শহরকেন্দ্রিক ভারতীয় কনটেম্পোরারি নাচে প্রগতিশীল সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়ের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও বর্তমান

 

(আয়নানগর, বইমেলা সংখ্যা, ২০১৯)

ভারতীয় কনটেম্পোরারি নাচ বলতে ঠিক কি বোঝায়, ভারতীয় নাচ ঠিক কবে থেকে ‘কনটেম্পোরারি’ বলে পরিচিত হল, কোন নৃত্যকারের (কোরিওগ্রাফার) কোন ধারার পরীক্ষানিরীক্ষাকে ‘কনটেম্পোরারি’ বলে দাগিয়ে দেওয়া যায় এবং কেন – তার সর্বসম্মত ধারাবাহিক ইতিহাস তেমন নেই, যা কিনা পাশ্চাত্যে অনেকটা রয়েছে। বছর পাঁচেক আগে আয়নানগরের প্রথম বইমেলা সংখ্যায় নিজের নাচ করা ও দেখার অভিজ্ঞতার উপর ভর করে এই নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম, তাতে নানা সংজ্ঞায়ন ও উদাহরণ সহযোগে নাচের গঠনপ্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা ছিল। এই লেখায় তার বিশেষ পুনরাবৃত্তি করব না। বরং কনটেম্পোরারি নাচ বস্তুটিকে কোনো প্রথাগত সংজ্ঞা ছাড়া একটু ঢিলেঢালা ভাবেই এই লেখায় ব্যবহার করা হবে। বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীর কিছু কাজ (মূলত মডার্নিস্ট কাজ বলে যাদের চিহ্নিত করা যায়) এই লেখায় কনটেম্পোরারি বা সমসাময়িক নাচের উদাহরণ হিসেবে উঠে আসবে। শর্ত থাকবে একটিই, যে এই কাজগুলির নৃত্যকাররা বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছেন সমসাময়িক সমাজকে।

তবে এটুকু বলে রাখা ভালো যে, নাচের ক্ষেত্রে কনটেম্পোরারি কথাটি একটি ফর্মকে সূচিত করে, এটি সাধারণ অর্থে সমসাময়িকতার সাথে এক নয়। ভারতে মার্গীয় (ক্লাসিকাল) নাচ, লোকনৃত্য (ফোক) এবং সিনেমার নাচ – এই তিন ধরনের নাচের এক অর্থে বিপরীতে দাঁড়িয়ে যে পরীক্ষানিরীক্ষামূলক, গবেষণাধর্মী নাচের উদ্ভব হয়, যাতে নাচের ও অন্যান্য শারীরিক গতির সাথে সম্পর্কিত নানা ফর্মও (নাটক, মার্শাল আর্ট, যোগাভ্যাস ইত্যাদি) মিশে যায়, আবার কোনো পূর্বনির্ধারিত ফর্মের উপর ভরসা না করে একদম ভিতর দিকে আসা স্বাভাবিক নড়াচড়া বা ফ্রি মুভমেন্ট-কেও যাতে কাজে লাগানো হয়, এবং নাচের পোশাক নিয়েও যেখানে তেমন কোনো নীতিবদ্ধতা নেই, তাকে ভারতীয় কনটেম্পোরারি নাচ বলা যেতে পারে। অবশ্যই এর সমসাময়িক বিষয়ধর্মিতাও এই নামের পিছনে আরেকটি কারণ। কনটেম্পোরারি নাচের এই সংজ্ঞায়নটি আমার মস্তিষ্কপ্রসূত নয়। যেমন এটি ফিলিপ নইসের ‘টক অ্যাবাউট কনটেম্পোরারি ডান্স’ বইতে দেওয়া সংজ্ঞার সাথে মিলে যায়। তবে এই সংজ্ঞা দিয়ে ভারতীয় কনটেম্পোরারি নাচকে অন্যান্য নাচের চাইতে একদম আলাদা একটি সুসংজ্ঞায়িত বস্তু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা মুশকিল। যেমন ছৌ নাচে বা অন্য নানা লোকনৃত্য ও মার্গীয় নাচে শুরুর দিকে ফ্রি মুভমেন্ট-কে নাচের ব্যাকরণের ভিতর ঢুকিয়ে নেওয়া হয়েছিল বলে অনুমান করা হয়, প্রমাণও পাওয়া যায়। আবার অন্যদিকে সমসাময়িক বিষয়ের উপরও কিন্তু কনটেম্পোরারি নাচের একচেটিয়া অধিকার নেই। মার্গীয় নাচের অনেক শিল্পীও এখন তাঁর নাচের ফর্ম-এ বদল না ঘটিয়েও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে কাজ করে থাকেন। তাছাড়া, ১৯২০-র দশক থেকে ভারতে নাচ নিয়ে এইজাতীয় গবেষণামূলক কাজ শুরু হওয়া সত্ত্বেও কনটেম্পোরারি নাচ নামটি এ দেশে পাকাপাকি ভাবে এসেছে বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এবং শুধুমাত্র বর্তমান শতাব্দীতে এসে এই নামটি জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এর আগে নাচ প্রসঙ্গে ‘আধুনিক’ কথাটিই বেশি ব্যবহার হত। এই লেখাতেও তাই আধুনিক নাচ এবং কনটেম্পোরারি নাচকে অনেকসময় একই অর্থে ব্যবহার করা হবে।

এই লেখাটির একটা বড় অংশ বন্ধু তথা পূর্বতন নাচিয়ে-বর্তমানে লেখক-গায়ক দ্যুতি মুখার্জির সাথে নানা আলোচনা-লেখালেখি-গবেষণার চেষ্টার মধ্যে দিয়ে উঠে এসেছে। দ্যুতির সাহচর্য ও সহযোগিতা ছাড়া এ বিষয়ে ভাববার ইচ্ছেটাই হয়তো তৈরি হত না। এছাড়া ভূমিকায় আর দুটি কথা বলার। এক হল, এখানে ব্যবহৃত উদ্ধৃতিগুলির মধ্যে বেশ কিছু আদতে ইংরিজিতে ছিল। আশা করি অনুবাদে মূল উদ্ধৃতির বক্তব্য কোনো ভাবে বিকৃত হয়নি। দ্বিতীয় কথা, এই লেখার একটি পূর্ববর্তী সংস্করণ গত বছর তামিলনাড়ুর মনলমগুড়ি আর্ট ম্যাগাজিনে বেরিয়েছে।

(১) এই সময় নাচ ও নাচ নিয়ে লেখা

• কনটেম্পোরারি নৃত্যকারদের রাজনৈতিক মনোবৃত্তি

রাজনীতি বিশ্লেষক লরেন্স ব্রিট ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্যের একটি তালিকা বানিয়েছিলেন – যে বৈশিষ্ট্যগুলি ভারত সমেত পৃথিবীর ‘উন্নত’ ও ‘উন্নয়নশীল’ দেশগুলির মধ্যে ক্রমশ আরও প্রকট হচ্ছে। দক্ষিণপন্থী রাজনীতির উত্থানের সাথে সাথে এই দেশগুলিতে যে ধর্মান্ধতা, মৌলবাদ, পিতৃতন্ত্র বা সাধারণ ভাবে সেক্সিজম-এর প্রকাশ, কর্পোরেট বা প্রাইভেট পুঁজির বাড়বাড়ন্ত, দুর্নীতি ও নানা অবক্ষয় দেখা দিচ্ছে, তার সবই ব্রিটের এই তালিকায় ছিল। এসবের মধ্যে একটি সামাজিক বৈশিষ্ট্য ছিল – ‘বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীদের বিষয়ে ঘৃণা’। অর্থাৎ চিন্তাভাবনা, বিশ্লেষণ, সৃজনশীলতা – যা মানুষের মনে প্রগতিশীল প্রশ্ন জাগিয়ে তোলে এবং বাক-স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ায় – তেমন সবকিছুর প্রতি সন্দেহ ও বিতৃষ্ণা। উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতে, পঞ্চাশের দশকে, তৎকালীন শাসক কংগ্রেস সরকারের তরফ থেকে আইপিটিএ-র নানা নাটককে বেআইনি ঘোষণা করা অথবা এমার্জেন্সির সময় বুদ্ধিজীবী-শিল্পীদের সরকারবিরোধী বাক-স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা থেকে শুরু করে বর্তমান ভারতে বিশেষ রাজনৈতিক দলের ধামা না ধরলে স্টেজ না পাওয়া, বিশেষ ধরনের সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে সৃষ্ট বইয়ের প্রকাশক না পাওয়া বা নাটকের পরিবেশক না পাওয়া, ধর্ম বিষয়ে সমালোচনামূলক বইয়ের বা কবীর কলা মঞ্চ প্রমুখ প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক পরিসরের নিষিদ্ধকরণ, নানা সাজানো মামলায় ‘আরবান নক্সাল’দের যথেচ্ছ অ্যারেস্ট – এসব হল ভারতের প্রেক্ষিতে এই বৈশিষ্ট্যের নানাবিধ উদাহরণ।

স্বাভাবিক ভাবেই বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীদের একাংশ এর প্রতিবাদে নানা মাধ্যমে প্রগতিশীল সমালোচকের ভূমিকা নিয়ে থাকেন। যেমন আগামী দু’মাসে বেশ কয়েকটি মেট্রোশহরের পেশাদার শিল্পী-সাহিত্যিকরা গণতন্ত্রের পক্ষে এবং হিংসার বিরুদ্ধে, ‘আর্টিস্টস ইউনাইট’ নামে, সরকারের প্রতি সমালোচনামূলক প্রদর্শনী ও প্রতিবাদ সভা করতে চলেছেন। ব্যবস্থাপকদের মধ্যে, লক্ষ্যণীয় ভাবে, নৃত্যশিল্পীর সংখ্যা কম নয় মোটেই।

বর্তমানে এদেশে শহুরে শিল্প-সংস্কৃতির জগতে প্রতিবাদের ঢেউ ওঠার পিছনে আরও কারণ রয়েছে। বিজেপি দল এযাত্রা কেন্দ্রীয় সরকার গড়তে আসার সময় শিক্ষা-সংস্কৃতির উন্নয়ন বিষয়ে ঝুড়ি ভরে যে প্রতিজ্ঞা করেছিল, তা একের পর এক বাজেটে আর পাঁচটা জিনিসের মত মিথ্যে প্রমাণ হয়ে গেছে এবং উল্টে শিক্ষা ও সংস্কৃতি – এই দুই বিভাগেই সমস্ত স্তরে লভ্য টাকার অঙ্ক কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারেও বিশেষ করে (শহুরে) ভারতীয় কনটেম্পোরারি নাচের কদর এই মুহূর্তে তেমনটি আর নেই, যেমন হয়তো বা বছর দশেক আগেও ছিল। অতএব একদিকে সৃষ্টির (বা ‘শৈল্পিক উৎপাদনের’) স্বাধীনতা ও বাক-স্বাধীনতা ধরে রাখতে চেয়ে, আর অন্যদিকে বেরোজগেরে অবস্থায় তিতিবিরক্ত হয়ে সমসাময়িক শিল্পীদের এই প্রগতিশীল সমালোচক অংশটি যে অন্তত মুখে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানবিরোধী একটা অবস্থান নেবেন, তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই।

কনটেম্পোরারি নৃত্যশিল্পীদের ক্ষেত্রে বিশেষ করে লক্ষ্য করা যায়, যদিও কথাগুলো সাধারণ ভাবে সব ঘরানার শহুরে শিল্পীসাহিত্যিকদের জন্যেই সত্যি, যে এক, এই প্রগতিশীল অংশটি মূলত উচ্চ/মধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকে আসেন এবং দুই, এঁরা ‘প্রতিবাদ’-এর পথ হিসেবে বাম উদারপন্থা ঘেঁষা অবস্থান নিয়ে থাকেন।

• ভারতে কনটেম্পোরারি নাচের বাজার

তবে কিনা আজকের বাজারে শহুরে কনটেম্পোরারি নৃত্যশিল্পীদের অর্থাভাবের চাইতেও যে সামাজিক সমস্যার সবচাইতে বেশি মোকাবিলা করতে হয়, তা হল সমাজে – এমনকি যাঁরা শিল্প-সংস্কৃতি-শিক্ষাচর্চা করেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও – এজাতীয় নাচ নিয়ে কেউই বড় একটা উৎসাহী নন। নৃত্যশিল্পী বা নাট্যশিল্পীদের মধ্যে এর খানিকটা প্রয়োগ বা চর্চা থাকলেও একে আলাদা ভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটা ডিসকোর্স হিসেবে গুরুত্ব কম জায়গাতেই দেওয়া হয়।

ভারতে ফর্ম হিসেবে বিশুদ্ধ কনটেম্পোরারি নাচ কোনোদিনই বাজারকে তেমন ধরতে পারেনি। ফলে সাংস্কৃতিক শিল্প বা কালচারাল ইন্ডাস্ট্রির অর্থনীতির আওতায় এটি একটি আলোচনা করার মত বিষয়ই হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। সরকারের স্যালারি গ্রান্টটির দিকে তাকিয়ে দেখা যাক। আজ একটি বড় মাপের ভারতীয় নাচের দলের প্রাপ্তবয়স্ক পেশাদার সদস্যের জন্য সরকার থেকে ধার্য করা মাসিক টাকার অঙ্ক ৬০০০-এর কাছাকাছি মাত্র; এই অঙ্কটি গত কুড়ি বছরে খুব অল্পই বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং এখনও তা জীবনধারণের জন্য যথেষ্ট নয় (এটা অবশ্য শুধু কনটেম্পোরারি নৃত্যশিল্পীরা নন, সব নৃত্যশিল্পীর জন্যেই সত্যি)। পাশ্চাত্যে – মূলত ইউরোপে – কনটেম্পোরারি নৃত্যশিল্পীরা সরকার থেকে নানা অনুদান, ছাড় ইত্যাদি পেয়ে থাকেন। তার মানে অবশ্য এই নয়, যে সেগুলি সরকারের স্বার্থহীন বদান্যতার উদাহরণ, কিন্তু সে এক অন্য আলোচনা। এদিকে ভারতে কনটেম্পোরারি নাচ বলে যে একটা বস্তু রয়েছে – সেটা সরকারের সাংস্কৃতিক বিভাগ আদৌ জানে বলেই বিশ্বাস করা কঠিন। সরকারি স্তরে কনটেম্পোরারি নাচের পরিচিতি যেটুকুও বা হয়েছে, তা-ও মাত্র গত কয়েক বছরে। তাতে মার্গীয় নাচের থেকে আলাদা করে এর চর্চার প্রয়োজনকে সরকারি সংস্কৃতি বিভাগ থেকে কোনো গুরুত্বই দেওয়া হয়নি।

সাধারণ ভাবেও বিশ্ব-অর্থনীতিতে ‘নাচ’ – যার ‘সারপ্লাস ভ্যালু’ বস্তুটা কি, তা একেবারেই পরিষ্কার নয় – তার খুব একটা অর্থনৈতিক কল্কে পাওয়ার কথা নয়। তাও আবার কনটেম্পোরারি নাচ, যা মার্গীয় নাচের সাথে তুলনায় শুরুর থেকেই হেরে বসে আছে। প্রথমত, এই নাচের একটা বড় অংশ শিল্পের অ্যাবস্ট্রাক্ট অ-গল্পীয় দিক নিয়ে কাজ করতে উৎসাহী, যা একে বিনোদনের (অতএব টাকাপয়সা রোজগারের) পরিপন্থী করে তোলে। বিশেষত ভারতে মার্গীয় ফর্মগুলি নাচ জিনিসটাকে দর্শকদের মূলস্রোতের কাছে এমন ভাবে কথকতার সমতুল্য করে তুলেছে, এবং এমন এক ধরনের সহজে চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্যবোধে অভ্যস্ত করে তুলেছে, যে কাঠখোট্টা ফর্মচর্চায় তাঁদের মন ভরতে চায় না। দ্বিতীয়ত, দেশী-বিদেশী নানা সংমিশ্রণে তৈরি হওয়ার ফলে এবং শহুরে উদারপন্থী মনোবৃত্তির ফলে (অ-গল্পীয় হওয়ার ফলেও) কনটেম্পোরারি নাচে ভারতীয় মার্গীয় নাচের তুলনায় জাত-বর্ণ-লিঙ্গভেদের সরাসরি ভূমিকা কম। সাথে-সাথে, জামাকাপড়-নড়াচড়া সবদিক থেকেই এই নাচে, সেন্সর বোর্ডে যাকে ভারতীয় মূল্যবোধ বলে, তার প্রভাব কম। সেই অর্থে গোদা করে বলা যায়, এর ভেতর এক ধরনের স্বাভাবিক, আধুনিক প্রগতিশীলতা ঢুকে বসে আছে। তাই এই নাচ স্বভাবতই সামাজিক-রাজনৈতিক প্রশ্ন তুলতে উৎসাহী, ট্র্যাডিশন-এর মার্গীয় অচলায়তনকে প্রশ্ন করতে উৎসাহী। এই কারণেও কনটেম্পোরারি নাচ অনেক মার্গীয় নাচের শিল্পী ও দর্শকের চক্ষুশূল। তৃতীয়ত এর বিমূর্ত সর্বজনীন রূপটির কারণে রাষ্ট্র একে মার্গীয় নৃত্য ও লোকনৃত্যর মত ব্যাপক ও সহজ ভাবে জাতীয়তাবাদী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারে না।

মূলত এইসব কারণে কনটেম্পোরারি নাচ যে অর্থনৈতিক দিক থেকে সবচাইতে বিচ্ছিরি একটা সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, তাতে খুব অবাক হওয়ার কিছু নেই। গ্রান্ট-এর ভাঁড়ার শুকিয়ে যাচ্ছে, কনটেম্পোরারি ডান্স ফেস্টিভাল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একটার পর একটা। যারা টিকে থাকছে, তারাও মূলত বিদেশি সাংস্কৃতিক পুঁজির মুখাপেক্ষায় কালচারাল এম্ব্যাসিগুলির আশেপাশে ঘুরঘুর করতে বাধ্য হচ্ছে। একটি সমসাময়িক নাচের স্বতন্ত্র অ্যাকাডেমি প্রায় আকাশকুসুম। সাধারণ ভাবে অর্থাভাব এবং এই নাচে উৎসাহী শিল্পী-দর্শকের অভাব ছাড়াও সরকারি ও বেসরকারি আমলাতন্ত্রের হাজার এক নিয়মকানুনের ফাঁসও এর জন্য দায়ী। গবেষণাধর্মী সমসাময়িক নাচ ভারতের অল্প কিছু প্রতিষ্ঠানে বা ব্যক্তিগত চর্চায় – একদমই শহরকেন্দ্রিক হয়ে – বেশিরভাগ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে অ-জানি দেশের না-জানি কি হয়ে থেকে যাচ্ছে। বেশিরভাগ সমসাময়িক নৃত্যশিল্পী দেশীয় ফেস্টিভালে কাজ দেখিয়ে এবং এখানে-ওখানে ছোটবড় ওয়র্কশপ করিয়েই জীবনধারণ করেন – বিশেষত যাঁরা এখনও বিদেশের বাজার ধরতে পারেননি, বা বিদেশে কাজ নিয়ে যাওয়ার পক্ষে অভিজ্ঞতা বা পরিচিতির দিক দিয়ে যাঁরা এখনও কাঁচা। দেশীয় ক্ষেত্রগুলি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে তাঁদের আর্থিক অবস্থাও যেমন খারাপ হচ্ছে, তেমন নতুন কাজ তৈরির উৎসাহেও ভাঁটা পড়ছে – বিশেষত বড় আকারের কাজ, যেখানে আরও কিছু নাচিয়ে কাজ পেতে পারেন, আদানপ্রদানের ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।

• তবে কনটেম্পোরারি নাচ কেন? কেন নাচ নিয়ে লেখা?

নাচ আদৌ কেন, এ নিয়ে এই লেখায় আমরা আলোচনা করব না। নাচ জিনিসটাকে স্বতঃসিদ্ধ বলেই ধরে নেব। তবে প্রশ্ন করা যেতে পারে, কনটেম্পোরারি নাচ নিয়ে লিখে, ভাবনাচিন্তা করে তাহলে লাভ কি? তাতে সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়ের উপস্থিতি বিশ্লেষণ করেই বা কি হবে? আর তার চেয়েও বড় কথা, এই নাচ প্রাকটিস করেই বা কি হবে? তবে কি ক্রমশ কনটেম্পোরারি ফর্মে কাজ করা শিল্পীর সংখ্যা কমে আসবে – এটাই ধরে নেওয়া উচিত?

একটু আগেই উল্লেখ করেছি, শহরকেন্দ্রিক ভারতীয় নাচে মূলত উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী-বর্ণই ভাগ নিয়ে থাকেন, যাঁদের সংখ্যা গোটা সমাজের জনসংখ্যার নিরিখে তুচ্ছ। এর প্রধান কারণ এই যে, তাঁদের শ্রেণী অবস্থান তাঁদের এই মাগ্যিগণ্ডার বাজারে একটি সামাজিক-অর্থনৈতিক সাপোর্ট সিস্টেম দেয়। এই সাপোর্ট সিস্টেম তাঁরা যথেষ্ট ‘কাজ’ না পেলেও খেতে না পাওয়া বা অন্য কোনো জীবিকা গ্রহণ করতে বাধ্য হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে যায়। মুশকিল হচ্ছে, এই সাপোর্ট সিস্টেমই আবার তাঁদের শ্রেণী-বর্ণ অবস্থানকে অতিক্রম করে সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়ের সমালোচনামূলক চর্চার সম্ভাবনার পরিপন্থী হয়েও দাঁড়ায় – বিশেষত যে সমালোচনার ভিতরে তাঁদের নিজেদের জীবনকে খতিয়ে দেখতে হবার সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। ফলে তাঁদের নাচের বিষয়গুলি সামাজিক-রাজনৈতিক ভাবে সচেতন এবং কিছুমাত্রায় প্রগতিশীল হলেও উচ্চ/মধ্যবিত্ত শ্রেণী-বর্ণবৈশিষ্ট্যের বাইরে বেরোতে পারে না। যেমন, এই শ্রেণী-বর্ণবৈশিষ্ট্য অনুযায়ী তাঁদের ভিতর ব্যক্তিস্বার্থের দর্শন এক গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নিয়ে থাকে। অতএব তাঁদের কর্মপদ্ধতিতেও ব্যক্তি বা আত্মই মূল প্রাধান্য পেতে থাকে। তাই তাঁদের মধ্যে যৌথ প্রকল্প নেওয়ার ইচ্ছের অভাব বা সর্বশ্রেণীর ‘সাধারণ’ দর্শকের সাথে সম্পর্ক নির্মাণের চেষ্টার অভাব দেখা যায়। এইসব নানা কারণে সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক জীব হিসেবে যে আমাদের, অর্থাৎ কনটেম্পোরারি নৃত্যশিল্পীদের, ঘাড়ে চেপে বসছে যে একাকীত্ব, তার মিলিত চাপ কি আমাদের পক্ষে খুব সুবিধাজনক বা স্বাস্থ্যকর? মনে তো হয় না। বিশেষ করে আজ যখন টিকে থাকতে গেলে, এই ব্রাত্য অবস্থানের ভার ঘাড়ে নিয়ে, স্বীকৃতি এবং অর্থ – দুয়েরই অভাবে হাঁকপাঁক করতে করতে, হয়তো বা আমাদের রাজনৈতিক বোধের বিপরীতে গিয়েই, মুষ্টিমেয় ক’টি সরকারি বা বেসরকারি অর্থদাতা প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হয়ে হাত কচলানো ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায়ই থাকছে না।

নাকি এই অবস্থার মধ্যে থেকেই এক বিকল্প ব্যবস্থা উঠে আসবে? যাকে সম্মিলিত ভাবে সৃষ্টি করবেন শুধু বিশেষ শ্রেণী অবস্থানে থাকা কনটেম্পোরারি শিল্পীরা নন, সর্বশ্রেণীর সমসাময়িক মানুষ। দর্শক হিসেবে, আবার স্রষ্টা হিসেবেও। ব্যক্তি হিসেবে, আবার সংগঠন হিসেবেও। জোডি ডীন এই সম্ভাবনাকে তাঁর ‘ফোর থিসিস অন দা কমরেড’-এ এইভাবে দেখেছেন –“মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি ও উঁচুনীচুর চাপিয়ে দেওয়া ধারণা, এবং এইভাবে মানুষকে আরও একা করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র, যাতে তার উপর সহজেই আরও বেশি অত্যাচার করা যায় – এইসবের বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিক্রিয়া।”১ এই প্রতিক্রিয়া থেকেই একমাত্র এমন ক্ষেত্র উঠে আসতে পারে, যেখানে মানুষ একটি সহযোগিতাপূর্ণ পরিসরে নানা সমস্যা নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করতে পারবে, পরস্পরের সাথে রাজনৈতিক ভাবে সচেতন বন্ধুত্ব-ভালোবাসা গড়ে তুলতে পারবে, সমস্যাগুলিকে যুঝে নেওয়ার উদ্দেশ্যে অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করে নিতে পারবে।
নাচের ক্ষেত্রে এর অর্থ হতে পারে, প্রথমত সমসাময়িক নৃত্যশিল্পীদের এক জায়গায় আসা, হয়তো তাঁদের শ্রেণী অবস্থানের বিপরীতে গিয়ে একটি যৌথ কর্মপদ্ধতি গড়ে তোলা, পরস্পরকে নির্মাণে ও প্রদর্শনে সাহায্য করা, এবং ক্রমশ এই যূথে অন্যান্য ধারার শিল্পের মানুষদেরও নিয়ে আসা, এমনকি তথাকথিত অ-শিল্পী কিন্তু সমমনস্ক মানুষের জন্যেও এই যৌথ চর্চার দরজা খুলে দেওয়া, বা এজাতীয় অপরাপর যৌথ চর্চার খোলা দরজা দিয়ে ঢুকে যাওয়া। এইভাবে এই যূথ কখনও হয়তো এত বড় একটি আকার ধারণ করতে পারবে, যে সমসাময়িক রাজনীতিতে তার চর্চিত শিল্প আর ব্রাত্য হয়ে থাকবে না, বরং আষ্টেপৃষ্ঠে মিশে যাবে। হয়তো নাচ নিয়ে লেখা, ভাবনাচিন্তা করা, এতে সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়ের উপস্থিতি নিয়ে কথা বলার প্রয়োজনটা এখানেই। লেখালেখি, কথোপকথন এবং আদানপ্রদান ছাড়া এই বিকল্প পরিসর, বিকল্প পরিবেশনা মাধ্যম বা যূথের উদ্ভব – এর কোনোটাকেই ভারতীয় নৃত্যের ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে বুঝব কীভাবে?

সমাজে নাচের ক্ষেত্রে এইরকম ইউটোপিয়ান যূথ বা গোষ্ঠীর সত্যি কোনো প্রয়োজন রয়েছে কি না, তা আমার জানা নেই। কিন্তু এই প্রশ্ন, এবং এইরকম আরও নানা প্রশ্ন, যার কিছু এই লেখায় উঠে আসতে পারে, কিছু না-ও আসতে পারে – তারাই আসলে আমার কাছে ‘নাচ’ – এই ‘ভাল লাগা’টির সংজ্ঞা নির্মাণ করে। তাছাড়া নাচ প্রসঙ্গে উঠে আসা এইসব প্রশ্ন যে শুধু নাচের পরিসরেই সীমিত, তা তো নয়। আমার বিশ্বাস, এগুলি নানা বৃহত্তর প্রশ্নের সাথে সম্পর্কিত, যা হয়তো আমাদের মধ্যে অনেকেরই প্রতিদিনকার বেঁচে থাকাকে নানাভাবে তাড়িত করে থাকে।

(২) কনটেম্পোরারি নাচ কে করে? কার জন্য?

• কনটেম্পোরারি নৃত্যকার বনাম দর্শক : শাঁখের করাত

কনটেম্পোরারি নাচের একধরনের ‘নাক উঁচু’ ভাব আছে – নাচব, কিন্তু বুঝতে দেব না কি বলতে চাইছি। এটা ওই অ-গল্পীয় গবেষণাধর্মী নাচের বৈশিষ্ট্য, যা কিনা মূলত শারীরিক গতির টেকনিক বা ব্যবহারিক তত্ত্ব নিয়েই আগ্রহী। তবে এরকম একবগ্গা আগ্রহের, অর্থাৎ কনটেম্পোরারি নাচে বিমূর্ত অকাহিনিধর্মিতা নিয়ে বাড়াবাড়ির পিছনে একটা ইতিহাস রয়েছে। তার সাথে আবার আধুনিক নাচের প্রগতিশীলতার ইতিহাসও মিশে রয়েছে। এখানে তার অংশবিশেষ – ভারতীয় নাচের প্রেক্ষাপটে – সংক্ষেপে বলার চেষ্টা করছি।

ঔপনিবেশিকতা-পরবর্তী সময়ে ভারতে শহরকেন্দ্রিক সমসাময়িক নাচের যে চর্চা, যাতে শহরের তথাকথিত ‘ভাল বাড়ি’র মেয়েরা এগিয়ে আসতে শুরু করেন, তার শুরু খানিকটা শান্তিনিকেতনে, খানিকটা আইপিটিএ-তে। এছাড়াও এই দুই সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সাথে নানাভাবে যুক্ত নানান মানুষ ক্রমশ স্বাধীন ভাবেও আধুনিক নাচের চর্চা করতে থাকেন, যা নিজগুণে বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক মুভমেন্টের ভিতর মিশে যেতে থাকে। তাঁদের গবেষণার ভিতর দিয়ে ভারতীয় মার্গীয় নাচ ও লোকনৃত্যের ব্যাকরণের সাথে অন্যান্য শারীরিক অভ্যাসের ব্যাকরণ মিশে যেতে থাকে। পরবর্তী কালে শহরকেন্দ্রিক নাচে সমসাময়িকতার ছোঁয়া আনেন যে ভারতীয় নৃত্যকারেরা, যেমন উদয়শঙ্কর, মৃণালিনী সারাভাই, শান্তি বর্ধন, গুল বর্ধন, নরেন্দ্র শর্মা, মঞ্জুশ্রী চাকী সরকার, চন্দ্রলেখা প্রমুখ – দেখা যায়, প্রায় প্রত্যেকেই এই দুটি কেন্দ্রের দ্বারা কোনো না কোনো ভাবে প্রভাবিত হয়েছেন। যেমন উদয়শঙ্করের নাচের একদম প্রথম দিককার গুণগ্রাহী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ, যিনি তাঁকে তাঁর যাত্রার শুরুর দিকে শান্তিনিকেতনে নাচ পরিবেশন করতে আমন্ত্রণ করেন ও আরও নানাভাবে সাহায্য করেন; সারাভাই শান্তিনিকেতনে পড়াশুনো করেছেন; শান্তি ও গুল বর্ধন, নরেন্দ্র শর্মারা সরাসরি আইপিটিএ-র সদস্য ছিলেন; মঞ্জুশ্রী চাকী সরকার ও চন্দ্রলেখা সীনে অনেক পরে এলেও শান্তিনিকেতন, রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রসঙ্গীত (বিশেষত দেবব্রত ভট্টাচার্যের গান ও বন্ধুত্ব) দ্বারা মঞ্জুশ্রী যেমন গভীর ভাবে প্রভাবিত, তেমন চন্দ্রলেখাকে প্রভাবিত করেন আইপিটিএ-র সাথে অতীতে যুক্ত থাকা প্রগতিশীল লেখক-অভিনেতা হারীন্দ্রনাথ।

এখানে যেটা বলার চেষ্টা করছি, তা হল, অন্যান্য ভারতীয় শিল্পমাধ্যমের মত নাচ নিয়েও এক ধরনের আধুনিক, অচলায়তন ভাঙা চেতনা ব্যক্তি ও সংগঠনের মাধ্যমে বিংশ শতাব্দী জুড়ে একটা আকার পেতে শুরু করে, যার প্রভাব ভারতীয় কনটেম্পোরারি নাচে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর পিছনে ছিল মূলত মার্গীয় নাচগানের গতানুগতিক (হিন্দু)ধর্মীয় কাহিনীনির্ভর বিষয় নির্বাচনের বিরুদ্ধে এই আধুনিক নাচিয়েদের সমালোচনা। আবার ছিল সেইসব কাহিনীর পরতে পরতে মিশে থাকা জাতি ও লিঙ্গবৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁদের উদারপন্থী প্রশ্ন ও প্রতিবাদ। এই মিলিত সমালোচনা-প্রশ্ন-প্রতিবাদ শিল্পীদের বিমূর্ততার ভিতর সামাজিক-রাজনৈতিক চিহ্নের সন্ধানে প্ররোচিত করে। তাঁদের কেউ কেউ এটা উপলব্ধি করেন, যে গতানুগতিকতা ও বৈষম্য শুধু সরাসরি গল্পকাহিনীর মাধ্যমেই বাহিত হয় না, আপাত ভাবে ভাষাহীন শারীরিক গতির ভিতর দিয়েও হয়। শান্তিনিকেতন বা আইপিটিএ – দুই প্রতিষ্ঠানের কোনোটিতেই নিয়ম করে বিমূর্ত নাচ নিয়ে চর্চা না হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন ফর্ম-এর চর্চা ও সংমিশ্রণের উদ্দেশ্যে যে গবেষণামূলক কাজ ও সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়চর্চা হতে থাকে, তার ভিতরে নিহিত ছিল বর্তমান কনটেম্পোরারি নাচের অকাহিনিধর্মী বিমূর্ততার বীজ।

এছাড়াও নানা বিদেশী সংস্কৃতির সাথে ভারতের ক্রমবর্ধমান সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক আদানপ্রদানের কারণে অনেক নৃত্যকার বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিক থেকেই বিদেশে কাজ করতে যাওয়ার সুযোগ পান, সেখানকার নাচ নিয়ে নতুন ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষাগুলিকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান। তাতে তাঁদের কাছে যেমন নাচ নিয়ে নতুন ভাবনার কিছু দিক খুলে যায়, তেমনি একইসাথে নাচের শ্লীলতা-অশ্লীলতা বিষয়ে একধরনের বৈদেশিক নীতিবোধ বা ‘ভদ্রলোকত্ব’ও আরোপিত হয়। এসময় ভারতে স্বাধীনতা আন্দোলনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক স্তরে শ্রেণী-জাতি-লিঙ্গ নিয়ে নানা সমানাধিকার সংক্রান্ত আন্দোলন চলছিল, যা সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পরিবর্তন ও গঠনমূলক সমালোচনার দিক খুলে দিচ্ছিল। এর মধ্যে বিশেষ করে পাশ্চাত্যের নারীবাদী আন্দোলন স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে যাওয়া ভারতীয় নারীপুরুষদের চিন্তাভাবনার উদারীকরণকে ত্বরাণ্বিত করে। ফলে, বিশেষত নাচের ক্ষেত্রে, আধুনিক নাচিয়েদের একাংশ গতানুগতিক মার্গীয় নাচ ও অন্যান্য জনপ্রিয় ‘কমার্শিয়াল নাচ’-এর বিনোদনমুখিতা নিয়ে প্রতিবাদের প্রয়োজন বোধ করতে থাকেন। এই বিনোদনমুখিতা তাঁদের কাছে ক্রমশ গবেষণাবিরোধী, ‘সহজ’, ‘শস্তা’ এবং লিঙ্গবৈষম্যমূলক বলে প্রতিভাত হতে থাকে। আগে শহরকেন্দ্রিক নাচের ক্ষেত্রে গল্প বলার ছলে শরীরকে – বিশেষত নারীশরীরকে – একটি বিনোদনী বস্তু হিসেবে দেখার যে পুরনো ধরন ছিল (কমার্শিয়াল নাচেও যেমন, বিরহিণী নায়িকাপ্রধান মার্গীয় নাচেও তেমন), তাকে সমসাময়িক নৃত্যশিল্পী ও চিন্তকরা প্রশ্ন করতে শুরু করেন। তার বিপরীতে শরীরকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখা, তার ক্ষমতার পরিসীমা চর্চা করার পদ্ধতি নিয়ে বৈজ্ঞানিক ভাবনাচিন্তা – এগুলি আধুনিক নাচের ক্ষেত্রে গুরুত্ব পেতে থাকে। এইভাবেও নাচের গল্প বলার দিকটি খর্ব হয়, বিনোদন মূল্য কমে যায়, কাহিনীমূলক অনুভূতি হয়ে ওঠে গৌণ, শরীরের বিমূর্ত গতির ব্যবহারিক তত্ত্ব হয়ে ওঠে মুখ্য। ভারতীয় কনটেম্পোরারি নাচের একটি ধারা তো – বিশেষত বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এসে – খুব সচেতন ভাবে, প্রায় সক্রোধে, কাহিনী বস্তুটাকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করতে শুরু করে। যেকোনো নাচেই শরীরের গতির ব্যবহারিক তত্ত্বের গুণগ্রাহিতা ছিল, আছে ও থাকবে। কিন্তু আধুনিক নাচে ক্রমশ এই তত্ত্বই সর্বোচ্চ স্তরে জায়গা নিতে থাকে। এই পুরো পরিবর্তনের সারসংক্ষেপ করতে গেলে বলতে হয়, শিল্পীরা দর্শকদের মূল স্রোতের কথকতা ও বিনোদনের চাহিদাকে সমালোচনা করেন এবং তার বিপরীতে একটি (বিমূর্ত গবেষণামূলক) গিয়ে দাঁড়ান – এই হল শাঁখের করাতের একটা দিক।
উল্টোদিকে আবার এই অবস্থান নেওয়ার ভিতর দিয়ে এই শিল্পীরা দর্শকদের একটা বড় অংশকে দূরে ঠেলে দিতে থাকেন। এই শিক্ষিত ও আধুনিক শিল্পীদের মূল যোগাযোগের সূত্র হয়ে ওঠেন অন্যান্য সমমনস্ক শিল্পী ও শিল্পচিন্তকরাই, যাঁরা ইংরিজিতে শিক্ষিত ছিলেন এবং এক বিশেষ শিক্ষিত (উচ্চ/মধ্যবিত্ত) বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর অন্তর্গত ছিলেন। ক্রমশ দেখা যেতে থাকে, যেসব স্পন্সর বা পেট্রনরা এই জাতীয় নাচকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসছেন, তাঁরাও আসছেন ওই একই শ্রেণী থেকে। ফলে কনটেম্পোরারি নাচ একটা সীমিত পরিসরে আটকা পড়ে যেতে থাকে। এই ধারার নৃত্যশিল্পীরাও জনগণের ভাল লাগা-পছন্দ-জানাবোঝা থেকে দূরে সরে যেতে থাকেন – একটা বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। উপরে আমরা যে আধুনিক (পাশ্চাত্য) শিক্ষা দ্বারা আরোপিত ভদ্রলোকত্বের কথা বললাম, তার কথা ধরা যাক। এই ভদ্রলোকত্ব নাচে বিনোদনের শ্লীলতাবোধের ধারণাকে বদলে ফেলতে থাকে। কিন্তু ক্রমে এতে নৃত্যশিল্পী ও চিন্তকদের উচ্চশ্রেণী-বর্ণীয় নৈতিকতাও মিশে যেতে থাকে। এই নৈতিকতা ‘নাচের মাধ্যমে বিনোদন’ বস্তুটিকে বুদ্ধিজীবী ভদ্রলোকত্বের, অতএব আধুনিক/কনটেম্পোরারি নাচের শত্রু বলে খাড়া করে। কনটেম্পোরারি শিল্পীরাও নিজের শ্রেণী-বর্ণের বাইরে অবস্থিত অ-বুদ্ধিজীবী দর্শকের আক্ষরিক অর্থে দৃষ্টিকেও যেমন, দর্শন ও সৌন্দর্যবোধকেও তেমন, সন্দেহের চোখে দেখতে থাকেন (এ নিয়ে আমরা এই লেখার শেষের দিকে আবার আলোচনা করব)। ‘সাধারণ দর্শক’ প্রায়শই এধরনের পরিসরে স্বাগত বোধ করেন না, বিচ্ছিন্নতা আরও বাড়তে থাকে।

যাই হোক, আধুনিক নৃত্যশিল্প তো বিনোদন জগতকে ঠোনা মেরে বুদ্ধিজীবী জগতে সরতে থাকল। কিন্তু থিয়েটার, সঙ্গীত বা সাহিত্যের মত এটি বুদ্ধিজীবী সমাজে সর্বজনগ্রাহ্য শিল্পমাধ্যম হিসেবে আদৃত হল না। তার নানা কারণ – যেমন নাচের আপাত শরীরপ্রাধান্য, নৈতিক ও অন্যান্য কারণে এর সীমিত চর্চা, এর ‘কলঙ্কিত’ বিনোদনমূলক ইতিহাস ইত্যাদি। ফলে নাচ একটা ত্রিশঙ্কু অবস্থায় গিয়ে পড়ল।

একভাবে দেখলে কনটেম্পোরারি নৃত্যশিল্পীরা এই কোণঠাসা অবস্থান স্বেচ্ছায়ই বেছে নিয়েছেন। গণনাট্য, তৃতীয় থিয়েটার প্রভৃতির মাধ্যমে থিয়েটার পারফর্মেন্সে যে দর্শকের কাছে শিল্পকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা (উল্টোটা নয়), নাচে ‘পেশাদারি’ নৃত্যকারদের ভিতর সেই নিয়ে আলাদা ভাবে তেমন নিষ্ঠার সাথে, বা তত্ত্বগত-আদর্শগত দিকে থেকে খুব সামঞ্জস্যপূর্ণ চর্চা হয়নি; একটা ‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাব’ গোছের ভাব থেকে গেছে। আজকের যুগে এসে এর সাথে যোগ দিয়েছে বর্তমান নয়াউদারনৈতিক সমাজের সদস্য এই শিল্পীদের শ্রেণী-বর্ণবৈশিষ্ট্যের গভীরে ঢুকে থাকা নানা অন্তর্দ্বন্দ্ব। কেমন দ্বন্দ্ব? যেমন, ব্যক্তি বড় না গোষ্ঠী? ব্যক্তির সৃষ্টিশীলতা-অর্থাগম-খ্যাতিই মূল নাকি বৃহত্তর সমাজের প্রেক্ষিতে সেই সৃষ্টির গুরুত্ব? যদি গোষ্ঠী বড় হয়, তবে কাদের নিয়ে সেই গোষ্ঠী? বৃহত্তর সমাজ যদি বড় হয়, তবে সমাজের কোন অংশকে ধরা হচ্ছে? আবার একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরে একবার কাজের সূত্রে গিয়ে পড়লে তখন সেখানে নিজের কাজের, নিজের স্বার্থের – এক কথায় নিজের ব্যাপারে কতখানি আপোষ করা যেতে পারে, এ-ও সেই অন্তর্দ্বন্দ্বের মধ্যে রয়েছে। এসব দ্বন্দ্বের সমাধান আমাদের ব্যক্তিশিল্পীদের অনেকের পক্ষেই আমাদের শ্রেণী-বর্ণপরিচয়ের বাইরে গিয়ে, ব্যক্তিসত্ত্বার বাইরে গিয়ে করা সম্ভব হয় না। করা কঠিনও, কারণ এই শ্রেণীপরিচয়ের সাপোর্টই যে ছিল আমাদের শিল্পীসত্ত্বায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে উঠতে পারার পিছনে সবচাইতে বড় কারণ। অতএব শাঁখের করাতের আরেকটি দিক – শিল্পী যেখানে দর্শককে হারাচ্ছেন, বা বলা যায়, সাধারণ দর্শক এবার শিল্পীর সমালোচনা করছেন এবং তাঁর বিপরীত অবস্থানে গিয়ে দাঁড়াচ্ছেন। বিচ্ছিন্নতা সম্পূর্ণ হচ্ছে।

• কনটেম্পোরারি নৃত্যকার বনাম সামাজিক-রাজনৈতিক ‘অ্যাক্টিভিজম’

শাঁখের করাতের উপরোক্ত দুটি দিক বিচার করলে দেখা যাচ্ছে যে, আমরা যদি এ দেশে শহরকেন্দ্রিক কনটেম্পোরারি নাচের ‘জন-অপ্রিয়তা’র পিছনে কারণ হিসেবে শুধু ক্রমউদীয়মান দক্ষিণপন্থা ও স্বাধীন শিল্পীসত্ত্বাকে কলার পরানোর তার যে স্বাভাবিক প্রবণতা, তাকে দায়ী করি, সেটা নিজের মনকে চোখ ঠারা হবে। আমাদের স্বীকার করতেই হবে, যে ভারতীয় দর্শকের ভিতর যে ‘আঁতেল নাচ’ দেখার ও তাকে বোঝার বিষয়ে একটা ইচ্ছের অভাব, যাকে আমরা কনটেম্পোরারি নাচিয়েরা ধরতে পারছি না, হয়তো যথেষ্ট চেষ্টাও করছি না, সেটাই হয়তো আমাদের মূল প্রতিপক্ষ – একজন শিল্পীর জন্য যা হয়তো নিয়মনিষেধ-বয়কট-অ্যারেস্ট-এর চাইতেও শক্ত ঠাঁই।

অর্থাৎ দেখা গেল, যে নৃত্যকার যদি বা সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে নাচ তৈরি করেনও, তাহলেও, তাঁর কাজের সাথে সমাজের যে অংশের সরাসরি রাজনৈতিক যোগ, না তিনি সেই অংশের কাছে পৌঁছতে পারছেন, না সেই অংশ তাঁর কাছে পৌঁছতে চাইছে/পারছে। এর মধ্যস্থতা ঘটতে পারে, যদি শিল্পী কোনো সামাজিক/রাজনৈতিক কর্মীদলের সাথে মিলে তাঁর কাজটি করেন।

এখানে আরেকটা সমস্যা এসে পড়ে। একজন প্রগতিশীল কনটেম্পোরারি নৃত্যকার সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে যে পথে কাজ করতে চান, তার সাথে তাঁর সমমনস্ক সামাজিক-রাজনৈতিক কর্মীদের কাজের ধ্যানধারণা না-ও মিলতে পারে। তখন তিনি কি করবেন? তিনি তো নাচ তৈরি করে ফেললেন। এবারে সামাজিক/রাজনৈতিক কর্মীরা, যাঁরা ওই বিষয়েই সম্পৃক্ত আছেন, তাঁরা এই নাচটিকে কীভাবে দেখবেন? তাঁদের কর্মক্রিয়ায় এই নাচের ভূমিকা কি হবে? আদৌ তার কোনো গুরুত্ব থাকবে নাকি থাকা-না-থাকা সমান হবে? এই প্রশ্ন রয়ে যায়। তবু বহু সমাজ-সচেতন (নৃত্য)শিল্পী নানা এনজিও ও সামাজিক সংগঠনের সাথে কাজ করতে চেষ্টা করেন। সে নিয়ে আলোচনা দীর্ঘ এবং একটি আলাদা লেখাই হয়তো দাবি করে।

আসলে সামাজিক-রাজনৈতিক আদর্শের সাথে একমত হয়েও, কাজের ধরনে খাপ খাওয়াতে না পারা, বা নিজের কাজের ভূমিকা বুঝে উঠতে না পারা – এগুলো শুনতে তুচ্ছ হলেও সমস্যা হিসেবে তুচ্ছ নয়। সত্যিই সামাজিক/রাজনৈতিক ক্ষেত্রে শিল্পীর কাজের মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হবে, যাতে তাঁর শিল্পীসত্ত্বা এবং রাজনৈতিক সত্ত্বার মধ্যে অন্তত একটা কাজ চালাবার মত মেলবন্ধন ঘটতে পারে? এখানে একদিকে যেমন নৃত্যকারের শ্রেণী-বৈশিষ্ট্যজনিত ব্যক্তিস্বার্থের কথা ঘুরেফিরে আসছে, তেমনি আবার তাঁর বাক-স্বাধীনতার বা সামাজিক-রাজনৈতিক কর্মীদের নীতিবোধ-শিল্পবোধের প্রশ্নও এসে পড়ছে। অর্থাৎ সৃষ্টির বিষয় ও ফর্ম বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে স্রষ্টার কতটা স্বাধীনতা বা এজেন্সি রয়েছে, সেই প্রশ্ন ঘুরেফিরে এসে পড়ছে। আমরা দক্ষিণপন্থী ফ্যাসিবাদেই বিচরণ করি বা বামপন্থী উদারবাদে, এই প্রশ্নের হাত থেকে শিল্পীর মুক্তি ঘটছে না।

অথচ একটা সমমনস্ক রাজনৈতিক পরিসরে তাঁর কাজকে ঘিরে শিল্পী যদি একটা আদানপ্রদান আর গঠনমূলক সমালোচনার জায়গায় পৌঁছতেই না পারেন, তাঁর সামাজিক-রাজনৈতিক ভাবে সচেতন কাজ যদি সেই একই বুদ্ধিজীবী উচ্চ/মধ্যবিত্ত (এবং এক অর্থে অরাজনৈতিক) দর্শকদের ভিতরেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়, তখন মনে হয় তিনি বুঝি ঐ সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়টিকে ‘ব্যবহার’ করছেন, অর্থাৎ প্রগতিশীলতার তকমা হাতিয়ে নিচ্ছেন, কিন্তু বিষয়টির প্রতি সৎ থাকছেন না। এই দোষারোপ ন্যায্য হতেই পারে – উপরের আলোচনায় তা মোটামুটি স্পষ্ট। আবার প্রত্যেক (নৃত্য)শিল্পীকেই রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে কাজকে ‘অ্যাক্টিভিজম’-এর পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে, তা-ও নয়। কিন্তু সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়কে ছেলেখেলা বা ব্যক্তিগত কৌতূহলের জায়গামাত্র হিসেবে না দেখে তাকে নিয়ে সৎ ভাবে কাজ করতে গেলে তো সত্যিই সেই সমাজ বা রাজনীতির তরফ থেকে একটা ফিডব্যাকের প্রয়োজন রয়েই যায়। আবার সে ফিডব্যাক ফিল্টার না হয়ে ওঠে সেদিকেও নজর রাখা চাই। তা নয়তো প্রগতিশীল বিষয় নিয়ে নাচ কে করে, আর কার জন্য করে, এই প্রশ্নের ঠিক উত্তর পাওয়া যাবে না।

ব্যক্তি এবং সমাজের দ্বন্দ্বে না ঢুকলে, নৃত্যশিল্পী নিজের শ্রেণী-জাতি-লিঙ্গ-ক্ষমতা-স্বাচ্ছন্দ্য-ভয়-ঘৃণা ইত্যাদিকে তাঁর কাজের পদ্ধতিতে কোনো না কোনো ভাবে ধরতে ও সমালোচনা করতে না পারলে সামাজিক-রাজনৈতিক ভাবে সচেতন নাচ শুধুমাত্র রোল-প্লে করার খেলা হিসেবেই রয়ে যেতে পারে – এই ভয় থেকে যায়। এ নিয়ে আমরা এবার বাকি লেখা জুড়ে উদাহরণ সমেত আলোচনা রাখব। সব প্রশ্নের উত্তর না বেরোলেও উদাহরণগুলির সাহায্যে গোটা গোলমালটা আরেকটু পরিষ্কার হবে আশা করা যায়। মূল উদাহরণ থাকবে তিনটি।

(৩) মূল তিনটি উদাহরণ

• উদাহরণ সম্পর্কিত ভূমিকা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

এই লেখায় আমি কয়েকজন বড় মাপের ভারতীয় আধুনিক নৃত্যকারের প্রগতিশীল সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়নির্ভর কাজ নিয়ে কিছু ভাবনার কথা লিখতে চেয়েছি – যদিও আমার সীমিত জ্ঞানের পরিসরে তাতে হয়তো আধুনিক/কনটেম্পোরারি নাচের ক্ষেত্রে তাঁদের অবদানকে উঁকি মেরে মাত্র দেখা সম্ভব হবে। তাছাড়া আলোচ্য কাজগুলির সাথে আমার পরিচয় ভিডিওর মাধ্যমে। তা-ও নিশ্চয় তাঁদের কাজকে বোঝার ব্যাপারে বাধার সৃষ্টি করবে। কিন্তু নাচের ইতিহাসকে ধরতে গেলে এ ছাড়া আর উপায়ই বা কি?

সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়ের ভিতর থেকে ‘শ্রেণী’, ‘জাতি’ ও ‘লিঙ্গ’ – এই তিনটি বিষয়কে বেছে নিয়ে (লিঙ্গ বলতে এই লেখায় নারীমুক্তি আন্দোলনকে বোঝানো হবে) মূলত আমি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নাচ বা কোরিওগ্রাফিকে ঘিরে আলোচনা করতে চাই – উদয়শঙ্করের ‘লেবার অ্যান্ড মেশিনারি’, মঞ্জুশ্রী চাকী সরকারের ‘তোমারি মাটির কন্যা’ এবং চন্দ্রলেখার ‘শ্রী’। এই কাজগুলি যথাক্রমে উপরোক্ত তিনটি বিষয়কে ছুঁয়ে কোরিওগ্রাফ করা। তবে এই তিনটি কাজ নিয়ে কথা বলার পিছনে আমার ব্যক্তিগত কারণও রয়েছে। এই তিনজন নৃত্যকারের কাজের রেশ যদিও গোটা পৃথিবীর নাচের ক্ষেত্রেই ছড়িয়ে গেছে, তাঁদের কাজের শিকড় ছিল কলকাতা (উদয়শঙ্কর, মঞ্জুশ্রী চাকী সরকার) ও চেন্নাই বা ম্যাড্রাস (চন্দ্রলেখা)। তিনজনই আমার নিজের কনটেম্পোরারি নাচের জগতে আসার অনেক আগেই হয় মারা গেছেন, নয় কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন। কিন্তু কলকাতা ও চেন্নাই – এই দুই শহরে আমার দীর্ঘ সময় থাকার ও নাচের জগতে ঘোরাফেরার প্রেক্ষিতে আমি এই তিনজনের কাজকে,নিজের মত করে, কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। তাঁদের অতীত-বর্তমানকে নিয়ে ভাবতে কিছুটা সময় পেয়েছি, সামান্য হলেও তাঁদের লীগেসিতে হয়তো অংশগ্রহণও করতে পেরেছি। তাই তাঁদের কাজ, সাফল্য-অসাফল্য নিয়ে লেখা, ভাবা ইত্যাদি একভাবে দেখলে আমার নিজের শিক্ষাকেও প্রশ্ন করা, ফিরে দেখা।

আলোচনায় ঢুকবার আগে এই দুই শহরে আধুনিক নাচের সামাজিক-রাজনৈতিক অতীতকে অল্প করে হলেও জেনে নেওয়া প্রয়োজন। আমি এর দীর্ঘ ইতিহাসে ঢোকার চেষ্টা না করে নিজে যেভাবে দেখেছি-বুঝেছি, সেভাবেই সংক্ষেপে বলছি।

প্রেক্ষাপট ১ : কলকাতা (রবীন্দ্রনাথ, আইপিটিএ, উদয়শঙ্কর, মঞ্জুশ্রী চাকী সরকার)

প্রায় বছর দশেক আগে, আমি যখন কলকাতা থেকে কাজের সূত্রে (নাচ সম্পর্কিত নয়) চেন্নাই গিয়ে থাকতে শুরু করি, তখন আমি ধরেই নিয়েছিলাম, যে আমার নাচের লাইনের এখানেই ইতি। কলকাতা শহরে বসবাসকারী উচ্চ/মধ্যবিত্ত অপেশাদারি বাঙালি নারী নৃত্যশিল্পী হিসেবে আমাকে মোটামুটি একটা স্ট্যান্ডার্ড কেস স্টাডি হিসেবে ধরা যেতে পারে, যার কাছে বিয়ে না হলেও একটা ‘ভাল চাকরি’ই (নাচ সম্পর্কিত নয়) সর্বপ্রথম। অথচ আমি একদম ছোটবেলা থেকে নেচে আসছি। আমার নৃত্যশিক্ষায় নানা ফর্মের যে খিচুড়ি, তার মধ্যে কনটেম্পোরারি নাচ প্রসঙ্গে যে দুটি ফর্ম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তারা হল উদয়শঙ্করের ‘ক্রিয়েটিভ ডান্স’ আর মঞ্জুশ্রী চাকী সরকারের ‘নবনৃত্য’।

১৯২০ নাগাদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উচ্চ/মধ্যবিত্ত ‘আলোকপ্রাপ্ত’ পরিবারগুলো থেকে আসা বাঙালি মেয়েদের নাচের, অর্থাৎ শরীরের সৃজনশীল হেলনদোলনে যে আনন্দ – তার স্বাদ দেন বলে জানা যায়। তাঁর এবং তাঁর সহযোগী হিসেবে প্রতিমা দেবী, শান্তিদেব প্রমুখের সৃষ্ট যে নাচ, তা সরাসরি মার্গীয় নৃত্যের নিয়মকানুন মেনে চলত না। নানান লোকনৃত্য, পাশ্চাত্য ব্যালে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ফোক এবং আধুনিক নাচের ফর্ম তার ভিতর ঢুকে গিয়েছিল। নাচের বিষয়ও মার্গীয় নৃত্যের চেয়ে আলাদা ছিল। এর ফলে যে সঙ্কর নৃত্য সেদিন শান্তিনিকেতনে তৈরি হয়, তাকেই পরে রবীন্দ্রনৃত্য নাম দেওয়া হয়। সম্ভবত একে ভারতে শহরকেন্দ্রিক আধুনিক নাচের প্রথম ধাপ বলে চিহ্নিত করা যেতে পারে। পরবর্তীকালে ভারতীয় – বিশেষ করে বাঙালি কোরিওগ্রাফারদের কাজে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব দেখা যায়, যা আজও রয়েছে। উদয়শঙ্কর ও মঞ্জুশ্রী চাকী সরকারের কাজে – নৃত্যরূপ গঠনে ও বিষয়ে (ফর্মে ও কনটেন্টে) রবীন্দ্রনৃত্যের প্রভাব পরিষ্কার। কিন্তু রবীন্দ্রনৃত্যের রাজনৈতিক প্রভাব সম্ভবত আরও গুরুত্বপূর্ণ, যা হয়তো – তার বিষয়ের চাইতেও – ‘নাচ’ নামক ক্রিয়াটির ‘সাধারণীকরণ’ বা এক অর্থে গণতন্ত্রীকরণের মধ্যে রয়ে গেছে। তবে রবীন্দ্রনাথের নাচে – বিশেষত তাঁর নৃত্যনাট্যে যে জটিল রাজনৈতিক নানা বিষয়কে ধরা হয়েছিল, তাতেও কোনো সন্দেহ নেই। সে রাজনৈতিক প্রশ্নগুলিকে পরবর্তী আধুনিক নৃত্যকাররা বারবার তাঁদের নিজের নিজের নৃত্যব্যাখ্যায় ধরেছেন এবং আরও গভীরে নিয়ে গেছেন। মঞ্জুশ্রী চাকী সরকার বেশ কয়েকবার এজাতীয় পরীক্ষানিরীক্ষা করেন। তার মধ্যে ‘তোমারি মাটির কন্যা’ বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য, যা নিয়ে আমরা কথা বলব।

যাই হোক, রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুর আগে তাঁর নৃত্যশিক্ষার ভাবনাটিকে যে পরিস্থিতিতে ছেড়ে যান, তাতে রবীন্দ্রনৃত্য একটি বৈপ্লবিক এবং বিতর্কিত বস্তু হয়ে দাঁড়ায়। একদিকে এটি ছিল বাংলাদেশের শহুরে সমাজ-সংস্কৃতির প্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে তার অন্তর্গত পিতৃতন্ত্রে ভাঙ্গন ধরানো, প্রতিষ্ঠানের অচলায়তনে ভাঙ্গন ধরানো একটি লিঙ্গবিপ্লবী প্রচেষ্টা। আরেকদিকে সেই একই নাচ তাঁর মৃত্যুর পর নিজেই একটি সন্দেহবাতিকগ্রস্ত জড় প্রকৃতির প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়ায়, যা রাবীন্দ্রিক দর্শনের বিপরীতে গিয়ে, তার ভিতরে যে স্বাধীন চেতনার রাজনীতির দেখা মেলে, তাকে অনেকটাই নষ্ট করে দেয়। এমনও শোনা যায়, যে রবীন্দ্রনাথ নিজেও তাঁর মৃত্যুর আগেই তাঁর সৃষ্ট নাচেগানে অবাঞ্ছিত মিশ্রণ দেখা দেবে, সেই দুশ্চিন্তা থেকে এই প্রতিষ্ঠানায়নের কাজ কিছুটা শুরু করেছিলেন। ভেজালের ভয়ে প্রতিষ্ঠানায়নের এই প্রক্রিয়ায় (এবং পরে তার ভিতর অর্থনৈতিক ও ইন্টেলেকচুয়াল কপিরাইটের গল্প) পরে বহু আধুনিক নৃত্য প্রতিষ্ঠানই ভাগ নেয়। আধুনিক নাচের গণতন্ত্রীকরণের পথে এ এক অভিশাপ বলেই তো মনে হয়।

১৯৪০ নাগাদ আরেকটি মুখ্য আধুনিক নাচভিত্তিক আন্দোলন বাংলার নৃত্যশিল্পীদের সমসাময়িকতার সাথে জুড়ে দেয়। তা গড়ে তুলেছিল ইন্ডিয়ান পীপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন (আইপিটিএ) – কম্যুনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া(সিপিআই)-র সাংস্কৃতিক বিভাগ। তবে আইপিটিএ-র সঙ্গীত ও থিয়েটার বিভাগের (যেখানে আবার মূলত প্রতিভাবান পুরুষ শিল্পী-পরিচালকদেরই রমরমা ছিল) সাথে পাল্লা দিয়ে নাচ জিনিসটি এবং নাচিয়েরা (মুখ্যত মেয়েরা) খানিকটা দ্বিতীয় সারিতেই থেকে গিয়েছিলেন। অথচ আইপিটিএ-র নৃত্যশিল্পী রেবা রায়চৌধুরী, সীমা দাস প্রমুখের লেখায় আইপিটিএ-র গোড়ার দিককার কথা পড়লে দেখা যায়, তাঁদের কাজের ভিতর তাঁরা একটা নিগড় ভাঙ্গার আবেশ খুঁজে পেয়েছিলেন। অর্থাৎ একটা স্বাধীনতার চেতনা ও মূল্যবোধ ছিল, যা আইপিটিএ তার মেয়ে নৃত্যশিল্পীদের দিতে পেরেছিল – তার খানিকটা এই মেয়েদের কল্পনায় হলেও। তাছাড়া আইপিটিএ সরাসরি ভাবে রাজনীতির সাথে যুক্ত হওয়ায় এর সমস্ত শিল্পমাধ্যমের বিষয়ের মধ্যেই সমসাময়িক বামপন্থী রাজনৈতিক চেতনা মিশে ছিল।

ইতিমধ্যে, ১৯৩০ নাগাদ, ভারতের সমসাময়িক নাচের ক্ষেত্রে আরেক নৃত্যকার বিশেষ সংবাদ হয়ে ওঠেন। তিনি উদয়শঙ্কর, যিনি সেসময় বাংলায় আধুনিক নৃত্যশিক্ষার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ও আইপিটিএ-র সমান্তরালে একটি তৃতীয় প্রগতিশীল উৎস হয়ে উঠতে পারতেন, কিন্তু পুরোমাত্রায় তা হননি। তাসত্ত্বেও ভারতীয় কনটেম্পোরারি নাচে তাঁর গুরুত্ব অনস্বীকার্য। তাঁকে ভারতের প্রথম আধুনিক নৃত্যকার বলা যেতে পারে। উচ্চবিত্ত বাঙালি পরিবার থেকে আসা ঘটনাচক্রে নাচে ভিড়ে যাওয়া এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পী সৌভাগ্যক্রমে তাঁর পরিবারের সমর্থনই পেয়েছিলেন – সেও এতটাই, যে তিনি ইউরোপ গিয়ে নাচ নিয়ে চর্চা করতে সক্ষম হন। তাঁর স্টাইলকে একটি শিক্ষাক্রমে পরিণত করা ও তাকে ‘ক্রিয়েটিভ ডান্স’ পদবী দেওয়া – এগুলো অবশ্য আরও অনেক পরে ঘটে – ১৯৬০ নাগাদ। সেই শিক্ষাক্রম নানা নাচের স্কুলে শেখানো হয়, যদিও খাতায়কলমে তার মধ্যে তাঁর কন্যা ও পুত্রবধূ এখনো যে দুটি নৃত্যশিক্ষা নিকেতন পরিচালনা করেন, সেদুটিই প্রধান। উদয়শঙ্করের সৃজনশীল নৃত্যে ভারতীয় মার্গীয় নৃত্য ও ফোক ডান্সের পাশাপাশি জার্মান ব্যালে, ইউরোপিয়ান মডার্নিস্ট নাচ ও নাটকের প্রভাব ছিল। ১৯৩০-৪০-এ তিনি দলবদ্ধ নাচ ও বড় মাপের কোরিওগ্রাফি (অপেরা বা ব্যালের মতো) নিয়ে যেভাবে চিন্তাভাবনা করেন, তার পরিচালনা ও সংরূপ সেসময় খুবই অভিনব ছিল। তার উপর যেভাবে রবীন্দ্রনাথের মতই তিনি নাচকে – তার শৈলী বিষয়ে আলোচনাকে – উচ্চ/মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী বৃত্তে নিয়ে যেতে সক্ষম হন, তা সমসাময়িক নাচ এখন সামাজিক ভাবে যে জায়গায় পৌঁছেছে, তার ভিত্তি নির্মাণ করেছিল। ‘লেবার অ্যান্ড মেশিনারি’ নামে তাঁর যে কোরিওগ্রাফিটি নিয়ে আমি কথা বলতে চাই, তাতে ‘শ্রম’, ‘শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক’, ‘শ্রেণীসাম্য, ‘শ্রেণী-আন্দোলন‘ ‘শ্রেণীশোষণ’ – এই বিষয়গুলি উঠে এসেছিল। এই নাচটি তৈরি হয় ‘কল্পনা’ নামে যে তাঁর পরিচালিত (ও কোরিওগ্রাফ করা) সিনেমার অংশ হিসেবে, যে সিনেমাটি ডান্স-ফিল্মের জগতে প্রায় কাল্ট হয়ে ওঠা একটি নাম। পরে তাঁর স্ত্রী ও সহকর্মী অমলাশঙ্কর এই নাচটিকে নতুন ভাবে কোরিওগ্রাফ করে স্টেজে পরিবেশনা করার মত করে তোলেন। তবে রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে ‘লেবার অ্যান্ড মেশিনারি’র মত সরাসরি বামপন্থী সমালোচনা উদয়শঙ্কর বা তাঁর উত্তরসূরীরা তাঁদের নাচের মধ্যে দিয়ে আর কখনও করেননি।

১৯৮০-তে আরেকটি সমসাময়িক নাচের ধারা বাংলায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এবং আধুনিক বাঙালি নাচের পারফর্মেন্স এবং শিক্ষাব্যবস্থায় পাকাপাকি জায়গা করে নেয়। এটি ছিল মঞ্জুশ্রী চাকী সরকারের ‘নবনৃত্য’ বা ‘নিউ ডান্স’, যাকে পরে তাঁর কন্যা রঞ্জাবতী সরকার আরও এগিয়ে নিয়ে যান – ফর্ম নিয়ে গবেষণার জায়গা থেকেও, এবং বিষয়ের রাজনৈতিকতার জায়গা থেকেও। মঞ্জুশ্রী ও রঞ্জাবতী – দুজনেই নৃত্যকার হিসেবে নিজস্ব ধরনের কাজ তৈরি করেন, যার বিষয় ছিল বৃহত্তর অর্থে নারীবাদী, অর্থাৎ নারীর অধিকারের প্রশ্নটি ছাড়াও যার সাথে মিলে গিয়েছিল পরিবেশ, জাতি প্রভৃতি নিয়ে চিন্তাভাবনা। মঞ্জুশ্রীর কাজ রবীন্দ্রনৃত্য দিয়ে গভীর ভাবে প্রভাবিত ছিল। নবনৃত্যে রবীন্দ্রনৃত্য, ভারতীয় মার্গীয় নৃত্য, নানা ফোক ডান্স ফর্মের পাশাপাশি আফ্রিকান ফোক ফর্ম এবং নানা মার্শাল আর্টও মিশে গেছে – অনেকসময়ই সরাসরি নয়, ভাঙচুর ও বিনির্মাণের মধ্য দিয়ে। ‘ডান্সার্স গিল্ড’ – মঞ্জুশ্রী চাকী সরকারের (পরবর্তীতে রঞ্জাবতীরও) নৃত্য প্রতিষ্ঠান – এখনও সেই মিশ্র ফর্মে নৃত্য নির্মাণ ও পরিবেশনা করে থাকে। কিন্তু রঞ্জাবতীর দুর্ভাগ্যজনক অকালমৃত্যু এবং তার পরেই ১৯৯৯-তে ভগ্নস্বাস্থ্য-ভগ্নহৃদয় মঞ্জুশ্রী চাকী সরকারের মৃত্যুর পরে ডান্সার্স গিল্ডের কাজে নৃত্য গবেষণার দিক থেকে খুব নতুন ধরনের কাজ দেখা যায়নি। নাচের বিষয়েও সমসাময়িক প্রগতিশীল রাজনীতির কথা নতুন ভাবে উঠে আসেনি।

প্রসঙ্গত, উদয়শঙ্করের স্টাইল শেখানো ও পরিবেশনার উদ্দেশ্যে নির্মিত ‘উদয়ন’, বা পরবর্তীতে কন্যা মমতাশঙ্কর বা পুত্রবধূ তনুশ্রীশঙ্করের ‘ব্যালে’ দল, বা চাকী সরকারের ‘ডান্সার্স গিল্ড’ – কেউই কিন্তু তাতে কর্মরত নাচিয়েদের স্বচ্ছন্দে ভরণপোষণ করার মত রেভিনিউ বা সেই লক্ষ্যে মোট লাভের বণ্টনের একটি ব্যবস্থা সৃষ্টি করে উঠতে পারেনি, যা আর্থিক দিক থেকে পাতে দেওয়ার মত পরিমাণ অর্থ প্রতি মাসে এই নাচিয়েদের হাতে তুলে দিতে পারবে, আবার সাথে সাথে পারফর্মেন্স গ্রুপ হওয়ার পাশাপাশি অ্যাকাডেমি হিসেবে সংযুক্ত নাচিয়েদের নাচ নিয়ে গবেষণার দিকটিকেও ইন্ধন জুগিয়ে যেতে পারবে। উল্টে কখনো কখনো এই নাচিয়েদের তাঁদের প্রাপ্ত নৃত্যশিক্ষাকে ভিন্নক্ষেত্রে শিক্ষাদান বা নৃত্যনির্মাণ ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে বারণই করা হয়েছে। ফলে কলকাতার অনেক ‘পেশাদারি নৃত্যচাকুরি’ করা নাচিয়েই নিজের ও পরিবারের স্বার্থে নাচের পাশাপাশি অন্যান্য ছোটখাটো চাকরি নিয়ে দু’নৌকোয় পা দিয়ে চলতে বাধ্য হয়েছেন। বর্তমানে শিল্পসংস্কৃতি বিভাগে যে আর্থিক মন্দা, তার ফলে অনেক নৃত্যকারই বাধ্য হচ্ছেন ভাড়া করা নাচিয়ে নিয়ে কাজ করতে, অর্থাৎ একটি দল গঠনের পরিবর্তে যখন যেমন কাজ পাওয়া যাচ্ছে, তখন তেমন টাকা দিয়ে নৃত্যশিল্পী ‘ভাড়া’ করে খেপ খাটিয়ে নিতে। কিন্তু শহরকেন্দ্রিক সমসাময়িক নাচে কখন একটা বড় ধাঁচের প্রোগ্রাম পাওয়া যাবে, কোন কোরিওগ্রাফার সেটা পাবেন এবং তিনি তখন কতজন নাচিয়েকে ভাড়া করবেন – এসবের তেমন কোনো ঠিকঠিকানা নেই। ফলে একজন ‘ভাড়াটে’ নাচিয়ের পক্ষে তিনি ঠিক কোন সামাজিক শ্রেণীতে নিজেকে অধিষ্ঠিত করবেন, তাঁর গড়পড়তা আর্থিক আয় কত হবে, আয়ের নিয়মিত উৎস কি হবে, শুধু নেচেই নিজের ও পরিবারের সংস্থান করা যাবে কিনা – এগুলো নিয়ে ধারণা একটা অংশের কাছে অপরিষ্কারই থেকে যায়।

প্রেক্ষাপট ২ : চেন্নাই (চন্দ্রলেখা)

আমি চেন্নাইতে বসবাস করছি দশ বছরের উপর হতে চলল। আমার আশঙ্কা অমূলক প্রমাণ করে আমার নাচ যে শুধু বন্ধ হয়ে যায়নি, তা-ই নয়, বরং নাচ নিয়ে অভিজ্ঞতার কিছু নতুন দিক খুলে গেছে। কলকাতার সাথে তুলনা করতে গেলে হয়তো বা এই শহরে কনটেম্পোরারি নাচে পেশাদারিত্ব বেশি, অপেশাদারি বা পাড়ায়-পাড়ায়/স্কুলে-কলেজে শখের কনটেম্পোরারি নাচ বস্তুটার সুযোগ অপেক্ষাকৃত কম (কথাটা মার্গীয় নাচ, লোকনৃত্য বা সিনেমার নাচের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়)। ফলে হয়তো বা সরকারি বা বেসরকারি, দেশী বা বিদেশী স্পন্সরশিপ-এর জন্য হাপিত্যেশ করে বসে থাকার প্রয়োজন বেশি। হয়তো বা যৌথ কাজের সুযোগও এখানে তুলনায় খানিকটা কম। কিন্তু সাথে-সাথে এটাও বলতে হয়, যে চেন্নাইয়ের নাচের জগতে কনটেম্পোরারি নাচ নিয়ে চর্চার ক্ষেত্রে এক বিশেষ গভীরতার সন্ধান পাওয়া যায়, যা নাচ নিয়ে উৎসাহী যেকোনো মানুষের পক্ষে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। হয়তো সাধারণ ভাবে নাচ – বিশেষত ভরতনাট্যম, দক্ষিণের অন্যান্য মার্গীয় নাচের ফর্ম ও মূলত আঞ্চলিক ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সাথে যুক্ত নানা আচার ও লোকনৃত্য এমন ভাবে এই শহরের সামাজিক জীবনে ঢুকে আছে, যা এখানে নাচকে মানুষের জীবনযাত্রার গভীরে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কলকাতার সামাজিক জীবনে নাচ এইভাবে এতটা গভীরে অথচ সহজে ঢুকে নেই।

মোদ্দা কথা, নাচ নিয়ে মানসিকতা কলকাতার থেকে আলাদা হওয়ার কারণে চেন্নাইতে নৃত্যশিল্পীদের সামনে চ্যালেঞ্জগুলোও আলাদা ধরনের। সামাজিক ভাবে শহুরে মধ্যবিত্ত পরিবারে নাচ শেখাটা এখানে কিছু একটা হাতিঘোড়া ব্যাপার না, বরং বেশ গতানুগতিকই। হোক না সে মূলত মার্গীয় নাচ। অপরপক্ষে কলকাতায় মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ের নাচ শেখাটা আমাদের ছোটবেলাতেও দেখেছি অনেকটাই ভাগ্যের হাতে। এ বাবদে পরিবারের নীতিবোধ কোন স্তরে, শেখাটা তার উপর নির্ভর করত এবং খুব কম ছেলেমেয়েই নাচকে জীবনে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় বলে প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন। অন্যদিকে আবার বাংলায় কোনো আদত মার্গীয় নাচ (এক গৌড়ীয় নাচের একটা আভাস ছাড়া) না থাকায় পরীক্ষানিরীক্ষামূলক নাচকে কলকাতার নাচের লাইনে খুব একটা সামাজিক আপত্তি-বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়নি। অথচ চেন্নাইতে নাচের লাইন বলতে (কলিউড বাদ দিয়ে) সবার মাথায় বসে আছে ভরতনাট্যমের মার্গীয় ব্রাহ্মণ্য অস্তিত্ব। নাচ সম্পর্কিত অর্থনীতির প্রসঙ্গেও মার্গীয় নাচেরই রমরমা। চেন্নাই বলতেই সেই হাঁটু ভেঙ্গে বসা সাজগোজ করা ভরতনাট্যম শিল্পীকেই তো বোঝেন অনেকে। এই প্রতিযোগিতার মুখে নিজস্ব বাজার ধরা এবং নিজফর্মে স্থিত থেকে নৃত্যসমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করা চেন্নাইয়ের কনটেম্পোরারি নৃত্যকারদের কাছে একটা বড় চ্যালেঞ্জ।

দম বন্ধ করা ব্রাহ্মণ্য প্রভাব, নিয়মে আঁটা মার্গীয় গণ্ডী, গুরুমুখী সমালোচনাহীন-প্রশ্নহীন নতমস্তক বিনয়াবনতি, নাচের বিষয়ে পিতৃতন্ত্রের প্রভাব ও অরাজনৈতিকতা – এসমস্ত কিছুকে পেরিয়ে নাচকে একটা নতুন স্তরে নিয়ে যাওয়ার যে পথ, তার দরজা খুলে গিয়েছিল এক গুজরাটি মহিলার হাত ধরে, যিনি আদতে চেন্নাই শহরে এসেছিলেন আইন নিয়ে পড়াশুনো করতে। ইনিই চন্দ্রলেখা, শেষ অব্দি যাঁর গোটা জীবনটাই এই শহরে কেটে যায়, এবং যাঁর নাম না করে চেন্নাইয়ের কনটেম্পোরারি নাচ নিয়ে কথা বলা যায় না। ১৯৮০ নাগাদ চন্দ্রলেখা পুরোপুরি একজন নৃত্যকারের জীবন বেছে নেন – নাচে সমসাময়িকতার খোঁজে। ১৯৮০-র আগে নাচের সাথে তাঁর কিছুটা দূরের সম্পর্ক ছিল। অর্থাৎ, সেসময় তাঁর জীবনে নাচের অবস্থান ছিল আরও বহু শিল্পসমাগমের মাঝে অন্যতম একটি – নানা সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কাজের সাথে সমান্তরাল। পুরোদমে নৃত্যকারের জীবন বেছে নেওয়ার তাঁর এই সিদ্ধান্তের পিছনে মূল কারণ বলা হয় এমার্জেন্সির সময়ে তাঁর উপর ‘রাডিকাল’ রাজনৈতিক কার্যকলাপের অপরাধে রাষ্ট্র ও পুলিশের জুলুম – তাঁর গতিবিধির উপর আইনি নিষেধাজ্ঞা, কোর্টে আবশ্যিক হাজিরা দেওয়ার রায় জারি ইত্যাদি। যাই হোক, নারীশক্তি ও নারী-স্বাধীনতার সন্ধানের একটি নিরলস ভাব তাঁর নাচে ক্রমশ পরিষ্কার হয়ে ওঠে। পিতৃতন্ত্রবিরোধী লিঙ্গসাম্য ও যৌনতার এক প্রায় আধ্যাত্মিক সংরূপ তাঁর কাজে বারবার ফিরে আসে। যদিও, খেয়াল করতেই হয়, যে এমার্জেন্সির অভিজ্ঞতাবশেই হোক, বা যে কারণেই হোক, একজন পুরোদস্তুর নৃত্যকার হয়ে ওঠার পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে তিনি আর কোনো কাজ করেননি। ১৯৮২-র পর তাঁর কাজে (মূলত নাচ) ‘রাডিকাল’ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা আর কখনও উঠে আসেনি।
ফর্ম-ভিত্তিক ভারতীয় কনটেম্পোরারি নাচে চন্দ্রলেখা একটি বিশেষ জায়গা নিয়ে আছেন, যা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের বিচারে কলকাতায় চাকী সরকারের কাজের সাথে তুলনীয়। চন্দ্রলেখার ভাবনায় নাচিয়ের দেহ-মস্তিষ্ক-হৃদয় এক সবলা-সবুদ্ধি নারীশক্তির পীঠ। তাঁর নাচের ব্যাকরণ গড়ে উঠেছে ভরতনাট্যম, যোগাভ্যাস ও কেরালার মার্শাল আর্ট কলেরিপায়াট্টু-র আংশিক বিনির্মাণের মধ্যে দিয়ে। সরল কাহিনিধর্মিতাকে অস্বীকার করে শরীর, তার গতি ও অবস্থানের (স্পেস) সম্পর্ক নিয়ে তত্ত্ব ও ব্যবহারগত চিন্তাভাবনা (যা সে সময় মার্গীয় নাচে অনুপস্থিত তো ছিলই, এখনও অনেকটাই আছে) এবং একইসাথে সৃজনশীলতা ও স্বাধীনতার সম্পর্ক বিষয়ে তাঁর প্রায় সদানিবিষ্ট আগ্রহ মিলেমিশে একটি অননুকরণীয় ফর্ম গড়ে ওঠে। তাঁর সাথে কাজ করা নৃত্যশিল্পীরা অনেকেই কনটেম্পোরারি নাচ বা অন্যান্য ফর্মে পারফর্মেন্স, নৃত্যশিক্ষা, ডান্স থেরাপি ইত্যাদি নানা পথ বেছে নিয়েছেন। কেউ কেউ সেসব পথে আরও এগিয়ে গিয়ে নিজস্ব নতুন ফর্মও গড়ে তুলেছেন, যা রাজনৈতিক ভাবে সচেতন – বিশেষত নারীবাদী অর্থে।

নাচের বিষয়ে লিঙ্গ-রাজনীতির উপস্থিতি প্রসঙ্গে চন্দ্রলেখার ‘শ্রী’ কোরিওগ্রাফিটি নিয়ে এই লেখায় কথা বলব, কেননা – ১) গঠন, নির্মাণ ইত্যাদির দিক থেকে এই কাজটিকে অনেকে তাঁর সবচাইতে সমসাময়িক চিন্তাভাবাপন্ন কাজ বলে চিহ্নিত করেছেন, এবং আরেকটি কারণ ব্যক্তিগত – ২) বছর দুয়েক আগে তাঁর মৃত্যু দিবসে এই কাজটিকে পুনর্গঠন করার একটি প্রকল্প চেন্নাইতে নেওয়া হয়। ফলে খানিকটা কাছ থেকে দেখার সুবাদে কাজটিকে বুঝতে আমার অনেকটা সুবিধা হয়।

চেন্নাইতে কলকাতার তুলনায় নাচের অপেক্ষাকৃত বেশি গ্রহণযোগ্যতা থাকলেও, এবং সমসাময়িক নৃত্যশিল্পীদের মধ্যে নাচের টেকনিকাল দিকটি নিয়ে গবেষণার গভীরতা খানিকটা বেশি থাকলেও (যার অনেকটা হয়তো চন্দ্রলেখা ‘স্কুল অফ থট’-এর অবদান) চেন্নাইতে বসবাসকারী পেশাদারি নৃত্যকাররা বা নাচে উৎসাহী মানুষরা কলকাতার তুলনায় অর্থকরী দিক থেকে খুব ভাল আছেন, এরকম মনে করার কোনো কারণ নেই। এখানেও কনটেম্পোরারি নাচের শিল্পীদের মধ্যে একটা প্রতিষ্ঠানবিরোধী উদারপন্থী মনোভাব আছে ঠিকই। কিন্তু নাচ থেকে মাইনে বা এই জাতীয় কোনো নিয়মিত নিশ্চিন্ত আয়ের এখানেও কোনো চল নেই। উপরন্তু ‘শো’ করে টাকা পাওয়াও দিনে-দিনে আরও কঠিন হয়ে উঠছে। এই পুরো সিস্টেমের অনিশ্চয়তার আসল ধকলটা এসে পড়ে – কলকাতার মতই, যথারীতি – ভাড়ার নাচিয়েদের উপর।

যাই হোক, ভূমিকা গুটিয়ে এবার বিশেষ উদাহরণগুলিতে ঢোকা যাক।

• ‘লেবার অ্যান্ড মেশিনারি’ (১৯৪৮), উদয়শঙ্কর

একটি স্বল্প-আলোকিত ফ্যাক্টরির ছবি; সময়ের একঘেয়ে টিকটিক, ঘাম-ময়লা আর তারও চেয়ে বিশ্রী মেশিনের মত খাটুনি – এইসবের সাথে একজন পুঁজিবাদী কারখানা মালিক (অবধারিত ভাবে যাঁকে উত্তর-পশ্চিম ভারতের বাসিন্দা হিসেবে দেখানো হয়), যিনি অত্যাচারী রাষ্ট্রের হাতে হাত মিলিয়ে শ্রমিকদের শোষণ করেন – এই হল ‘লেবার অ্যান্ড মেশিনারি’র মূল উপাদান। উদয়শঙ্কর নিজে একজন প্রতিবাদী শ্রমিক – শ্রেণী-সচেতনতার প্রতীক। তিনি বাকি শ্রমিকদের সংগঠিত করার প্রয়াস করেন, হেরে যান, এবং মালিকের হাতে লাঞ্ছিত আর পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। শেষে অবশ্য তিনি ও তাঁর ‘কমরেড’রা এই লাঞ্ছনা ও অমানবিক জীবনের শিকল ভেঙ্গে ভিলেনকে কত ধানে কত চাল বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হন। এই হল গল্প।

উদয়শঙ্করের প্রবাদপ্রতিম ডান্স-ফিল্ম ‘কল্পনা’তে ‘লেবার অ্যান্ড মেশিনারি’ একটি স্বপ্নদৃশ্য হিসেবে আসে। গল্পের নায়ক উদয়ন (অভিনয়ে উদয়শঙ্কর নিজে) তাঁর তৎকালীন (সিনেমায়) প্রেমিকা ‘রগচটা-হিংসুটে-লোভী-বদচরিত্র’ কামিনীর পাল্লায় পড়ে, নৃত্য ও সংস্কৃতি কেন্দ্র স্থাপনের ফান্ড জোগাড়ের আশায় একদল মালদার ব্যবসায়ীর সঙ্গে খেজুর করতে যান। কিন্তু সেখানে পৌঁছে তাঁর হলেও-হতে-পারে দাতাদের পুঁজিপতিসুলভ ‘গ্রটেস্ক’ ও ‘স্টিরিওটাইপ’ খেলোমিতে তিতিবিরক্ত হয়ে তিনি বিস্তর মদ্যপান করে এক নারকীয় খোয়াব দেখেন। সেটাই ‘লেবার অ্যান্ড মেশিনারি’। নাচটি শেষ হয় ব্যবসায়ী ভিলেনের অট্টহাস্য দিয়ে। তাইতে দুম করে ঘুম ভেঙ্গে উঠে উদয়ন সিদ্ধান্ত নেন, এদের পাপের টাকায় তিনি হাত ছোঁয়াবেন না।

‘লেবার অ্যান্ড মেশিনারি’-তে স্পেস, অর্থাৎ ‘স্থান ও অবস্থান’ নিয়ে খতিয়ে ভাবা হয়েছে। প্রায় প্রতি মুহূর্তেই, যাঁরা নাচছেন, তাঁদের শরীরের গতি ও অবস্থানের পরিবর্তনের মাধ্যমে গোটা নৃত্যস্থলটিই গতিশীল হয়ে ওঠে। নাচিয়েদের শারীরিক গতির ধরন যন্ত্রের মত – মিনিমালিস্টিক, অর্থাৎ যৎসামান্য, এবং যন্ত্রমানবের মতই কাঠ-কাঠ, পুনরাবৃত্তিমূলক। উদয়শঙ্কর নাচিয়েদের এক-একটি দলকে একই গতিভঙ্গীতে চলিয়েফিরিয়ে, অর্থাৎ রিজেমব্লেন্স পদ্ধতি ব্যবহার করে একটি অতিকায় দানবীয় যান্ত্রিকতার ছবি নির্মাণ করেন। এ এক এমন যন্ত্র, যার নাট-বল্টু-গিয়ার-পুলি এক অমানবিক, মননহীন শারীরিক ঐক্যে বাঁধা। এ যন্ত্র আসলে শ্রমিকদের ক্লান্ত ঘর্মাক্ত শরীর দিয়েই নির্মিত। এক-আধটা যন্ত্রাংশ, অর্থাৎ শরীর, ক্লান্তিতে খসে পড়লেও সে যন্ত্র ভ্রূক্ষেপ করে না, উৎপাদন চলতেই থাকে।

এই শোষণচক্র থেকে মুক্তির প্রথম রূপক হয়ে ওঠে উদয়শঙ্করের প্রবাদপ্রতিম ঢেউয়ের মত বাহুচালন। পরে কথাকলি ও ছৌ-এর নানা বীরত্বব্যঞ্জক পদক্ষেপ ও শরীরচালনের (আগেকার সরলরৈখিকতার বিপরীতে গোলাকৃতি চলন-গমন) ভিতর দিয়ে যান্ত্রিক পুনরাবৃত্তির চক্র ভেঙ্গে মুক্তির ছন্দ উঠে আসে। শিরদাঁড়ার ব্যবহার (ঝুঁকে পড়া, উপরে তোলা, ঘোরানো, শিঁটকে যাওয়া, বিস্তৃত করা ইত্যাদি), শরীরের আপেক্ষিক উচ্চতা/স্তর এবং গতির গুণাগুণ নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা (লাফ দেওয়া, পড়ে যাওয়া, হাঁটু ভেঙ্গে হাঁটা, দোলা ইত্যাদি) এবং তার সাথে আরও নানান গতি নানা কম্পোজিশন তৈরি করে। সিনেমা মাধ্যমের পরিপ্রেক্ষিতে এই নাচটি বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য, কারণ এখানে শরীর এবং স্থান (বডি ও স্পেস) ছাড়াও ক্যামেরার তৃতীয় চোখ নিয়ে খেলা করা হয়েছিল। গতি-ভঙ্গী-ছন্দের দিক থেকে এই নাচকে কড়া ছকে বাঁধা হয়েছিল। তাৎক্ষনিক নাচ তৈরি বা ইম্প্রোভাইজেশন-এর জায়গা রাখা হয়নি। এই শৈলীতে নাচ নির্মাণ এবং নাচে সরাসরি রাজনৈতিক বিষয়ের উপস্থিতি সেসময়কার ইউরোপিয়ান নৃত্যকারদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যার মধ্যে কারুর কারুর প্রভাব উদয়শঙ্করের জীবনে ও নাচে সরাসরি পড়েছিল, যেমন জার্মান নৃত্যকার কার্ট উস।

অথচ এত সম্ভাবনা সত্ত্বেও ‘লেবার অ্যান্ড মেশিনারি’-তে প্রথমেই চোখে পড়ে নৃত্যকারের কেন্দ্রীয় ভূমিকা – তাঁর চোখে পড়ার মত ফর্সা ও গতিশীল (যেন ভাসমান) দেহটির সর্বক্ষণ স্পটলাইটের নীচে ও স্টেজের কেন্দ্রে থাকার প্রবণতা। বাকি নাচিয়েরা কৃষ্ণকায় – শরীরে-মুখে ঝুলকালি মাখা ‘ব্ল্যাকফেস’ শ্রমিকগোষ্ঠীর কোরাস! উদয়নের মুখও বাকি নাচিয়েদের মত কালো নয়। রঙের এই ব্যবহারের ভিতর নৃত্যকারের যে রাজনৈতিক চিন্তার অভাবের আভাসটুকুই পাওয়া যায়, সে অভাবের শিকড় আসলে আরও গভীরে। তার ফল, নাচটির বিষয়ের সাথে জড়িত বৃহত্তর রাজনীতি ও নৃত্যকারের ব্যবহারিক ভাবনাচিন্তার মধ্যে মূলগত ফারাক। এটা আসলে গোটা সিনেমাটাকেই প্রভাবিত করে। যেমন, ‘লেবার অ্যান্ড মেশিনারি’র শেষে স্বপ্ন ভেঙ্গে উঠে উদয়ন দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সাহায্য অস্বীকার করলেও শেষ পর্যন্ত একজন সহৃদয় ব্যবসায়ীর সাহায্যই গ্রহণ করেন এবং তাই দিয়েই নৃত্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। সিনেমায় উদয়নের এই সিদ্ধান্তটা আসে মানুষ উদয়শঙ্করের এই রাজনৈতিক ভাবনা থেকে, যে প্রচলিত মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক আসলে সমস্যাজনক নয় – কোনো কোনো মালিকের দুর্নীতিই সমস্যা।

তাই স্বাভাবিক ভাবেই মনে হয়, যে নৃত্যকার শ্রেণীসংগ্রামকে তাঁর কাজে একভাবে প্রতিফলিত তো করলেন। কিন্তু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান হিসেবে তাঁর শ্রেণীচরিত্র, আশা-আকাঙ্খা, চাহিদা – এসব পেরিয়ে তাঁর নাচের বিষয়ের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে পারলেন না – কাজে তো না-ই,হয়তো অনুভূতিতেও না – ঠিক যেমন আমরা উপরে আলোচনা করেছিলাম।

• ‘তোমারি মাটির কন্যা’ (১৯৮৫): মঞ্জুশ্রী চাকী সরকার

রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্য বিষয়ে মঞ্জুশ্রী চাকী সরকার লিখেছেন – “রবীন্দ্রনাথের সৃষ্ট নারী চরিত্রগুলির কথা ভাবলে অবাক হতে হয় – শুধু গল্পে নয়, তাঁর নৃত্যনাট্যগুলিতেও। প্রকৃতি, মায়া, চিত্রাঙ্গদা – সম্পূর্ণভাবেই গতানুগতিকতার বাইরে। তারা মার্গীয় নাচে যে ব্রাহ্মণ্য আদর্শের ও ভালোমন্দের সীমাবদ্ধতা – তাকে পেরিয়ে যায়। ঐতিহ্যের প্রয়োজনকে অস্বীকার না করেও এটা জিজ্ঞেস করার সময় এসে গেছে, যে আমরা কতদিন ঐতিহ্যের বেঁধে দেওয়া পরিসীমার ভিতরেই ঘুরে ঘুরে বেড়াব?”

‘তোমারি মাটির কন্যা’ রবীন্দ্রনাথের ‘চণ্ডালিকা’ নৃত্যনাট্য ও নাটকের উপর ভিত্তি করে নির্মিত। নাটকটি আবার বৌদ্ধভিক্ষু আনন্দকে নিয়ে রচিত নেপালের বৌদ্ধ ‘মিথোলজিকাল’ কাহিনী অবলম্বিত। এই কাহিনীতে আনন্দ – গৌতম বুদ্ধের অন্যতম প্রধান সঙ্ঘসদস্য – এক ‘নীচু জাতির’ নারীর মায়াজালে আটকা পড়ে। রবীন্দ্রনাথের লেখায় এই জাতি চণ্ডাল জাতি, যারা হিন্দু সমাজে অস্পৃশ্য (যদিও বৌদ্ধধর্ম তার বিরোধিতা করে)। এই নারীর নাম মায়া। তাঁর কন্যা প্রকৃতির হাত থেকে ভিক্ষু আনন্দ জল পান করে, যা কট্টর হিন্দুত্ব অনুযায়ী অভাবনীয় ছিল। প্রকৃতি সমাজের কাছ থেকে অবমাননাই পেয়ে এসেছে, তাই সুদর্শন আনন্দের এই অনুবেদনে তার মনে সহজেই প্রেমকামনার সঞ্চার হয়। সে তখন তার জাদুকরী মা মায়াকে অনুরোধ করে আনন্দকে টেনে আনার ব্যবস্থা করে।

রবীন্দ্রনাথের নাটক এই মূল কাহিনী থেকে অনেকটা সরে আসে। মূল কাহিনীতে বুদ্ধর আধ্যাত্মিক শক্তির উপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা আনন্দর উপর থেকে মায়ার জাদুর প্রভাব কাটিয়ে তাকে ‘ঠিক পথে’ নিয়ে আসে – তা-ও আবার যখন প্রকৃতি তার বাসর সাজাতে ব্যস্ত থাকে, তখন। রবীন্দ্রনাথের কল্পনায় গার্হস্থ্যের ভাগ কমে গিয়ে প্রকৃতি আর মায়া চরিত্রে আরও নানা সামাজিক-নৈতিক-আধ্যাত্মিক জটিলতা উঠে আসে। আনন্দের চরিত্র বরং তুলনামূলক ভাবে সরল – আধ্যাত্মিকতার তারে বাঁধা। বাকি নাটকে জাতি ও লিঙ্গের বাধা পেরিয়ে বাসনা প্রকাশের স্বাধীনতাকে রূপ দিলেও যেভাবে নাটকের শেষে আনন্দের আধ্যাত্মিক শক্তি, ক্ষমা ও আশীর্বাদ মা-মেয়ের হৃদয়ে কামনা-বাসনা-ক্ষোভের উর্দ্ধে শান্তি ও শরণের ভাব নিয়ে আসে, তাতে এটা বুঝতে ইচ্ছে হয়, যে নাট্যকারের উচ্চবর্ণ-উচ্চশ্রেণী-পুরুষী অবস্থানের প্রভাব এই দুই নিম্নবর্ণা, সামাজিক ভাবে অবমানিত কিন্তু সবলা, স্বাধীনা নারীর অনুভূতির মূল্যায়নের পিছনে কতখানি প্রবল।

প্রকৃতির চরিত্রের আকর্ষণীয় দিকগুলো হচ্ছে তার কামনার ভিতর দিয়ে তার প্রকাশ, সামাজিক উঁচুনীচু-ভেদের বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদ। কিন্তু আবার এটাও সত্যি যে তার প্রতিবাদ মূলত সোচ্চার তার গৃহ-অভ্যন্তরে, তার মায়ের সামনে – মাতৃস্নেহকে ‘ব্যবহার’ করে। মায়ার চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল শক্তি-দৌর্বল্যের নানা অন্তর্দ্বন্দ্বের সমাহার। সাহস, আত্মবিশ্বাস, সামাজিক রীতিনীতি বিষয়ে বিজ্ঞতা, বুদ্ধি ও বলের সাথে তাঁর সামাজিক নিম্নতার মোকাবিলা করে নিজের একটি ক্ষমতার জায়গা তৈরি করা ইত্যাদি মায়ার শক্তি। সর্বোপরি মায়ার ভাণ্ডারে রয়েছে এক আদিম জাদুশক্তি। এই জাদুশক্তি সমাজের নীচু জাতির নারীর নিজস্ব জ্ঞান, যাকে ব্রাহ্মণ্য পুরুষতান্ত্রিক সমাজে ভ্রষ্টজ্ঞান বলে মানা হয়। অন্যদিকে সামাজিক নিয়মনীতির বিরুদ্ধে ঠিক যথেষ্ট ফুঁসে ওঠার ভাবও কিন্তু মায়ার ভিতর নেই; বরং মেনে নেওয়া আছে, আছে মেয়ের প্রতি তার অত্যধিক স্নেহ। এগুলো মায়ার দুর্বলতা। কিন্তু কাহিনীর গতির সাথে তাল মিলিয়ে এই দোষগুণগুলো জটিল পথে ঘুরে ঘুরে আসে, যা মায়ার চরিত্রকে এবং নাটকটিকে অসরলরৈখিক সৌন্দর্য দেয়। শক্তি আর দুর্বলতা থেকে-থেকে স্থান পরিবর্তন করতে থাকে।

চরিত্রের এই মানবিকতা, সামাজিক-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-জটিলতা মঞ্জুশ্রী চাকী সরকারের পরিবেশনায় একটি সম্পদ হয়ে ওঠে। ‘লেবার অ্যান্ড মেশিনারি’তে কে ভাল কে মন্দ, তা নিয়ে কারুর কোনো সন্দেহও থাকে না। ‘তোমারি মাটির কন্যা’তে ‘চণ্ডালিকা’-র থেকে এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে মূল মেয়ে-চরিত্রগুলিকে পথভ্রান্ত এবং অবস্থার শিকার হিসেবে না দেখে তাদের সমগ্র জটিলতা সমেতই শারীরিক-মানসিক প্রকাশের একটি শক্তিশালী ছবি তৈরি করা হয়েছে – যে ছবি নবনৃত্যের ব্যাকরণের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ডান্সার্স গিল্ডের প্রাক্তন ছাত্রী ঐশিকা চক্রবর্তী লিখেছেন – “মঞ্জুশ্রীর কাজ দৃঢ়ভাবে নারীর অধিকার ও স্বেচ্ছার কথা বলে। ‘উইমেন্স কালেক্টিভ পাওয়ার’ বা মেয়েদের সঙ্ঘবদ্ধ শক্তি, ব্রাহ্মণ্য আচার-অনুষ্ঠানের বাইরে ‘নিম্নশ্রেণী-নিম্নবর্ণে’র মেয়েদের আদিম জ্ঞানের দলগত আচার-অনুষ্ঠান পালনের শক্তি তাঁর কাজে প্রংশসিত এবং অনুকরণীয় বলে দেখানো হয়।” ‘তোমারি মাটির কন্যা’তে পুরুষ চরিত্রের ভূমিকা ন্যূনতম। আনন্দকে দেখানো হয় একটি আলোর সূত্র হিসেবে, বা ছায়া ব্যবহার করে, আর ‘কোরাস’ বা দলবদ্ধ নাচগুলিতে – রবীন্দ্রনৃত্যে যেভাবে নারীপুরুষের সম্মিলিত উপস্থিতি দেখা যায়, তার বদলে – একদল শক্তিশালী নারী নৃত্যশিল্পীকে ব্যবহার করা হয়, যাদের শরীরি গতিভঙ্গীতে, মুদ্রায় ও কম্পোজিশনে রাখা হয় নানা দৃশ্যরূপক। তাদের মুখে আপাত ভাবে অনুভূতির অপ্রকাশ এবং আত্মবিশ্বাসের ভাব আসলে দর্শককে সাহায্য করে কোরাস জিনিসটাকেই নতুন ভাবে দেখতে। এই নতুন ভাবে দেখার অর্থ, শুধুই নাটকের ফাঁকা জায়গা ভরাট করতে বা নাটকের মুড-নির্ধারক হিসেবে মেয়ে কোরাসের দল স্টেজে উঠে নাচছে – এইভাবে না দেখে কাহিনীতে যে আদিম যূথবদ্ধ নারীশক্তির ক্ষমতায়ন ও মুক্তি ঘটে, তার প্রকাশ হিসেবে দেখা। কোথাও কোথাও যেন প্রতিটি নাচিয়েই প্রকৃতি বা মায়া। আবার আরেক ভাবে এই নৃত্যশিল্পীদের উপস্থিতি শুধু এই কাহিনীর মূল চরিত্রদুটির রূপক হিসেবে নয়, সমগ্র নিম্ন-সমাজবর্গের মেয়েদের ক্ষমতায়নের রূপক হিসেবে (নিম্নবর্গীয় হওয়ার পাশাপাশি মেয়ে –অর্থাৎ তারা দু’বার করে শোষিত)। প্রকৃতির যৌনতার উদ্ভাস যেভাবে কোরিওগ্রাফির মধ্যে দিয়ে দেখানো হয়, তা ভারতীয় সমসাময়িক নাচের জগতে ঐতিহাসিক মুহূর্তচিত্রগুলোর মধ্যে একটা। ‘তোমারি মাটির কন্যা’-র মূল সুর ওই দৃশ্যরূপে ধরা পড়েছে।

কিন্তু জাতের প্রশ্নে ‘তোমারি মাটির কন্যা’ নিয়ে কথা বলতে গেলে আমাদের একটু থমকাতে হবে। ‘চণ্ডালিকা’ একটি শক্তিশালী নৃত্যনাট্য কারণ এখানে শুধুই নারীর কামনার কথা বলা হয়নি, একজন অস্পৃশ্য নারীর কামনা – যা ঐতিহাসিক-সামাজিক-রাজনৈতিক দিক থেকে জটিল – তার কথা বলা হয়েছে। এই জটিলতা মঞ্জুশ্রী চাকী সরকারের ‘তোমারি মাটির কন্যা’তে কতটা প্রাসঙ্গিক রয়ে গেছে?

সত্যি কথা বলতে ‘তোমারি মাটির কন্যা’কে জাত-প্রশ্নে বিচার না করে একটি নারীবাদী সমসাময়িক নৃত্যনাট্য হিসেবে দেখলেই হয়তো ভালো হয়, যা কিনা প্রসঙ্গত জাত-প্রশ্নে কিছুটা অংশ নিতে চেয়েছে – কিন্তু ঠিক নেয়নি। জাতের কথাটি রবীন্দ্রনাথ যেমন যেমন তাঁর স্ক্রিপ্টে লিখেছেন, ‘তোমারি মাটির কন্যা’ মূলত তা-ই অনুসরণ করে। এমনিতে ‘চণ্ডালিকা’ নৃত্যনাট্যে অস্পৃশ্যতাকে অনুবেদনার সাথেই দেখা হয়েছে – বিষয় হিসেবেও, যন্ত্রণার কাব্য হিসেবেও। তবু রবীন্দ্রনাথের কল্পনায় এক নিম্নবর্ণের মেয়ের (শারীরিক) প্রেমে কীভাবে এক (আধ্যাত্মিক) উচ্চবর্ণের পুরুষ ধরা দেয় না, দেওয়া সম্ভব না – এই সুরেই শেষ হয়ে যায়। একে আমরা পুরুষ নাট্যকার ও তাঁর প্রতিবাদী প্রোটাগনিস্ট নারীচরিত্রের মধ্যেকার একটি আত্মিক বিযুক্তিকরণ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ প্রোটাগনিস্ট চরিত্রের ক্ষমতায়ন ঘটিয়েও শেষে রাশ টেনে ধরেছেন। ট্র্যাজেডি নির্মাণ এর একটি কারণ নিশ্চয়ই। কিন্তু যে কারণেই হোক, তিনি যে ‘আধ্যাত্মিক উচ্চবর্ণীয় পুরুষ’কে ‘শরীরকেন্দ্রিক নিম্নবর্ণীয় নারী’র উপরে স্থান দিলেন, তা-ও সত্যি।

একই যুক্তিতে ‘তোমারি মাটির কন্যা’তেও কি এক শহরকেন্দ্রিক, জাত সম্পর্কে প্রত্যক্ষ যন্ত্রণার অভিঘাত না পাওয়া নৃত্যকার ও তাঁর প্রোটাগনিস্ট বেজাত চরিত্রের মধ্যেকার একটি আত্মিক বিযুক্তিকরণ উঠে আসে না? ‘তোমারি মাটির কন্যা’তে নারীবাদী প্রশ্নচিহ্ন নিয়ে, তার শারীরিক নৃত্য সংরূপ, কোরিওগ্রাফিক গঠন নিয়ে যতটা ভাবনাচিন্তা করা হয়েছে, সেই একই নৃত্যরত শরীরে জাত-চিহ্ন নিয়ে ততখানি চিন্তা ধরা পড়ে না। অস্পৃশ্য চণ্ডাল জাতের নৃত্য সংরূপ কেমন, তার ভয়-যন্ত্রণা-সাহস-শক্তির মুদ্রারূপ কেমন হতে পারত – আন্দাজ করা যায় না। মূল চরিত্র ও কোরাস – দুই ক্ষেত্রেই শরীরগুলো বেঁকেচুরে, একা বা সদলবলে এক-একটা কাল্ট ছবি তৈরি করে, যা সুন্দর, কিন্তু এমনই শহুরে রকমের সুকুমার ও সংযত, যে দর্শকের ভয় হতে পারে, এ নিম্নবর্গের ক্ষমতায়ন, নাকি সংস্কৃতায়ন।

নৃত্যকারের (বা নৃত্যকারদের, কারণ রঞ্জাবতীও এই নৃত্যনির্মাণে ভাগ নেন) সামাজিক উচ্চাবস্থানকে ‘তোমারি মাটির কন্যা’ মুছে ফেলতে পারেনি – নানা নাচের ফর্ম মিশিয়েও। আসলে নানা ‘মুভমেন্ট-ফর্মে’র একীকরণ ঘটিয়েও নবনৃত্যে নাচিয়ের শরীরে মার্গীয় সুকুমারত্বের প্রতি আকর্ষণটুকু রয়ে গেছে। তাই ‘তোমারি মাটির কন্যা’ এক রূপক, বাস্তব নয়। তাতে অকবিত্ব, অসুন্দর গ্রাম্যতা, অস্পৃশ্যতার রাজনীতি – এসবের স্থান নেই। ‘লেবার অ্যান্ড মেশিনারি’র মত এই নাচটিও শহুরে উচ্চ/মধ্যবর্গীয় দর্শকের মনোরঞ্জনের জন্যই তৈরি। তাঁদের কাছে জাত একটি অজানা বস্তু – কানে শোনা মাত্র।

• ‘শ্রী’ (১৯৯১), চন্দ্রলেখা

‘শ্রী’তে ব্যবহৃত নৃত্যদৃশ্যগুলো বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থায় নানান দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশনা শুরু হয় চন্দ্রলেখার একক নাচ দিয়ে। এখানে তিনি শাকম্ভরী – উদ্ভিদ-শস্য-পৃথিবীর দেবী, মুক্ত প্রাকৃতিক উর্বরতার প্রতীক। এই ছবিটি চন্দ্রলেখা খুঁজে পান হরপ্পার এক ফলক থেকে। শাকম্ভরী শুয়ে থাকেন, তাঁর পিঠ মাটিতে, দুই পা শূন্যে, যেন মাটি ফুঁড়ে ওঠা বৃক্ষের দু’ফালি কান্ড। চন্দ্রলেখা বিশ্বাস করতেন, মানবজীবনের ইতিহাসকে স্থির বা চলমান ছবিতে ধরে রাখা যায় না, তাকে রাখতে হয় মানুষের গতিমান ভৌত শরীরে। তাই শাকম্ভরী কেবল একটি ট্যাবলো-মাত্র নয়। তার শূন্যস্থিত পা দুটি স্থির নয় – সবল ও গতিশীল, যা বাতাসকে পেঁচিয়ে ধরে, যার হ্রাসবৃদ্ধি ঘটে – কুড়িটি দীর্ঘ মিনিট ধরে। নাচের দ্বিতীয় ভাগে আসে আদিম মাতৃকাদের শক্তির মূর্তকরণ – ধুলো থেকে যাঁরা এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ান শক্তিস্তম্ভের মত। এখানে মাতৃত্ব মানে সন্তানধারণ ও জননের সাধারণ প্রক্রিয়ামাত্র নয় – প্রকৃত সৃজনশক্তি, যা আবার প্রয়োজনে বিধ্বংসীও। দেবীশক্তি, ‘ফার্টিলিটি মিথ’ ইত্যাদি বলতে যা বোঝায় আর কি। এরপরে ‘শ্রী’তে আসে বিবাহ, মেয়েদের সঙ্ঘবদ্ধতার অভাব ও তার ফল (অর্থাৎ ‘চণ্ডালিকা’র কোরাসের বিপরীত এক ছবি)। ক্রমশ মাতৃকাদের অতিঋজু শিরদাঁড়ার ছবি বদলে যায় প্রাত্যহিক সামাজিক পরাধীনতা, ভয়, গৃহশ্রমের চাপে কুব্জপৃষ্ঠ রমণীশরীরের ছবিতে। ‘শ্রী’ শেষ হয় নৃত্যকারের স্বপ্নে – এক দশভুজা মাতৃকাশরীরের বরাভয় ও বিধ্বংসী রূপের মিলিত মুহূর্তে, যেখানে হৃত শক্তিকে নারী পুনরুদ্ধার করে।

‘শ্রী’ প্রসঙ্গে একটি বিতর্কের আজ অব্দি হদ হয়নি, বরং আজকের সময়ে এসে আরও গোলমেলে হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেটি হল এই দশভুজা রূপের সমালোচনা। দুর্গা, মা, ভারত মাতা – এই শব্দগুলো আজ ভারতীয় দক্ষিণপন্থী দলগুলোর হাতে অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে, মৌলবাদী রূপক হয়ে উঠেছে (ব্রিটের মতে এও ‘ফ্যাসিজমে’র বৈশিষ্ট্য)। আরেকটি বিতর্ক রয়েছে উর্বরতা তথা জনন ও সৃজনের রূপকের উপর ‘শ্রী’-র অত্যধিক জোর নিয়ে। সুকুমারী ভট্টাচার্যের মতো প্রথম দিককার ভারতীয় নারীবাদীরা মাতৃত্বকে ঘিরে ‘মিথোলজিকাল রোমান্স’-এর বাড়াবাড়ি নিয়ে কড়া সমালোচনা করেন। চন্দ্রলেখার শিল্পীসত্ত্বার কাছে হয়তো সৃজনের ও জননের উদযাপনের একটা গভীর সম্বন্ধ ছিল – সৃষ্টি অর্থেও, আবার আধার থেকে আধারে শক্তির বহমানতা অর্থেও। কিন্তু আর পাঁচজন মেয়ের কাছে শাকম্ভরী কেমন? রুস্তম ভারুচা সুকুমারী ভট্টাচার্যের সমালোচনা প্রসঙ্গে চন্দ্রলেখার জীবনীতে লেখেন – “সর্বব্যাপী মাতৃশক্তির তুলনায় সাধারণ মায়েরা নানা সমস্যা, কষ্ট ও সীমাহীন শোষণের সম্মুখীন হন। সুকুমারী মা ও দেবীমাতৃকার তুলনা এই বলে শেষ করেন – ‘কোনো মানুষী মা কি এই ভয়ঙ্করীর (‘ফরমিডেবল ফিগার’) সাথে নিজেকে মিলিয়ে দেখতে পারবেন?’” এখানে মনে রাখতে হবে, সমস্ত আদিম দেবীকেই কিন্তু সর্বদা মাতৃরূপে ভজনা করা হয়নি। ‘অ-মাতৃকা’ দেবীরা (এদেশে মনসা, ওদেশে লিলিথ ইত্যাদি) অনেকসময় দানবী বলে পরিচিত হয়েছেন।
‘শ্রী’-তে দেবীর দানবীকরণ করা হয়নি, বরং এক অমানুষী (হিন্দু) আধ্যাত্মিক মাতৃত্বের সাথে নারীবাদকে সমার্থে দেখা হয়েছে। অথচ মানুষী নারীর দৈনন্দিন জীবন নিয়ে ‘শ্রী’র বক্তব্য খুব পরিষ্কার নয় – বিশেষত তার শ্রম নিয়ে। যেমন, এক জায়গায় ঘরের মেঝে মোছার মত এক পুনরাবৃত্তিমূলক ভঙ্গীর ভিতর দিয়ে নারীর শক্তিহীনতা বোঝানো হচ্ছে। কাঞ্চা ইলায়া লিখেছেন – “ব্রাহ্মণ্য ব্যক্তিগত সম্পত্তিমূলক সামাজিক ব্যবস্থায় শ্রমকে নেতিবাচক (পারলে অদৃশ্য) করে দেখা হয়।” যেন শ্রম মানেই খারাপ, তাই আজও বহু উচ্চশ্রেণীবর্ণীয় পরিবারে মেয়েদের গৃহশ্রম না করাটাই একটা অহঙ্কারের বিষয়। চন্দ্রলেখার ব্রাহ্মণ্য ব্যবস্থা সম্পর্কে ঘৃণা (বিশেষত ব্যক্তিগত সম্পত্তি নিয়ে অস্বস্তির কাহিনী) সর্বজনবিদিত। আমরা ধরেই নিতে পারি, যে গৃহশ্রমের প্রাত্যহিক অবমাননার দিকটি দেখানোই তাঁর উদ্দেশ্যো, শ্রমকে ছোট করা দেখানো নয়। তবু তিনি একজন রাজনৈতিক ভাবে সচেতন এবং প্রগতিশীল নৃত্যকার বলেই জানতে ইচ্ছে করে, যে সাধারণ নারীর অসাধারণত্ব নিয়ে তিনি নাচ তৈরি করলেন, তাকে তিনি কত গভীরে চিনেছিলেন। অস্বস্তি থেকে যায় ‘শ্রী-তে এই ছবিটি বেছে নেওয়াকে মেনে নিতে গেলে। উচ্চ/মধ্যবিত্তের জীবনে যখন তার ‘অধস্ত্বন’দের সাথে, তার গৃহশ্রমিকদের সাথে তার সামাজিক সম্পর্ক ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে, আবার তার বিপরীতে প্রতিবাদের নতুন-নতুন ক্ষেত্রও তৈরি হচ্ছে, তখন শ্রমকে সরলরৈখিক ভাবে একটি সমস্যা হিসেবে পরিবেশনা করা, কে সেই শ্রম করে, কে সেই শ্রমের ফল ভোগ করে, শ্রম প্রসঙ্গে সমাজের সর্ব শ্রেণীবর্ণের মেয়েরা এক অবস্থানে রয়েছেন কি না, সে আলোচনার উপর সম্পূর্ণ চাদর ঢেকে দেওয়াই এই অস্বস্তির কারণ।৫,৬ প্রশ্ন থেকে যায়, যে পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিকল্প যে নারীশক্তির ছবি চন্দ্রলেখা তুলে ধরেন, তা কোন নারীর কথা মাথায় রেখে? যেহেতু এক-দুটি জায়গা ছাড়া ‘শ্রী’-র অনুষ্ঠান সেই শহরকেন্দ্রিক উচ্চ/মধ্যবিত্ত পরিসরেই হয়েছিল, এই প্রশ্ন হয়তো সেভাবে উঠেও আসেনি কখনও। অবশ্য এই প্রশ্নের উত্তর যে চন্দ্রলেখাকে তাঁর নাচের ভিতর দিয়েই দিতে হত, তা নয়। কিন্তু এ প্রশ্নগুলো আমাদের আলোচ্য প্রসঙ্গের প্রেক্ষিতে এই প্রগতিশীল নৃত্যকারদের কাজের সমালোচনা প্রসঙ্গে উঠবেই না, এতেও তো আমাদের মন ভরে না।

• উদাহরণগুলির নিরিখে সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়ের সঙ্গে নৃত্যকারের ব্যক্তিগত মানবিক সংযোগ

তিনটি নাচ নিয়ে আলোচনার শেষে একটি প্রশ্ন আবার করে তুলছি – সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে নাচ তৈরি করার সার্থকতা কোথায়, যদি না তাকে এমন দর্শকের কাছে নিয়ে যাওয়া যায়, যাঁর জন্য ঐ সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয় আদতেই অর্থবহ? না শিল্পসৃষ্টি, না সামাজিক-রাজনৈতিক সমস্যা – কারুরই সার্থকতা দূর থেকে তত্ত্ব হিসেবে নয়। জীবনের সাথে গভীরে জুড়ে না থাকলে এসবই অর্থহীন। সেই জায়গা থেকে এই তিনটি প্রবাদপ্রতিম কোরিওগ্রাফি অর্থবহ হয়ে উঠতে পারেইনি বলাটা হয়তো ভুল হবে। কিন্তু তাদের সীমাবদ্ধতার দায়ও প্রগতিশীল কনটেম্পোরারি নৃত্যকারদের স্বীকার করতে হবে। আবার সাথে-সাথে এজাতীয় বিচ্ছিন্নতাজনিত সমস্যা ও তার সমাধানের পথসন্ধানকে নৃত্য গবেষণার ভিতরে অন্তর্ভুক্তও করাটাও তাঁদেরই কাজ।

সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়ে কনটেম্পোরারি নাচ, নাচের পুনর্গঠন, নতুন নাচ তৈরি – এই নিয়ে গবেষণামূলক প্রকল্পের প্রয়োজন আমাদের দেশে রয়েই গেছে। ‘শ্রী’, ‘লেবার অ্যান্ড মেশিনারি’ – এইরকম কিছু কিছু কাজের পুনর্গঠন করা হয়েছে বটে, কিন্তু সে গবেষণা মূলত কোরিওগ্রাফির ফর্মকে কেন্দ্র করে, সময়ের সাথে-সাথে বিষয়ের সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে নয়। তার উপর রয়েছে নাচ নিয়ে এদেশে যথাযথ অ্যাকাডেমির অভাব। তাই এদেশে নতুন কাজ শুরু করা অনেক সমসাময়িক নৃত্যস্রষ্টা হয়তো জানতেই পারেন না যে তিনি যেভাবে ভাবনাচিন্তা করছেন, তা পূর্বতন কোনো নৃত্যকারের চিন্তাধারার পুনরাবৃত্তি হয়ে দাঁড়াচ্ছে কিনা, বা ভারতীয় নাচের ইতিহাস থেকে তিনি তাঁর ভাবনার জন্য কতখানি রসদ সংগ্রহ করতে পারেন। অর্থাৎ তিনি কনটেম্পোরারি নাচের ধারাবাহিকতায় নিজের অবস্থান খুঁজে পান না, কারণ এই নাচের ইতিহাস তাঁর কাছে অস্পষ্ট-অজানা থাকে। ভাগ্যে থাকলে দৃশ্যমানতার ইতিহাস বলতে হয়তো পাওয়া যায় ক’টি ভিডিও, আর সৃজনশীলতা ও রাজনৈতিকতার সম্পর্কের ইতিহাস হিসেবে হয়তো অল্প ক’টি লেখা বা উদ্ধৃতি মাত্র সম্বল। এর ফলে নাচের বিষয়গত বহমানতা থমকে যায়। নাচ সম্পর্কহীনতার শিকার হয়। নাচের মত একটা জিনিস, যা বহমান গতি ও নানা পারস্পরিক সম্পর্ক (শিল্পী-শিল্পী, শিল্পী-দর্শক, দর্শক-দর্শক, ইতিহাস-বর্তমান, শরীর-মন-স্মৃতি,…) – এসবের উপর গভীর ভাবে নির্ভরশীল, তার পক্ষে এটা একটা বড় রকমের ক্ষতি। নাচের ইতিহাসে সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়ের উপস্থিতির ইতিহাসকে বুঝতে চাওয়াটা এই ক্ষতিকে সামান্য হলেও পূরণ করার চেষ্টার মধ্যেই পড়ে।

নৃত্যশিল্পী ও গবেষক অনন্যা চ্যাটার্জি কোরিওগ্রাফার চন্দ্রলেখা ও জাওলে উইলা জো সোলার সম্পর্কে লেখেন – “তাঁদের কাজের মধ্যে দিয়ে আমি নৃত্যনির্মাণের প্রক্রিয়ায় যে মৌলবাদবিরোধী, প্রগতিশীলতার প্রতি দায়বদ্ধ সৌন্দর্যবোধ খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম, তার সন্ধান পাই, কারণ এইজাতীয় [সৃজনশীল] প্রতিক্রিয়াগুলো সবসময় পরিবর্তনশীল ঐতিহাসিক প্রসঙ্গের পরিপ্রেক্ষিতেই উঠে আসে।” ভারতীয় শহুরে সমসাময়িক নাচের প্র্যাকটিশনার হিসেবে আলোচ্য তিনজন নৃত্যকারের (কিছু-কিছু) কাজে আমি নিজেও একই ভাবে উপকৃত। আর উপকৃত বলেই নিজের মধ্যবিত্ত নাচিয়েজীবনের পূর্বকথিত অন্তর্দ্বন্দ্বের সমাধান খুঁজতে চেয়ে আমি এই কাজগুলোর কাছে ফিরে আসছি। সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়ের জটিলতা শিল্পকে কতদূর অব্দি প্রভাবিত করতে পারে – এটা বুঝতে চেয়ে আমি এবার এসে পড়ছি এই প্রশ্নে যে ঐ একই জটিলতা ব্যক্তি-শিল্পীকে মানুষ হিসেবে কতদূর প্রভাবিত করতে পারে।
এই তিনটি কাজের সারসংক্ষেপ হিসেবে এটুকু বলাই যায় যে তিনজনই উল্লেখিত কাজগুলির ভিতর দিয়ে শোষণ থেকে মুক্তির কথা বলেছেন। কিন্তু পদ্ধতি ও নীতিগত দিক থেকে, রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে, তাঁরা সেই মুক্তির প্রকাশের সাথে নিজেদের জীবনকে কতটা এক করে দেখেছেন? দেখার কোনো প্রয়োজন রয়েছে কি আদৌ?

হ্যাঁ, কাজগুলো থেকে এটা প্রমাণ হয়, যে তাঁরা এই বিশেষ সামাজিক সমস্যাগুলো নিয়ে সচেতন। এও মনে হয়, অন্তত বিমূর্ত তত্ত্ব হিসেবে, এই সমস্যাগুলোর প্রগতিশীল, সমানাধিকারমুখী সমাধানেই তাঁরা বিশ্বাসী। কিন্তু এটা বোঝা যায় না, যে এই সমস্যাগুলোকে ঘিরে যে সামাজিক আন্দোলন, তার সাথে তাঁদের আত্মিক যোগ কতখানি। উপরোক্ত শাঁখের করাত বা নৃত্যকারের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বোধ বনাম সামাজিক-রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিজম – এজাতীয় সমস্যা কি তাঁদেরও কোনো মুহূর্তে তাড়িত করেছিল?

(৫) মানুষের কণ্ঠ বনাম শিল্পের কণ্ঠ

একটা জিনিস খেয়াল করতে হয়। শ্রেণী, জাতি, লিঙ্গ – এর মধ্যে লিঙ্গবৈষম্যবিরোধী আন্দোলন বা নারীর অধিকারজনিত আন্দোলন যেহেতু দেশের উচ্চ/মধ্যবিত্ত সমাজে সবচেয়ে বেশি প্রতিষ্ঠিত, হয়তো সেই কারণেই এই তিনটি বিষয়ের মধ্যে নারীর ক্ষমতায়ন পরবর্তী আধুনিক নৃত্যশিল্পীদের কাজের বিষয় হিসেবে সবচেয়ে বেশিবার দেখা দিয়েছে। এটাও খেয়াল করতে হবে যে, বর্তমান উচ্চ/মধ্যবিত্ত শহুরে সমাজে ‘লিঙ্গের সমানাধিকার’ নিয়ে কাজ করা সবচাইতে রিস্ক-ফ্রি, এবং তা এই শ্রেণীর শ্রেণীস্বার্থকে বড় একটা চ্যালেঞ্জ করে না। সামাজিক-প্রশাসনিক-সাংস্কৃতিক অবদমন, যৌন অবদমন, রক্ষণশীলতা ইত্যাদি উচ্চ/মধ্যবিত্ত নারীকেও পীড়ন করে। তাই কনটেম্পোরারি নাচে অধিকারধর্মী বিষয় হিসেবে নারীর অধিকার সংক্রান্ত প্রতিবাদকে বেছে নেওয়া একটি সাধারণ ঘটনা হয়ে উঠেছে। এমনকি মার্গীয় নাচের ক্ষেত্রেও যে শিল্পীরা খানিকটা অন্য রকমের চিন্তা করেন, তাঁদের নাচে এর প্রতিফলন দেখা দিতে শুরু করেছে। আমরা ‘তোমারি মাটির কন্যা’ নিয়ে আলোচনার সময়েও বলেছি, কীভাবে তার নৃত্যরূপে জাতি সংক্রান্ত কাহিনীর ভিতরেও নারীবাদই প্রাধান্য পেয়েছে। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, যে শ্রেণী-জাতি-লিঙ্গের মধ্যে লিঙ্গ-সম্পর্কিত বিষয়ের ক্ষেত্রে নৃত্যকারদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা বোধ সবচাইতে কম।

শ্রেণী ও জাতির ক্ষেত্রে এই বিচ্ছিন্নতা বোধ অনেক গভীর এবং তার দায় গোটাটা নৃত্যকারদের উপরে চাপিয়ে দেওয়াও যায় না। তিনটি নাচের আলোচনার ভিতর দিয়ে সেই বিচ্ছিন্নতার কিছু উদাহরণ দেওয়ার চেষ্টা করেছি। বিচ্ছিন্নতার নানান ধরনের কিছু-কিছু এই লেখার বিভিন্ন জায়গায় উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে তাদের একত্রিত করে একটি তালিকা বানানো হল।

• নৃত্যকার বনাম ‘সাধারণ মানুষ’ – নানান দ্বন্দ্ব

এর কয়েকটি ধরন আছে। যেমন :

অপরায়ন, অপরকে ঘিরে রোমান্টিকতা, ভিলেন বানানো বা ঠাট্টার বিষয় করে তোলা: রুস্তম ভারুচার মতে এমনকি শ্রেণী-সচেতনতার পরাকাষ্ঠা আইপিটিএ-র কাজ ও গ্রামীণ কৃষক শ্রেণী এবং আদিবাসীদের নিয়ে রোমান্টিকতা এবং জাতীয়তাবাদী অতিসরলীকরণ দোষে দুষ্ট ছিল। পরেও সমসাময়িক নৃত্যশিল্পীদের কাজে এই দোষ খুব বেশিমাত্রাতেই দেখা যায় – বিশেষত শহুরে অশুদ্ধ লোকনৃত্যের বাড়াবাড়িতে। সম্পূর্ণ অকারণে হাসিখুশি গ্রামবাসী সেজে শিল্পীরা আজও এসে কৃষি-উৎসব বা অন্যান্য গ্রামীণ উৎসব উদযাপনের নামে সহজতালে নেচে যান – এই কৃষক আত্মহত্যার বাজারেও। আবার উল্টোদিকে কখনও কখনও নাচের ভিতর আনপড়, চাকচিক্যহীন শ্রমজীবী পুরুষকে নারীলোভী, নারীবিদ্বেষী শোষক হিসেবে দেখানো হয়। কখনও বা কোনো নৃত্যনাট্যে এইজাতীয় ‘অপরায়ন’ ঘটে এই মানুষদের মূর্খ, হাসিঠাট্টার পাত্র হিসেবে দেখানোর মধ্যে দিয়েও। কারণ বেশিরভাগ নৃত্যকারদেরই এই অপর সম্পর্কে কোনো প্রত্যক্ষ ধারণা বা অনুভূতি নেই।

বিদেশি প্রভাব: পাশ্চাত্যে উচ্চ/মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সাধারণ মানুষের জীবনে প্রাত্যহিক শ্রেণীদ্বন্দ্বের ধরন এদেশের তুলনায় আলাদা এবং কম দৃশ্যমান। ভারতীয় কনটেম্পোরারি নৃত্যশিল্পীদের মধ্যে শুরুর থেকেই ক্রমশ একজাতীয় পাশ্চাত্যমুখী ভাব গড়ে উঠেছে – যার খানিকটা হয়েছে অর্থনৈতিক কারণে, আবার এদেশে যথাযথ গঠনমূলক সঙ্গ ও সমালোচনার অভাবের কারণেও। ফলে এদেশের শ্রেণীদ্বন্দ্ব নিয়ে শিল্পসৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা বা প্রাসঙ্গিকতা কমে গেছে।

আধুনিক-আধুনিকোত্তর (মডার্নিস্ট-পোস্টমডার্নিস্ট) নাচে ইংরিজি ভাষা ও বিমূর্ততার প্রভাব: কনটেম্পোরারি নাচের প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসে দেখা গেছে, তার প্রশিক্ষণ পদ্ধতিতে নিম্ন শ্রেণীবর্ণ থেকে আসা মানুষদের – হয়তো সচেতন ভাবে না চেয়েও – অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। এর একটা বড় কারণ এই নৃত্যসমাজে ইংরিজি ভাষার ব্যাপক ব্যবহার এবং সাধারণ ভাবে এতে অংশ নেওয়া উচ্চশিক্ষিত বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠীর সংখ্যাধিক্য এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে এই শ্রেণীবর্ণের মানুষদের শিক্ষার অধিকারের অভাব। যথাযথ প্রশিক্ষণ পেলে যেকোনো শরীর যেকোনো গতিকে অনুকরণ করা শিখতে পারে – এটাই যদিও আমাদের বিশ্বাস, তাও প্রতিদিনকার প্রশিক্ষণ ক্ষেত্রে ইংরিজি ভাষা ও আলাপ-আলোচনার ক্ষেত্রে এক ধরনের উন্নাসিকতা ও বুদ্ধিজীবী ভাব সব মানুষকে হয়তো সমান ভাবে কাছে টেনে নেয় না। সমসাময়িক নাচের অকাহিনিধর্মিতা ও বিমূর্ততাও হয়তো এতে একটা ভূমিকা নেয়। শিল্পে বিমূর্ততার ইতিহাসের সাথে একেবারে পাঠগত পরিচয় না থাকলে সেটাও একটা বাধা হয়ে হয়ে দাঁড়াতেই পারে, দাঁড়ায়ও। আবার এই তথাকথিত নিম্ন শ্রেণীবর্ণের মানুষের সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনে এবং ক্ষমতায়নের ইতিহাসে ‘কাহিনী’ যে গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী ভূমিকা নিয়ে থাকে, তাও হয়তো অনেককে এই বিমূর্ততা থেকে দূরে ঠেলে দেয়। রঞ্জাবতী সরকার একটি সাক্ষাৎকারে আধুনিক নাচে অনুভূতির স্থান প্রসঙ্গে এই সমস্যার সরাসরি সমালোচনা করেছিলেন –“মডার্নিজম বা আধুনিক শিল্পকে মানুষের মানুষিপনাকে অস্বীকার করতে হবে, বিমূর্ততাকে বাস্তবকে অস্বীকার করতে হবে – এটা এতই বস্তাপচা একটা ধারণা!”১০

সমাজের চোখে নাচের অনৈতিকতা: এতক্ষণ যা বলা হল, তার বিপরীতে আবার রয়েছে নাচ নিয়ে মানুষের বহু রক্ষণশীল পিতৃতান্ত্রিক ধারণা, যে নাচ একটি শস্তার বিনোদন এবং নৃত্যশিল্পীরা অনৈতিক জীবনযাপন করেন। আবার অনেকে মনে করেন নাচ সর্বদাই প্রতিষ্ঠানের পক্ষে থাকা অপ্রগতিশীল, অরাজনৈতিক একটি শিল্প – একটা বড়লোকি ব্যাপার, যা সমাজের নিম্ন বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের হাতের বাইরে, অতএব যা কোনো রাজনৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশমাধ্যম হয়ে উঠতেই পারে না।

• প্রগতিশীল আন্দোলন বনাম নাচ

প্রগতিশীল, বা বিশেষত বামপন্থী রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কর্মীদের ভিতর কখনও-কখনও এই ভাবটা দেখা যায় যে গণসংস্কৃতি কি, বা রাজনৈতিক শিল্প কাকে বলে সেটা তাঁরাই সবচাইতে ভালো বলতে পারবেন। অ্যাজিটপ্রপ থিয়েটার বা কিছু কিছু লোকনৃত্যের ফর্ম একদা বামপন্থী আন্দোলনের সাংস্কৃতিক মুখ হয়ে উঠেছিল; শ্রেণী-লিঙ্গ নির্বিশেষে রাজনৈতিক কর্মীরা তাতে ভাগও নিয়েছিলেন। কিন্তু আধুনিক নাচের ক্ষেত্রে তা হয়নি। উচ্চ শ্রেণী-বর্ণ থেকে আসা নেতৃবর্গের বৃহদংশের “বুর্জোয়া স্ট্যান্ডার্ড অফ রেস্পেক্টেবিলিটি ইনটু সোশ্যালিস্ট থট” আধুনিক নাচকে অন্য কিছু-কিছু শিল্পের মত আপন করে নিতে পারেনি – এরকম কেউ-কেউ মনে করেছেন।১১ যেকোনো শ্রেণী-বর্ণভিত্তিক সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনে নাচের অধস্ত্বনতা আজও বর্তমান।

• নাচে ভারতীয় হিন্দু মিথোলজির ঐতিহ্য

কনটেম্পোরারি নাচ যদিও সমসাময়িক বিষয়কে খুঁজতে চায়, এর ফর্ম, কাহিনীর ব্যবহার, রূপকের ব্যবহার ইত্যাদি প্রায়ই মার্গীয় নাচে এবং হিন্দু মিথোলজিতে ফিরে ফিরে যায় (হিন্দু ব্যতীত অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষদের ভিতর এ দেশে এই নাচ কতটা এবং কীভাবে বিস্তার লাভ করেছে, তা একটি আকর্ষণীয় বিষয় হলেও সীমিত জ্ঞানের কারণে এই লেখায় তাকে ধরা যাবে না)। হ্যাঁ, বহু পৌরাণিক বা অন্যান্য মিথোলজিকাল চরিত্র সমসাময়িক শিল্পীদের হাতে পড়ে নতুন রূপ পায়, চরিত্রের পুনর্নির্মাণ ঘটে, পুরনো কাহিনীগুলোকে বর্তমান নানা সামাজিক প্রশ্নের নিরিখে দেখা হয়। কিন্তু আবারও, তার বেশিটাই লিঙ্গ আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ঘটে। শ্রেণী-জাতি প্রশ্ন খুব বেশি উঠে আসে না। উল্টে আগেই যেমন বলা হল – নৃত্যনাট্য জাতীয় পারফর্মেন্সে কখনও কখনও নিম্নবর্গের মানুষকে ‘ভিলেন’ হিসেবে – নারীধর্ষক বা পরিবেশধর্ষক হিসেবে ভাবা হয়। খানিকটা হলেও এটা মার্গীয় নাচে (সমসাময়িক নাচিয়েদের মধ্যে অনেকের নাচের ভিত্তি যেখানে) ও তাতে ব্যবহৃত হিন্দু মিথোলজির (যার অনেকটাই উচ্চবর্ণীয় রাজারাজড়া ও সাধুসন্ন্যাসীদের নিয়ে লেখা) ব্রাহ্মণ্যবাদী ভিত্তির কারণেও ঘটে থাকে। আসলে আমাদের রূপক তৈরির চিন্তাপদ্ধতিতেই শ্রেণীবিরোধ-জাতিবিরোধী ধরন ঢুকে বসে আছে।

• শিল্পজগতে আধুনিক নাচের গোলমেলে অবস্থান

নাচকে এমনিতেও অন্যান্য নানা শিল্পের ফর্মের মত সাধারণ ভাবে শিক্ষণীয় বলে ধরা হয় না। চিত্রশিল্প-স্থাপত্যশিল্প জাতীয় ক্ষেত্রের মত নাচের কোনো সরাসরি বিনিময় মূল্য নেই। তার উপর এর শারীরিক শ্রমের আবশ্যিকতা, উপরিকথিত বিমূর্ততা, প্রাত্যহিক জীবন থেকে দূরত্ব এবং নাচকে ঘিরে নানা নৈতিক প্রশ্ন – সমস্ত মিলিয়ে কনটেম্পোরারি নৃত্যকাররা শুধু যে সমাজের এক অজ্ঞাত কোণায় বাস করেন, তা-ই নয়, এমনকি শিল্পজগতেরও একটি অজ্ঞাত কোণাতেই বাস করেন। যেন নৃত্যকারদেরকেই একটি ‘নিম্ন সাংস্কৃতিক শ্রেণী’তে ঠেলে দিয়ে মূল্যায়ন করা হয় – শিল্পের ব্যবহারিক মূল্য, লগ্নি মূল্য ইত্যাদির প্রেক্ষিতে। এইসব মিলিয়ে দেখলে দুঃখের সাথে বলতে হয়, কনটেম্পোরারি নাচ যেমন হয়তো জনগণের কণ্ঠস্বর যথেষ্ট মন দিয়ে শুনতে পাচ্ছে না, তেমন জনগণ – এমনকি শিল্পভাবাপন্ন জনগণও সমসাময়িক নাচের কণ্ঠস্বর খুব শুনবার চেষ্টা করছে – এমনটা নয়। এ এক ভিশাস সাইকল।

(৬) নাচে সামাজিক-রাজনৈতিক প্রগতিশীল বিষয় : কিছু অন্য ধরনের উদাহরণ

যে তিন নৃত্যকারের সামাজিক অবস্থান ও কাজের বিষয়ের ভেদ নিয়ে আলোচনা করা হল, তা এই তিনজনের জন্য বিশেষ কোনো ভেদ নয়, বরং আমাদের বেশিরভাগের জীবনেই এই ভেদ নানা চেহারায় উপস্থিত। সাধারণ ভাবে ভারতীয় শহরকেন্দ্রিক কনটেম্পোরারি নৃত্যকারদের সাথে প্রগতিশীল সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়ের সম্পর্ক এইরকমটাই, যার ফলে শ্রেণী ও জাতিদ্বন্দ্ব নিয়ে নাচের ক্ষেত্রে অর্থবহ কথোপকথন এই তিনজনের আমলেও যেমন বিরল, এখনও তাই। বরং, উচ্চ/মধ্যবিত্তের সমাজ ও রাজনীতি-বিচ্ছিন্নতা এখনকার নাচে অনেক বেশি মাত্রায় প্রতিফলিত হয়।

যদিও কিছু কিছু বিক্ষিপ্ত কাজে সরাসরি শ্রেণী ও জাতি নিয়ে সচেতন কাজের একটা চেষ্টা দেখা যায় বলে আমার মাঝে মাঝে মনে হয়েছে। শ্রমজীবী মানুষের শোষণ প্রসঙ্গে কয়েক বছর আগে তৈরি ব্যাঙ্গালোরবাসী দীপক কুর্কি শিবস্বামীর ‘এন এইচ সেভেন’-এর কথা মনে করা যায়, যেখানে চেন্নাই-ব্যাঙ্গালোর জাতীয় সড়কে নির্মাণ শ্রমিকদের জীবনের যন্ত্রণা-অপমান উঠে আসে। তবে বর্তমান সমাজ-অর্থনীতিতে শ্রমিকের শ্রমের মূল্য ও জীবনের মূল্য দুইই নগণ্য – এই সমালোচনা যেমন এই কাজটিতে রয়েছে, তেমনি আবার সমাজের ক্ষমতাকেন্দ্রের কাছে হার স্বীকারই এক অবধারিত সত্য – এই হতাশাও এই কাজটা থেকে উঠে আসে। জাতি নিয়ে কাজ বলতে চেন্নাইয়ের অখিলার ‘তীন্ডা তীন্ডা’র (ভাবানুবাদে ‘যখন কাছে আসি…’) কথা উল্লেখ করা যায়, যা তামিলনাড়ুর অস্পৃশ্যতা ও ‘অনার কিলিং’-এর কথা বলে।১২ এখানে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে অখিলা শহুরে কনটেম্পোরারি নাচে অভ্যস্ত দর্শকের গণ্ডীর বাইরে গিয়ে তামিলনাড়ুর মফস্বল শহরে, তামিলভাষী ছাত্রসমাজে এই নাচ দেখাবার চেষ্টা করছেন। সমসাময়িক নাচ কি, তামিলে তার পরিভাষা নির্মাণ এবং রাজনৈতিক বিষয় ঘিরে তার ভূমিকা কি হতে পারে, এই নিয়ে তাঁর মনে একটা খোঁজ রয়েছে। তবে এজাতীয় কাজ সমসাময়িক নাচে বিরল। মূল সমস্যা হল, যাঁরা এইভাবে ভাবছেন, বা কাজ করছেন, তাঁদের একত্রে এসে আলাপ-আলোচনা, পরস্পরের কাজকে প্রভাবিত করা বা একসাথে কাজ করার এখনও পর্যন্ত তেমন কোনো জায়গা বা সুযোগ নেই। প্রত্যেকেই আলাদা ভাবে নিজের নিজের দর্শক খুঁজে বার করার চেষ্টা করছেন।

(৭) নৃত্যকার বনাম নৃত্যকার : কিছু কূটকচালি

উপরে প্রশ্ন করেছিলাম, রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে আলোচিত তিন নৃত্যকার তাঁদের কাজে শোষণ থেকে যে মুক্তির কথা বলেছেন, সেই মুক্তির প্রকাশের সাথে নিজেদের জীবনকে তাঁরা কতটা এক করে দেখেছেন, বা দেখার কথা তুলবার আদৌ কোনো প্রাসঙ্গিকতা আছে কিনা। এই প্রশ্নের উত্তর এবং লেখার শুরুর দিকে এক বিকল্প নৃত্যগোষ্ঠী বা যূথ গড়ে তোলার প্রসঙ্গে যা বলেছিলাম – তা মোটামুটি একই। কিন্তু এ তো শুধু সৃজনশীলতার কথা নয়, ব্যক্তিমানুষের ব্যক্তিগত দর্শনে বদল আনার কথা। ব্যক্তিস্বার্থ এবং ব্যক্তি-রাজনীতির উর্ধে উঠে দলবদ্ধ ভাবে অধিকারের দাবি রাখার কথা। অর্থাৎ, যে সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়কে আমরা আমাদের কাজে ব্যবহার করছি, তার মতাদর্শের সাথে নিজের মতাদর্শ মিলিয়ে দেওয়ার কথা।

তাই লেখার শেষে এই ব্যক্তি-শিল্পীদের নিয়ে এই প্রসঙ্গে কিছু কূটকচালি করব। এই কূটকচালিও আসলে এই বিশেষ তিনজনকে উদ্দেশ্যো করে নয়। বরং এঁদের সমতুল্য সামাজিক অবস্থানে থাকা আমাদের মত বহু কনটেম্পোরারি নাচিয়ের জীবনধারণ ও কাজের বিষয়ের মতাদর্শগত ভেদকে উদ্দেশ্যো করে। এক অর্থে নিজের মুখ আয়নায় দেখা।

যে তিনজন নৃত্যকারের কাজ নিয়ে এখানে মূলত কথা বলা হল, তাঁদের মধ্যে উদয়শঙ্করের মূল বছরগুলো অন্য দুজনের আবির্ভাবের অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। তাঁর নৃত্যধারা ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার সূত্রে মঞ্জুশ্রী চাকী সরকারের নাচকে প্রভাবিত করেছিল। ভাবতে মজা লাগে, যদি এই দুই কলকাতাবাসী নৃত্য-মহারথী সমসাময়িক হতেন, তাহলে তাঁদের মধ্যে কাজের ও ভাবনার আদানপ্রদান থাকত কিনা। মনে হয়, না। সবচাইতে বড় যে জায়গায় তাঁদের কাজের বা ভাবনার ধরন আলাদা, তা হল নারীবাদী ভাবনার দিক। অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন সময়ের স্কেলে কাজ করার ফলে এই ভিন্নতা স্বাভাবিকই, কিন্তু এটা শুধু নারীবাদ কার সময় কতটা বিকশিত হয়েছিল, তার প্রশ্ন নয়, রাজনৈতিক প্রবণতার প্রশ্ন। একই ভিন্নতা উদয়শঙ্কর এবং চন্দ্রলেখার কাজের তুলনাতেও। মঞ্জুশ্রী ও চন্দ্রলেখার কাজে সবল, ঋজু নারীশরীর মুখ্য। উদয়শঙ্কর এটা নিয়ে সেসময়, বা পরেও, খুব বিশেষ ভাবে ভেবেছিলেন বলে মনে হয় না। এই অত্যন্ত ক্যারিশমাটিক পুরুষ নৃত্যকার, যাঁর কোরিওগ্রাফিতে মেয়ে নাচিয়েরা সেজেগুজে স্টেজ থেকে প্রায়ই দর্শককে উপলক্ষ্য করে মিষ্টি করে হেসে-হেসে নাচতেন – মনে হয় না তাঁর সাথে মঞ্জুশ্রী চাকী সরকার বা চন্দ্রলেখার মতাদর্শের মিল হত। বিশেষ করে শোনা যায়, মঞ্জুশ্রী ও চন্দ্রলেখা দু’জনেরই নাকি স্টেজে মেয়ে নাচিয়েদের ‘অকারণে’ মিষ্টি হাসি দেখলে গা-পিত্তি জ্বলে যেত।

উদয়শঙ্করের সাথে বাকি দুজনের সম্পর্কর বিষয়টি পুরোপুরি স্পেকুলেশন হলেও, মঞ্জুশ্রী আর চন্দ্রলেখা কিন্তু সমমনস্ক হওয়ার সাথে-সাথে সমসাময়িকও ছিলেন এবং তাঁদের দেখাও হয়েছিল। দু’জনেই তাঁদের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো তৈরি করতে শুরু করেন আশির দশক থেকে। পাশ্চাত্য নারীবাদের দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ঢেউ-এর মিলনস্থল সেটা। লিঙ্গবৈষম্যের মাইক্রোপলিটিক্স তদ্দিনে নারী-আন্দোলনের সামনে এসে পড়েছে। নানা ধাঁচের ব্যক্তি-রাজনীতি উঠে এসেছে শ্রেণী-জাতি আন্দোলনের উপরিতলেও। আবার আইপিটিএ-ও এই সময়ে এসে প্রায় থমকে যাচ্ছে। বড়মাপের সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনের ছত্রছায়ায়, বাধ্যতামূলক ভাবে দলস্বার্থে সৃজনশীল কাজ করবার যে সীমাবদ্ধতা – তাই নিয়ে ভারতীয় সমসাময়িক নাচ খানিকটা বিরক্তি-আশাভঙ্গে ভুগছে, নতুন ভাবে সামাজিক অংশগ্রহণের রাস্তা খুঁজছে। অতএব, যৌথতার উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে অনেক নৃত্যকারই এমন স্পেসে, এমন পদ্ধতিতে কাজ শুরু করেন, যা তাঁদের নাচ সংক্রান্ত ব্যক্তিগত আশা-আকাঙ্খা-অন্বেষণকেই প্রাধান্য দিতে থাকে, যূথের সন্ধানকে নয়। এরকম একটা সময়ে এই দুই প্রখর নারীবাদী নৃত্যকারের পথ কয়েকবার ঘটনাচক্রে মিলে যায়। যেমন ১৯৮৫-তে বম্বের দ্বিতীয় ইস্ট-ওয়েস্ট ডান্স এনকাউন্টারে। শোনা যায়, এই মিলন খুব একটা সুখের হয়নি। চন্দ্রলেখা সমেত আরও কয়েকজন ডেলিগেট মঞ্জুশ্রী চাকী সরকারের কাজে কাহিনিধর্মিতার ‘বাড়াবাড়ি’ নিয়ে কড়া সমালোচনা করেন। এই ‘বাড়াবাড়ি হয়তো তাঁর কাজে ছিল, যা রাবীন্দ্রিক নৃত্যনাট্যের সাথে তাঁর আত্মিক ও কোরিওগ্রাফিক সংযোগ থেকেও এসে থাকবে; এটা সাধারণ ভাবেও সত্যি যে অকাহিনিধর্মিতা বাংলার নাচে কখনও তেমন জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি – একদম হালের কথা হয়তো আলাদা। মঞ্জুশ্রী এই সমালোচনার জবাবে বলেন, অকাহিনিধর্মী নাচের ইতিহাস সাংস্কৃতিক ঔপনিবেশিকতার ইতিহাসের সাথে সম্পৃক্ত – এর রাজনৈতিক আলোচনায় না ঢুকে এর মীমাংসা করা যায় না। এই মন্তব্য চন্দ্রলেখার পছন্দ হওয়ার কথা না, কারণ তিনি নাচে কাহিনীর আধিপত্যের বিরোধিতার সাথে সাথে অত্যন্ত গভীরতার সাথে নিখাদ ভারতীয় নৃত্য-শরীরের সন্ধান করছিলেন।

চন্দ্রলেখার নিজের কাজের সামনে বাধা হয়ে ছিল ভরতনাট্যমের আধিপত্য এবং নারী শরীরকে তা যেভাবে পণ্যবস্তুর মত ব্যবহার করে। আবার মঞ্জুশ্রীর বিদ্রোহ ছিল রাবীন্দ্রিকতার জগদ্দল প্রাতিষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধে – রাবীন্দ্রিক নৃত্যনাট্যে নারী শরীরের (অ)ব্যবহারের বিরুদ্ধে। ফলে এক অর্থে তাঁরা একই জাতীয় বিপক্ষের মোকাবিলা করছিলেন – সাংস্কৃতিক জগতে একচেটিয়া অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক অধিকার স্থাপনকারী পিতৃতান্ত্রিক, ভেদবাদী প্রতিষ্ঠান, যা মেয়েদের সৃজনস্বেচ্ছাকে মাটিতে টেনে নামানোর চেষ্টা করে। তবু তাঁদের পথ এতটাই আলাদা হয়ে রইল, যে তাঁরা এক মাটিতে এসে সংলাপ করতেই পারলেন না। সমসাময়িক নাচকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথে তাঁদের গবেষণা ও কোরিওগ্রাফিতে পরস্পরের প্রভাব, এমনকি উল্লেখও, নেই বললেই চলে। এটা আমার শুধু যে দুঃখজনক বলে মনে হয় তা-ই নয়, এটা ব্যক্তি রাজনীতি বিষয়ে একটা বড় সমালোচনার জায়গা উন্মুক্ত করে, যা আজও ভারতের শহুরে সমসাময়িক নাচের ক্ষেত্রেই শুধু নয়, সাধারণ ভাবে সৃজনশীল শিল্পের ক্ষেত্রেও যেমন, বাম-রাজনীতি বা জাতি-রাজনীতির ক্ষেত্রেও তেমনই বর্তমান। নাচের ক্ষেত্রে সূচের আগায় করে দেওয়া সরকারি-বেসরকারি ফান্ড আর আরোই সামান্য সরকারি-বেসরকারি স্বীকৃতি, এমনকি রাজনৈতিক স্বীকৃতি নিয়েও (কে বেশি বাম, বা বেশি উদার, কে দেশের-দশের সমস্যা নিয়ে বেশি বুঝদার) তুচ্ছ কিন্তু অনমনীয় খামচাখামচি সমমনস্ক শিল্পীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পথে এক বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে সমসাময়িক নাচের প্রকৃত শত্রু কে? শ্রেণী-জাতি-লিঙ্গ – যে আন্দোলনেই আমরা জায়গা খুঁজতে যাই, যত ভাবেই নিজেদের নানা দলে ভাগ করে নিই, প্রতিটি দলের এক নিজস্ব ধামাধরা শত্রু বা আর্চ এনিমি আছে। পুঁজিবাদী দল শ্রমজীবী দলের শত্রু, উচ্চ জাতিবর্ণ নিম্ন জাতিবর্ণের শত্রু, পুরুষ নারীর শত্রু। নৃত্যকারের স্ব-পরিচয় কি? তাঁর দল কি? আগে একবার বলেছি, কীভাবে নৃত্যকার সাধারণ দর্শকের একটি বড় অংশকে তাঁর কাজ না বোঝার, কাজে উৎসাহিত না হওয়ার অপরাধে শত্রু ঠাওরান। তার উপর অংশত সামাজিক ঘটনাচক্রে এবং অংশত স্বেচ্ছায় বেছে নেওয়া একাকীত্ব কি কনটেম্পোরারি নাচিয়েদের পরস্পরের মধ্যে শত্রু খুঁজে বেড়াতেও বাধ্য করে?

হয়তো সেজন্যই ভারতীয় কনটেম্পোরারি নাচের ক্ষেত্র কখনোই তেমন ভাবে, দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যক্তি-পরিচয়কে অপ্রাধান্য দিয়ে, বৃহৎ গণতান্ত্রিক গোষ্ঠী বা যূথের আকার নিয়ে উঠতে পারেনি – আর্থিক ভাবে তো নয়ই, আদর্শের দিক থেকেও নয়। এর মুখ্য কর্মীরা – যাঁরা কাজের মধ্যে দিয়ে সমাজের অন্ধকার দিকগুলোর বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করেছেন, যেমন যে তিনজনের কথা আমরা এখানে আলোচনা করলাম – তাঁদের সাথে কাজ করা নৃত্যকর্মীদের জন্য কোনো সুষ্ঠু আর্থিক বন্দোবস্ত করে উঠতে পারেননি। এখনও ভারতে কনটেম্পোরারি নাচ নেচে স্বাভাবিক ছন্দে জীবনযাপন এক দুরূহ ব্যাপার। তবু, দলবদ্ধ ভাবে এই ব্যবস্থার প্রতিবাদ বা সমাজের কাছে শিল্পের অধিকারের দাবি রাখার সহৃদয় চেষ্টা তেমন ভাবে দেখা যায় না। হয়তো খুব ‘স্বাভাবিক’ একটা বিষয়, তবু তা খেয়াল করার মত – যে কীভাবে এই সামাজিক-রাজনৈতিক ভাবে সচেতন শিল্পীরাও তাঁদের ‘দল’-এর পরিপ্রেক্ষিতে তাঁদের নিজেদের অবস্থান গুরুবাদী ব্যবস্থার মতই একটু আলাদা, একটু উঁচুতে ধরে রাখেন। ‘লেবার অ্যান্ড মেশিনারি’তে ঝুলকালি মাখা হেরে যাওয়া শ্রমিকদের মাঝে উদয়শঙ্কর একমাত্র শুভ্রত্বক বিদ্রোহী – আগেই আলোচনা করেছি। ‘তোমারি মাটির কন্যা’-তে মঞ্জুশ্রী চাকী সরকারই মায়া এবং রঞ্জাবতীই প্রকৃতি, ‘শ্রী’তে চন্দ্রলেখাই শাকম্ভরী – আদিদেবী। অর্থাৎ যে স্পেসে, যে ধাঁচায়, যে স্বভাব নিয়ে এঁরা কাজ করছেন, তার ভিতেই যেন রয়েছে তাঁদের কাজের বিষয়ে ব্যবহৃত রাজনীতির পরিপন্থী কিছু বৈশিষ্ট্য।

লেখকদের সামাজিক-রাজনৈতিক দায়িত্বের বিষয়ে রেবেকা সলনিট একটি ছোট লেখায় খুব সহজ একটা কথা লিখেছেন –“রাজনৈতিক সংগ্রাম মানে ক্ষমতাহীনকে সহায় দেওয়া, সুন্দরকে সংরক্ষণ করা, তাই ক্ষমতা ও সৌন্দর্য – এই দুই ব্যাপারে মনোযোগ না দিলে একটা প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক সংগ্রাম বলা অর্থহীন।“ চন্দ্রলেখার ধুন্ধুমার সৃজনীশক্তি নৃত্যজগতে আয়তনের দিক দিয়ে একটি জীর্ণ পরিসরের জন্ম দিয়েছে মাত্র। রঞ্জাবতী ও মঞ্জুশ্রীর পরপর মৃত্যু তাঁদের নৃত্যনাট্যগুলোতে যে দৃঢ় নারীবাদ ও রাজনৈতিক সচেতনতার সাথে সম্পৃক্ত নতুন নৃত্যভাবনার ধারা জন্ম নিয়েছিল, তার গোড়া কেটে দেয়। উদয়শঙ্কর আলমোড়ায় তাঁর নাচের স্কুলের ছাত্রদের শিক্ষাবর্ষের মাঝপথে ছেড়ে হঠাৎ ‘কল্পনা’ বানাতে শহরে চলে আসেন। প্রসঙ্গত মনে পড়ে, রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে বেশ কিছু কাজ করেছেন নৃত্যকার কার্ট উস, যিনি উদয়শঙ্করের কাজকে প্রভাবিত করেন বলে আগেও উল্লেখ করেছি। তাঁর সম্পর্কে শোনা যায়, যে তিনি নিজে জার্মান হওয়া সত্ত্বেও, বহু অসুবিধা মাথায় নিয়ে সদলবলে নাৎসি জার্মানি ত্যাগ করেন, যাতে সরকার তাঁকে দিয়ে তাঁর দলের ইহুদি নাচিয়েদের বরখাস্ত করাতে না পারে। অর্থাৎ তিনি তাঁর ‘অধস্ত্বন’ দলকে, তাঁর গোষ্ঠীকে, ব্যক্তিগত সুবিধার উর্ধে স্থান দেন। অথচ শোনা যায়, উদয়শঙ্কর নাকি হয় ‘কল্পনা’য় যোগ দেওয়া নয় তাঁর সংসর্গ ত্যাগ করা – এই দুয়ের মাঝে তাঁর ছাত্রদের সামনে আর কোনো রাস্তা খোলা রাখেননি। অর্থাৎ সেই মুহূর্তে তাঁরই তৈরি প্রতিষ্ঠান/দল/গোষ্ঠীর চাইতে নাকি তাঁর ব্যক্তিশিল্পী-আকাঙ্খাই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

ভারতীয় সমসাময়িক নাচে প্রগতিশীল সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয় প্রসঙ্গে শেষের এই কথাগুলি হয়তো তেমন আশাব্যঞ্জক নয়। তবু আমরা শুধু যে কি শিখব, তাইতেই তো শিক্ষার ইতি নয়, কি শিখব না, তাও তো শিক্ষণীয়। তত্ত্ব থেকে যেমন শেখা যায়, কূটকচালি থেকে তার চেয়ে বেশি বৈ কম শেখা যায় না।

উল্লেখপঞ্জী

https://www.e-flux.com/journal/86/160585/four-theses-on-the-comrade
২ Indian Modern Dance, Feminism, and Transnationalism; Prarthana Purakayastha; 2014
৩ Chandralekha: Woman, Dance, Resistance; Rustom Bharucha; 1995
৪ Why I Am Not A Hindu; Kancha Ilaiah; 1996
৫ গৃহপরিচারিকার শ্রম, শ্রেণীসংগ্রাম ও মার্কসবাদ; নন্দিনী ধর; অনীক, সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ২০১৮
https://aainanagar.com/23/09/2018/পরিচারিকা/
৭ Dance Research Journal, Congress on Research in Dance, Winter 2004
৮ Rehearsals of Revolution: The Political Theater of Bengal; Rustom Bharucha; 1983
৯ Facets Probably Needs an Additional Mentor; Swar Thounaojam; Ligament; 2017
১০ Oblique: An Interview with Ranjabati; Ranjabati: A Dancer and her World; Sangeeta Datta; 2008
১১ The Problematic of Desire and Control in Cultural Action: The ‹Case› of Anil De Silva and the IPTA (1940-48) (unfinished thesis). Neloufer de Mel (as referred by Trina Bandyopadhyay)
১২ http://www.groundxero.in/07/07/2018/the-touch-of-love/

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s