের একদিকে মনে হতে থাকে, যে ইউনিয়নগুলি তাঁদের স্বার্থ দেখছে না, অপরদিকে তাঁরা নিজেরাও ইউনিয়নকে তাঁদের জোটবদ্ধতার প্রতিনিধি হিসেবে না দেখে মালিক ও শ্রমিক শ্রেণির মধ্যেকার ফড়ে হিসেবে দেখতে থাকেন। এই অবিশ্বাস ও মনের জোরের অভাবের কারণে যেমন তামিলনাড়ুতে শ্রমিকদের মধ্যে ভিআরএস নেবার হার বেড়ে গেছে, ইউনিয়নের সদস্যপদ ত্যাগ করার ঘটনা (২০১৩ থেকে ২০১৫-র মধ্যে জিনটেক কোম্পানির ৩০ জন স্থায়ী কর্মী ইউনিয়নের সদস্যপদ ত্যাগ করেন) বা ইউনিয়ন বদল করার ঘটনাও (এশিয়ান পেইন্টস, সানমিনা) ক্রমে বেড়েই চলেছে। কিন্তু মূল সমস্যাটি রয়ে যাচ্ছে ইউনিয়নগুলির প্রচলিত কাজের ধরনেই, যা নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা কমই হচ্ছে।

ইউনিয়ন সংগঠকরাও অনেকসময় শ্রমিকদের অনুৎসাহ দেখে মনে করেন যে তাঁদের খাটাখাটনি বৃথাই যাচ্ছে (কেউ কেউ অবস্থার পরিবর্তন না হলে ব্রাঞ্চ অফিস বন্ধ করে দেবার কথা ভাবতে শুরু করেন, এমনটিও শোনা গেছে)। তাঁদের অভিযোগ গিয়ে পড়ে হয় শ্রমিকদের উপর, নয় যে ইউনিয়নগুলি ফ্যাক্টরিতে তাঁদের সরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে, তাদের উপর। এইভাবে শ্রমিক আন্দোলন অনেকসময় নিজেদের মধ্যে খেয়োখেয়ির জায়গায় গিয়ে পড়ে। আই.এন.টি.ইউ.সি.-র মত ইউনিয়নগুলি আবার সংগঠিতকরণের আড়ালে মালিকপক্ষের হয়ে কাজ করতে থাকার ফলেও শ্রমিকদের জোটবদ্ধ শক্তি ব্যাহত হতে থাকে।

কেন্দ্রীয় স্তরেও ইউনিয়নগুলির মধ্যে দক্ষিণপন্থী বি.এম.এস. থেকে শুরু করে নানান বামপন্থী ইউনিয়নের যে জটিল রাজনৈতিক ভাগাভাগি, তা এই সমস্যাকে সাধারণ শ্রমিক ও সংগঠকদের কাছে আরও গুলিয়ে দেয়। একদিকে বি.এম.এস., আই.এন.টি.ইউ.সি. প্রভৃতি ইউনিয়নগুলি শপ ফ্লোরে মালিকপক্ষের হয়ে যে কর্মপদ্ধতি চালিয়ে যায়, তার বিরোধিতা করে গণতান্ত্রিক অধিকারের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন, অন্যদিকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রাজ্য স্তরে বা জাতীয় স্তরে সেই ইউনিয়নগুলির সাথেই জোট বাঁধা প্রয়োজন : সাধারণ শ্রমিক বা ফ্যাক্টরি স্তরে সংগঠকদের কাছে এই দুই প্রয়োজনের টানাপোড়েন একটি বড় বৈপরীত্যের জায়গা হয়ে উঠতে পারে, এবং ওঠে। বাম নেতারা বড় সহজেই বলে ফেলেন, শ্রমিকদের উচিত শপ ফ্লোরে নিত্যদিনের লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে বৃহত্তর রাজনীতির প্রয়োজনে এজাতীয় আঁতাতকে বিনা বাক্যব্যায়ে বুঝে নেওয়া! বাস্তবে এটা অত সহজ নয়।

প্রকৃত অর্থে জোট বাঁধার জন্য সংগঠিতকরণ কীভাবে সম্ভব?

উপরের উদাহরণগুলি থেকে দেখা যাচ্ছে, প্রচলিত কর্মপদ্ধতি আসলে শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে অসাম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্ররোচিত না করে বড়জোর মালিক-শ্রমিকের মাঝে দাঁড়িয়ে আইনি অর্থে শ্রমিকদের কিছু মৌলিক অধিকারের আংশিক দাবি তুলে উঠতে পারে মাত্র। তাঁদের এই দাবির কাঠামোটি দাঁড়িয়ে আছে শ্রমিকদের জোটবদ্ধ শক্তির উপর ভর করে নয়, রাষ্ট্র এবং যাদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হওয়া প্রয়োজন, সেই মালিকপক্ষের ছকে দেওয়া কিছু নিয়মকানুনের উপর ভর করে। এই অবস্থায় অধিকারের প্রশ্নে সমস্ত আলাপ-আলোচনা মজুরিকেন্দ্রিক হয়ে দাঁড়ায়, আর কিছুই তাতে স্থান পায় না।

ভিন্ন ভিন্ন কোম্পানির শ্রমিকরা যে একে অপরের সমস্যা বুঝতে পারেন না, বা সহানুভূতির সাথে দেখেন না – এমনটি নয়। কিন্তু স্ব-স্বার্থ এসে পড়লে স্বভাবতই, এবং উপায়ের অভাবেও, জোটবদ্ধতার সংজ্ঞাটি সীমিত দৃষ্টিতে দেখা হয়ে থাকে। সে কথা মাথায় রেখে সংগঠিতকরণের পদ্ধতি কি আরও বেশি করে এই জোটবদ্ধতার অভিমুখে চালিত করা যেতে পারে? শপ ফ্লোরের বাইরে যে সব সমস্যা সৃষ্টি হয়, তার ভিতর দিয়ে এই কাজটি হয়তো কিছুটা সহজ হয়। যেমন হুন্ডাই মালিকেরা কোম্পানির দু’জন পুরনো কর্মচারীকে শাস্তি দেবার চেষ্টা করেন এই দোষে, যে তাঁরা এইচ.এম.আই.ই.উ.-র সদস্য ছিলেন, যাকে হুন্ডাই ম্যানেজমেন্ট শংসাপত্র দেয়নি। এর বিরুদ্ধে প্রায় ৩০০ শ্রমিক গভীর রাত পর্যন্ত প্রায় ১২ ঘণ্টা প্রতিবাদ জারি রেখে এই সিদ্ধান্ত ঘুরিয়ে দিতে সক্ষন হন। ও.এম.এ.এক্স.-এ একজন চুক্তি-শ্রমিক বরখাস্ত হয়ে যাবার পর আত্মহত্যা করলে সমস্ত স্থায়ী ও চুক্তি-শ্রমিকরা মিলে মালিকদের বাধ্য করেন ঐ শ্রমিকের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে।

আমরা দেখেছি কীভাবে অসাম্য বা অত্যাচার অত্যধিক হয়ে পড়লে শ্রমিকরা তাৎক্ষণিক কর্মবিরতির মাধ্যমে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ গড়ে তোলেন। তামিলনাড়ুতে হুন্ডাই, লুকাস টিভি, সানমিনা ইত্যাদি কোম্পানির শ্রমিকরা অভাবনীয় দায়িত্ববোধের সাথে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। এখানকার ইউনিয়নগুলির কি উচিত ছিল না এই আন্দোলনের জোটবদ্ধতাকে আরও শক্তিশালী করে তোলা? তা না করে বহু ক্ষেত্রে যা হয়ে থাকে, তা হল আন্দোলনটিকে অর্থহীন রাষ্ট্রীয় আইনকানুনের জটিলতায় জড়িয়ে ফেলা। এন.এইচ.কে.এফ.-এর চুক্তি-শ্রমিকদের বরখাস্তকরণের প্রতিবাদে গড়ে তোলা আন্দোলনে রেনল্ট নিসান, এন.এইচ.ভি., হুন্ডাই প্রভৃতি নানা অন্য কোম্পানি থেকে ৩০০০-এরও বেশি শ্রমিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসেন। এই জমায়েত এত বড় চেহারা নিয়ে নেয়, যে আঞ্চলিক তহশিলদারকে তা সামলানোর জন্য ছুটে আসতে হয়। এইসব উদাহরণ থেকে এমনটাই মনে হয়, যে যেসব ক্ষেত্রে শ্রমিকরা অসুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে, আন্দোলনকে সেখানে টেনে নিয়ে যাবার পরিবর্তে যেখানে শ্রমিকরা একত্রিত হতে পারবেন, আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে আরও ভালো ভাবে বুঝতে, শিখতে পারবেন, যেখানে তাঁরা ইতিমধ্যেই মালিকপক্ষের তুলনায় কয়েক পা এগিয়ে আছেন, সংগঠিতকরণের অভিমুখ সেইদিকেই হওয়া উচিত।

কারখানা ও মজুরিকেন্দ্রিক আলাপ-আলোচনার পাশাপাশি অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয়গুলিকে শ্রমিক আন্দোলনের পুরোভাগে নিয়ে আসার কাজটি বাম ইউনিয়নগুলির পক্ষে করা সম্ভব, কারণ তারা বহু দশক ধরে নানা সামাজিক আন্দোলনের (ছাত্র ও যুবসমাজের ভিতর কাজকর্ম, নারী আন্দোলন ইত্যাদি) মধ্যে দিয়ে সদস্য সংগ্রহ করেছে। তামিলনাড়ুর ভেঞ্চার লাইটিং কোম্পানির মহিলা কর্মচারীরা যখন একজন ম্যানেজারের বিরুদ্ধে যৌন নিগ্রহের অভিযোগ এনে স্ট্রাইক শুরু করেন, সেই একই সময় তাঁদের ইউনিয়নের ছাত্র শাখা রসিলা নামক এক মহিলা আইটি কর্মীর কর্মক্ষেত্রে মৃত্যুর যথাযথ অনুসন্ধানের দাবিতে আন্দোলন চালাচ্ছিল। এই বিচ্ছিন্ন আন্দোলনগুলিকে যদি একজোট করা যায়, তাহলে আন্দোলন শুধুমাত্র চরম অবস্থায় প্রযোজ্য এক পন্থা (রসিলার ক্ষেত্রে যেমন) হিসেবে না থেকে গিয়ে সদাজাগ্রত এক ‘নেটওয়র্ক’ হয়ে উঠতে পারে (এখানে এটা জেনে রাখা প্রয়োজন, যে ভেঞ্চার লাইটিং-এর মহিলা কর্মচারীদের স্ট্রাইক করার অপরাধে বরখাস্ত করা হয় এবং তাঁরা এখন আইনি পথে তাঁদের সমস্যার সমাধান খুঁজছেন)। আন্দোলনকে দৃঢ়তর করে তোলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হল শ্রমিকদের বসবাস-অঞ্চলের যে গোষ্ঠীবদ্ধ জীবন, তাকে আন্দোলনের সামিল করে নেওয়া, যা ইতিমধ্যেই কোথাও কোথাও ঘটেছে। তামিলনাড়ুতে শ্রমিক ইউনিয়নগুলি এখন কৃষক ও কৃষি-শ্রমিকদের নিয়েও কাজ শুরু করছেন – বিশেষত যাঁরা দীর্ঘ খরার শিকার হয়ে চলেছেন। ভিনরাজ্যের শ্রমিকদের প্রতি সহযোগিতার কাজও হয়ে চলেছে। কিন্তু এখনও বিভিন্ন ইউনিয়নের সদস্য শ্রমিকদের সমস্যায় একে অপরকে সাহায্য করার বিষয়টি নিয়ে – বিশেষত যে ঘটনাগুলিকে সরাসরি শ্রমিক শ্রেণির সমস্যা বলে প্রচলিত অর্থে দেখা হয় না, সেইসব সমস্যা নিয়ে – আরও গভীরে ভাবার প্রয়োজন রয়ে গেছে পুরোমাত্রায়।

এর জন্য সবচাইতে বেশি প্রয়োজন আলাপ-আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে শ্রমিকদের আরও বেশি পরিমাণে সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করা। তাঁরা নিজেদের সমস্যা, সমাধানের নানা পথ, জোর ও দুর্বলতার জায়গাগুলি নিয়ে নিজেরা আলোচনা করলে তবেই হয়তো পুঁজি ও রাষ্ট্রের প্রভাব তাঁদের জীবনযাত্রায় ও চিন্তাভাবনায় কতদূর শিকড় গেড়ে আছে, তা তাঁদের কাছেও পরিষ্কার হবে, এবং এমন কিছু নতুন পথ বেরিয়ে আসবে যা প্রচলিত সংগঠনের ভাবনার চেয়ে আলাদা ও অধিক প্রভাবশালী। নতুন ইউনিয়ন নির্মাণের সময়েও শ্রমিকদের নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার প্রচলন একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নিতে পারে।

উৎপাদনের কাঠামোগত সমস্যার দাবি – যেমন স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার দাবির মধ্যে দিয়ে শুধু যে শ্রমিকদের একজোট করতে সুবিধা হয় তা-ই নয়, শ্রমের সামাজিক এবং প্রযুক্তিগত প্রাসঙ্গিকতাগুলি বুঝে নিতেও সুবিধা হয়। হয়তো এই কারণেই মানেসরে যখন একজন অটোমোবাইল কোম্পানির শ্রমিক মারা যান, প্রায় ৪০টি ফ্যাক্টরির শ্রমিকরা তার বিচার চেয়ে একত্রিত হয়েছিলেন।

শ্রমিকদের মধ্যে সামাজিক বিভাজনকে মালিকপক্ষের ছকে দেওয়া উৎপাদন পদ্ধতি আরও তীব্র করে তোলে। একটি অটোমোবাইল কোম্পানিতে এক অন্তঃসত্বা মহিলা কর্মীকে একজন ম্যানেজার দীর্ঘ ‘বাথরুম ব্রেক’-এর অভিযোগে মৌখিক ভাবে নিগ্রহ করে। এর প্রতিবাদে শ্রমিকরা যখন লাঞ্চ বয়কট করছিলেন, ম্যানেজমেন্ট সেই মহিলা কর্মী ও তাঁর স্বামীকে আলাদা ভাবে ডেকে এর সমাধান করার চেষ্টা করে। অথচ ইউনিয়ন থেকে এর কোনো প্রতিবাদ করা হয় না; এমনকি সেই মহিলা কর্মীর স্বামীর যে এই গোটা বিষয়টায় কোনো ভূমিকাই নেই, একজন নারী-শ্রমিক হিসেবে এই বিশেষ সমস্যা যে আসলে শ্রমিকদের এবং শ্রমিক-সংগঠনেরই, এবং তার সমাধান যে তাদেরই দায়িত্ব, তাঁর পরিবারের নয়, সে নিয়ে পিতৃতন্ত্রবিরোধী একটি আলোচনাও উঠে আসে না। এইভাবে নারী, দলিত বা অভিবাসী শ্রমিকদের সমস্যার শ্রমিক আন্দোলনে অন্তর্ভুক্তি আজও একটি বড় বাধা হয়ে রয়ে যাচ্ছে। মনে পড়ে যায়, এল. অ্যান্ড টি.-র স্থায়ী শ্রমিক ও অভিবাসী চুক্তি-শ্রমিকদের কাঁধে কাঁধ দিয়ে গড়ে তোলা প্রতিরোধের কথা। স্থায়ী শ্রমিকরা চুক্তি-শ্রমিকদের দিনে অন্তত একবার খাবার ব্যবস্থা করতে সক্ষম হন, কারণ তাঁরা বুঝেছিলেন, আন্দোলনের পথে এবং জোটবদ্ধতার পথে এটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

শ্রমিকদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে পারে তখনই, যখন শ্রমিক নিজে আন্দোলনের কেন্দ্রে থাকবেন। বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদের ঘটনাগুলিকে জুড়তে জুড়তে, আইনি পথের পাশাপাশি সরাসরি প্রতিরোধ গড়ে তোলার কথা মাথায় রেখে, একাধারে শপ ফ্লোরে ও বাইরে শ্রমিকদের নিজেদের কণ্ঠ সোচ্চার করে তোলার পথই সংগঠিতকরণের পথ। শ্রমিকরা যদি চিনে নিতে পারেন, কোন প্রতিষ্ঠান তাঁদের সঙ্গে লড়ছে, আর কে তাঁদের বিপক্ষে, সে-ই তাঁদের সবচাইতে বড় রাজনৈতিক শিক্ষা।

পাদটীকা

[১] Report on the ongoing struggle and repression at Honda Motorcycles and Scooters Factory, Tapukera by Workers Solidarity Centre, http://tnlabour.in/?p=3320

[২] Make in India: Carrots to the corporates, lathis to the workers, http://tnlabour.in/?p=3324

[৩] Deregulating Capital, Regulating Labour, http://www.epw.in/journal/2014/26-27/special-articles/deregulating-capital-regulating-labour.html

[৪] Memoir of Nokia in Sriperumbudur, http://tnlabour.in/?p=2782

[৫] Workers strike thrice in five months, How Maruti Suzuki lost connect with them, http://articles.economictimes.indiatimes.com/2011-10-17/news/30290122_1_manesar-plant-maruti-suzuki-s-manesar-maruti-s-manesar/5

[৬] 2400 Apprentice left in the lurch by Lucas-TVS management, http://tnlabour.in/?p=3141

[৭] Supreme Court to decide the fate of union in Foxconn, Sriperumbadur, http://tnlabour.in/?p=1971

[৮] https://marutisuzukiworkersunion.wordpress.com/

[৯] Conversation with a worker

[১০] Report on deadly attack on worker activists of Gurgaon Mazdoor Sangharsh Samiti and Bigul Mazdoor Dasta, http://sanhati.com/articles/9728/

[১১] Punishment for striking? Skilled workers in Chennai restricted to menial tasks by automobile company, http://tnlabour.in/?p=2443

[১২] All Out Crackdown on the Working Class in Noida, http://www.epw.in/journal/2013/09/web-exclusives/all-out-crackdown-working-class-noida.html

[১৩] Outrage at the murder of NLC Contract Worker by CISF – Protests in Chennai, http://tnlabour.in/?p=2109

[১৪] Post-26/11, big private firms choose CISF to provide security cover, http://articles.economictimes.indiatimes.com/2011-11-27/news/30444752_1_cisf-men-central-industrial-security-force-private-sector

[১৫] Where have all the workers gone? The puzzle of declining labour intensity in Organized Indian Manufacturing, http://www.seed.manchester.ac.uk/medialibrary/IDPM/working_papers/depp/depp-wp36.pdf

[১৬] Explaining Employment Trends in the Indian Economy: 1993-94 to 2011-12, http://www.epw.in/journal/2014/32/special-articles/explaining-employment-trends-indian-economy-1993-94-2011-12.html

[১৭] General strikes : A survey of recent strikes and what they mean for the working class movement, http://tnlabour.in/?p=3440

[১৮] The growth and decline of political unionism in India: The need for paradigm shift, International Labour Organization http://www.ilo.org/wcmsp5/groups/public/—asia/—ro-bangkok/—sro-bangkok/documents/publication/wcms_143481.pdf

[১৯] Is Apple cleaning up its act on labour rights?, http://www.theguardian.com/sustainable-business/apple-act-on-labour-right

[২০] Modi ge dikkara: Women garment workers push back against the government, http://tnlabour.in/?p=3601

[২১] These strikes are documented in detail at http://www.tnlabour.in

[২২] For example, in a recent rally on Bhagat Singh anniversary, a woman worker talked about new forms of slavery at workplace in Sanmina

[২৩] These are explained in detail in an earlier article.

[২৪] While, this allows contract workers who have completed 240 days of work to be brought into the ambit of the law, the unions rely on the records of legal institutions such as Labour Department, Department of Industrial Safety and Health which are incomplete and insufficient. This is not challenged by using the union membership and work relationship with permanent workers to prove 240 days of employment.

[২৫] For example, unions do not use their own worker membership to challenge contract worker status.

 

[ক] কেন্দ্রীয় শ্রম আইন পরিবর্তন করার অধিকার রাষ্ট্রের আছে।

[খ] বিভিন্ন রাজ্যে ও সেক্টরে যে বড় বড় ট্রেড ইউনিয়নগুলি রয়েছে, এবং যাদের অন্তত ৫ লাখ সদস্য রয়েছে, তারাই সেন্ট্রাল ট্রেড ইউনিয়ন।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s