নাচ শেখা, নাচ শেখানো

 

অহল্যা, ২০২০

আধা-পেশাদারি খাতে বাচ্চাকাচ্চাদের নাচ শেখাচ্ছি বছর পনেরোর উপর হয়ে গেল। মাঝেমাঝে এমন সব জায়গায় ক্লাস নিয়েছি, যেখানে নাচ শেখাবার পয়সা হয়তো পাওয়া যায়, কিন্তু শেখাতে মন হয় না, তখন শেখানোটাও খুব খারাপ হয়। আবার কোথাও হয়তো আলটপকা গিয়ে পড়েছি, কিন্তু যারা শিখতে এসেছে, তাদের সাথে এমন একটা মনের যোগ তৈরি হয়ে গেছে, যে এমনিই বারবার গিয়ে শেখাতে ইচ্ছে করেছে।

যাদের শিখিয়ে ভালো লেগেছে, তাদেরও শিখে ততটাই ভালো লেগেছে কিনা হলফ করে বলতে পারব না। অন্যের মনের কতটুকুর উপরেই বা জোর খাটে আমাদের? অথচ কাউকে ভালো করে, মন দিয়ে, ভালবেসে কিছু শেখাতে গেলে তার উপর ওই জোরটুকু থাকার দরকার হয়। ওটুকু থাকলে তখন বেশ ভালবেসে সুন্দর-সুন্দর জিনিস তৈরি করা যায়।

যাদের শিখিয়ে ভালো লেগেছে, তার একটা বড় অংশ বয়ঃসন্ধির ভিতর দিয়ে যাওয়া মেয়েরা। যাদের বয়েস দশ থেকে কুড়ির মধ্যে। সিনেমা-মিউজিক ভিডিওর কল্যাণে একরকমের নাচ এখন ঘরে-ঘরে পৌঁছে গেছে। তার মধ্যে যৌনতা আছে। পৃথিবী জয় করে নেবার একটা ভাব আছে। আমার মনে হয়, সে জয়ের ভিতর শুধুই যৌনতা নয়, তার সাথে শরীরকে যেমন ইচ্ছে চালাতে পারার একটা আনন্দ আছে, গর্ব আছে, ক্ষমতার জোর আছে। ধরা যাক, হালের খুব হিট গান ‘ও সাকি সাকি’ রিমিক্স, বা ‘আঁখ মারে লড়কি আঁখ মারে’ রিমিক্স, যা মোবাইলে চালিয়ে এই বয়েসের মেয়েরা সারাক্ষণ নেচে চলেছে। নাচবে নাই বা কেন? ‘সাকি সাকি’তে নোরা ফতেহির নাচ দেখে মনে তো হয়ই, যে তিনি তাঁর কোমর নিয়ে যা ইচ্ছে তাই করতে পারেন। যেন সত্যিই তাঁর কোমরে দুনিয়া বাঁধা আছে।

যাদের বাবা-মায়েরা হয়তো কারখানার শ্রমিক, বা ছোট ব্যবসাদার, বা ফেরিওয়ালা, বা রিকশাচালক, সেই মেয়েরা এই নাচ দেখছে, নোরার জায়গায় নিজেকে কল্পনা করে শরীর দোলাচ্ছে। তাদের কোমরে পৃথিবী তো বাঁধা নেইই। বরং তাদের রোজকার জীবনে আছে বাড়ির আত্মীয়-পরিজন থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের সহপাঠী-শিক্ষক বা পাড়ার মোড়ের প্রতিবেশী বা বাসের কন্ডাক্টর বা অচেনা রাস্তার লোক বা দেশের সরকারের চাপিয়ে দেওয়া বাধানিষেধ, অপমান, মারধোর, হেনস্থা, ধর্ষণের ভয়। আছে উচ্ছেদের ভয়, বাপমায়ের চাকরি যাবার ভয়, ইংরিজি বলতে না পারার ভয়, ফেল করার ভয়, ফীজ কম পড়ার ভয়, কিচ্ছু শিখতে না পারার ভয়, দেখতে ভালো না হবার ভয়, চাকরি না পাবার ভয়, চাকরির আগেই বিয়ে হয়ে যাবার ভয়, কখনো বিয়ে না হবার ভয়, প্রেমিকের জাত-ধর্ম না মেলার ভয় – এই ভয়ের লিস্ট বেড়ে চলবে জীবনভর। তারা ভীতু নয় মোটেই, রুখে উঠতে জানে, কিন্তু তাদের ভরসার জায়গা বড্ড কম।

‘সাকি সাকি’র নোরা বা ‘গজবন পানি নে চলি’র স্বপ্না চৌধুরী বা ‘আঁখ মারে’র সারা আলি খান হয়তো এই মেয়েদের একটা ভরসা দেন, যে যতক্ষণ নেচে চলবে, শরীর দুলে চলবে, ততক্ষণ দুনিয়াটা তার। সে দুনিয়ায় লোকের চোখ রঙিন হয়ে ওঠে শুধু মুগ্ধতায়, শাসনে নয়। সিনেমায় আমরা এইসব নাচের সুন্দর বাইরেটা দেখতে পাই, এর পিছনের খাটুনি, দুঃখকষ্ট, মান-অপমান, হেরে যাওয়াগুলো আড়ালে থেকে যায়। কিন্তু কোনো একটা শিল্পে – সে নাচ হোক, গান হোক, ছবি হোক – ট্রেনিং নিলে তখন সেই আড়ালটা সরে যায়। তখন সেই খাটুনি, কষ্ট, অপমান, হেরে যাওয়াগুলোর সঙ্গে লড়তে-লড়তে, কোমরে দুনিয়া বাঁধার চাইতেও বড় একটা কিছু পাওয়া যায়। এটা বিশ্বাস করতে সময় লাগে, নিজের সাথে নিজেকে অনেকটা সময় দিতে হয়। যে মেয়েদের কথা বলছি, তাদের জীবনে সেই সময় কোথায়?

কথা হচ্ছে, নোরা-সারা-স্বপ্না-মালাইকা-কোয়েনারা তাঁদের নাচের ভিতর দিয়ে এই কমবয়েসী মেয়েদের যে ভরসা, যে সাময়িক উদ্দাম সাহস দেন, সেই ভরসা বা সাহসটুকুও কি আমরা তাদের দিতে পারি? আমরা কি তাদের নিজের সাথে নিজে কাটানোর মতো সময় উপহার দিতে পারি? আমরা বলতে, যারা এই মেয়েদের নাচ, নাটক, গান বা ছবি আঁকা শেখাই, বা শেখাবার কথা ভাবি, যেটাকে আমরা চলতি ভাষায় বলি ‘বাচ্চাদের বা মেয়েদের সাথে কাজ করা’, তাদের কথা বলছি। হয়তো খানিকটা পারি, অনেকটাই পারি না। যেটুকু পারি, তার ভিতরেও কতটা সৎ আমাদের চেষ্টা? কেনই বা আমরা এমন কাজ করতে চাই? এই কাজে সত্যি কাজের কাজ কতটা হয়? এইসব ভাবতে-ভাবতেই এই লেখা।

তবে তার চাইতেও বেশি এই লেখা তাদের কথা ভাবতে-ভাবতে, যাদের সাথে এইরকম কাজ করেছি, যাদের আরো নাচ শেখাতে ইচ্ছে করে, সময় নিয়ে গল্প করতে আর তাদের কথা শুনতে ইচ্ছে করে, একসাথে কিছু তৈরি করতে ইচ্ছে করে। তাদের সাথে কাজ করতে-করতে আমার নতুন করে নাচ শেখা হয়, নতুন করে বোঝা হয়, যে নাচ আর জীবন কত কাছাকাছি।

 যাদের নাচ শেখাতে ইচ্ছে করে

 উত্তর ভারতের দলিত বস্তির মেয়ে রশ্মি। শান্ত, কালো, ছোট্ট, রোগা হিলহিলে। স্কুলে পড়ে। কিন্তু যখন নাচে, তখন তার শরীরের ভিতরে কোথাও একটা বিস্ফোরণ ঘটে। কোনোদিন নাচ না শিখেই তার ভিতর আছে নাচের পরিমিতি বোধ, মানে, তার নাচে কোনো বাড়াবাড়ি নেই। শরীরের নড়াচড়ায় অকারণ দেখনদারি নেই। অথচ সে নাচবার সময় নিজের শরীরের নড়াচড়াকে উপভোগ করতে জানে। ফলে তার নাচে একটা আত্মমগ্ন ভাব আছে – সাধনার মতো, বা গবেষণার মতো। এমনিতে রশ্মির বাপ-মা নেই। দাদা-বৌদির সংসারে বাস। সে বাস সবসময় খুব সুখের নয়। ওকে নাচ শেখাতে ইচ্ছে করে।

দক্ষিণ ভারতের এক চাষি পরিবারের মেয়ে গুণা। কলেজে পড়ে। এমনিতে মুখে বেশি কথা নেই। কিন্তু যেমন যুক্তির জোর, তেমনি স্মৃতিশক্তি, আর তেমনি দায়িত্ববোধ। দক্ষিণ ভারতের অনেক মেয়ের মতোই তার পারফর্মেন্সে এমন একটা লজ্জাহীন জোর আছে, যা যেকোনো শিল্পীর গর্ব হতে পারে। নিজের ক্ষমতায় আর শিক্ষকদের সাহায্যে, পড়াশুনোর পাশাপাশি এখন কাজ করছে এক পেশাদার নাটকের দলের সাথে। এটা ওর জীবনের দ্বিতীয় অভিনয়। অথচ এক বোবা মানুষের চরিত্রে ওর অভিনয় আর মঞ্চে ওর সময়জ্ঞান দেখে আমায় গায়ে কাঁটা দেয়। ওকে আরো শেখাতে ইচ্ছে করে।

পূর্ব ভারতের টুনটুনির বাবা গাড়ি চালান, কলকাতা শহরে গ্যারেজবাসী। একদম ছোটর থেকে, না শিখেই নিজে-নিজে নাচ বানায়, সারাক্ষণ নেচে চলেছে। বাপ-মা কষ্ট করে ভালো স্কুলে দিয়েছেন। কিন্তু গ্যারেজ যেকোনোদিন বেহাত হতে পারে। গ্রামে ফিরে যেতে হতে পারে। গ্রামে পরিবারের বড়রা চান না – নাচ তো দূরের কথা – টুনটুনি পড়াশুনো অব্দি শিখুক। এদিকে মেয়েটি রূপসী। কাছের লোক ছাড়া অন্যের গায়ের রঙ কালো দেখলে একটু নাক সিঁটকোয়। ওদিকে তাকে কারুর সাথে ঠিক মিশতেও দেওয়া হয় না। কারণ অন্যান্য ড্রাইভার-রিকশওয়ালা-কাজের মাসির মেয়েরা বেশিরভাগই তার মতো ‘ঝকঝকে’ নয়। আবার যে মেয়েদের বাবা-মায়েরা ড্রাইভার বা রিকশওয়ালা বা কাজের মাসি নন, তারা যদি তার বাবা কি করেন, তারা কোথায় থাকে, সেসব জানতে চায়, তখন সে কি বলবে ভেবে পায় না। এতটুকু বয়েস, অথচ অনেকগুলো জটিল প্রশ্ন ওর সামনে। মন দিয়ে নাচ শিখলে হয়তো ওর আর এইসব প্রশ্নের উত্তর দিতে অসুবিধা হবে না।

পশ্চিম ভারতের বস্তিবাসী রূপান্তরকামী তরুণ মাহী। শরীরে ছেলে, কিন্তু মনে মেয়ে। স্কুলে ‘ছক্কা-ছক্কা’ আওয়াজ ওঠে, যত না সহপাঠীদের মধ্যে, তার চেয়েও বেশি টিচারদের মধ্যে। একজন টিচার তাকে সবার সামনে অপমান করেন, গায়ে হাত তোলেন। মাহী তার দু-একজন বন্ধুকে সাথে নিয়ে প্রতিবাদ জানায়, টিচারকে ক্ষমা অব্দি চাইতে হয়। কিন্তু তার সাথে-সাথেই মাহী স্কুল ছেড়ে দেয়। তার বিশ্বাস উঠে গেছে এই শিক্ষাব্যবস্থার উপর। সে ট্রেনে-ট্রেনে তালি বাজিয়ে ভিক্ষেও করে, শ্রমিক আন্দোলন বা এনআরসির প্রতিবাদেও যায়। নাচে খুব উৎসাহ। হাতেপায়ে লালিত্য। নাচ শিখতে চায়। ওকে শেখাতে ইচ্ছে করে।

মধ্য ভারতের মেয়ে অভিরামী। ইংরিজিতে সড়গড় নয়, কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে এসেছে। একটু গুটিয়ে থাকে। মাথায় খাটো, মোটাসোটা, নড়তেচড়তে পারে না তেমন। একদু’টো নাচের ক্লাসের পর সে তার চেয়ে দেড় হাত লম্বা মেয়েদের কোমর ধরে শূন্যে তুলে দেয়, ডিগবাজি খায়, পড়ে গেলে হা-হা করে হাসে, আবার মিষ্টি করে লজ্জাও পায়। ক্লাসের শুরুতে তার মুখ দিয়ে কথা বার করা যেত না। দশটা ক্লাসের পর সে বাকি ক্লাসের হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে। কিন্তু তার সাথে ওই দশটার বেশি আর ক্লাস নেওয়া হয় না। অথচ আরো ক্লাস নিতে, আরো শেখাতে ইচ্ছে করে।

 নাচ মানে মুক্তি আর অন্যের সাথে মিলেমিশে যাওয়া

নাচ জিনিসটা নিয়ে কি করা উচিত সবসময় ঠিক বোঝা যায় না। তাকে ছবির মতো ঘরে সাজানো যায় না, গানের মতো সময়ে-অসময়ে গুনগুন করা যায় না, আর তা নিয়ে বেশি চর্চা করতে গেলে বড়রা চোখ রাঙিয়ে বলেন, “ধিঙ্গি হয়ে অতো নাচানাচি করতে হবে না! বড় হয়ে সিনেমা আর্টিস্ট হবে নাকি?”

আমার ছোটবেলায়, মানে বছর পঁচিশ-তিরিশ আগেকার কথা বলছি, স্কুলে পড়া মেয়েদের নাচ শেখা জিনিসটা অনেক মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারেই খুব ভালো ভাবে নেওয়া হত না। বিয়ের আগে তাও কোনো-কোনো পরিবার মেনে নিত। কিন্তু বিয়ের পরে নাচ চালিয়ে গেলে আপত্তি ওঠার পুরোপুরি সম্ভাবনা ছিল। শ্বশুরবাড়িতে হয়তো শুনতে হত, “শিক্ষিত বাড়ির বউ আবার ছোটলোকের বাড়ির মতো নাচে নাকি!”

এখন জানি, নাচের মধ্যে দিয়ে নিজের শরীর-মনকে চেনা যায়, মুক্ত করা যায়। ছোটবেলায় অবশ্য এসব আমরা খুব বুঝতাম না। অনেকেই, সবচাইতে সুন্দর পোশাক পরে, সবচাইতে সামনের লাইনে দাঁড়ানোর চক্করে পড়ে যেতাম। বড়রাও কেউ-কেউ তাতে ইন্ধন জোগাতেন।

শিক্ষিত বাড়ির বউদের নাকি ‘ছোটলোকের বাড়ি’র মতো নাচতে নেই। তার মানে কি, ওই যাকে ছোটলোকের বাড়ি বলা হচ্ছে, সেখানে নাচ শেখার খুব চল ছিল? একেবারেই না। নাচের স্কুলে গিয়ে নাচ শেখাটা মোটের উপর সীমিত ছিল ওই ‘শিক্ষিত বাড়ি’ বা ‘বাবুদের বাড়ি’র বাচ্চাদের মধ্যেই। তাদের বেড়ে ওঠার মধ্যে ‘সবার চাইতে ভালো হওয়া’, ‘সবার সামনের লাইনে দাঁড়ানো’, ‘নিজের খেলনা অন্যকে না দেওয়া’, ‘নোংরা মেয়েদের সাথে না মেশা’– এসব অজান্তেই অনেকটা গভীরে ঢুকে ছিল। নাচের স্কুলেও তার ছায়া পড়ত নিশ্চয়। হয়তো তারই ফল, সামনের লাইনে দাঁড়ানো বা স্টেজে সবচাইতে সুন্দর জামা পরা নিয়ে রাগারাগি, মান-অভিমান।

তাহলে কি, যেসব বাড়ির মানুষের তত শিক্ষা নেই, কারণ তত টাকা নেই, সে বাড়ির মেয়েদের নিয়ে যদি একটা নাচের স্কুল করা হয়, তবে সে মেয়েরা এমন বোকা-বোকা মান-অভিমান করবে না? করবে। তবু, সেই মেয়েরা একদম ছোটর থেকে, বাধ্য হয়েই জানে যে, জিনিস সবার সাথে সমান ভাগ করে ব্যবহার করতে হয়। ঝগড়াঝাঁটি হোক। কিন্তু মিলেমিশে থাকার দরকারটা সে বাচ্চারা যতটা হাড়ে-হাড়ে বোঝে, মধ্যবিত্ত বাড়ির বাচ্চারা তত নয়, কারণ তাদের নানান ধরনের মানুষের সাথে মিলেমিশে থাকতে হয় কম।

একটা নাচের স্কুল হল বিশেষ ধরনের এক মিলেমিশে থাকার জায়গা, যেখানে শরীরগুলি পরস্পরের খুব কাছে আসে, একে অন্যকে ছুঁয়ে-ছুঁয়ে থাকে, এক শরীর আরেককে সাপোর্ট দেয়, চিনতে শেখে। আমি যাঁর কাছ নাচ শিখেছি তিনি আমাদের হাতের আঙুল দেখলেও বলতে পারতেন কে। মেয়েদের সাথে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, কিছুদিন একসাথে কাজ করার পর তারা কেমন একে অন্যের শরীরের ব্যাপারে যত্নশীল হয়ে ওঠে। নাচের সময় একজনের শরীরের ভুল আরেকজন শরীর দিয়ে ঢেকে দিতে শেখে।

শরীরে-শরীরে যেমন বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, তেমন মনে-মনেও ওঠে। সে বন্ধুত্ব না থাকলে নাচে ভুল হয়ে যায়, শরীরগুলি একসাথে নড়তে চায় না, যে-যার মতো নেচে যায়। খালি নিজের জন্য নাচলে, দলের জন্য না নাচলে, সে নাচ দর্শককে সেভাবে নাড়িয়ে দিতে পারে না। মজার কথা হচ্ছে, আমি দেখেছি, যারা ভালো নাচে, যাদের নাচে ভীষণ সৎ একটা ব্যাপার আছে, যেটা দেখে দর্শকের মন দুলে ওঠে, তারা কিন্তু অন্যের শরীর-মনের সাথে সহজেই মিলমিশ খেতে পারে। রশ্মি, গুণা, অভিরামীদের ভিতরেও এটা দেখেছি। তারা শুধু নিজেকে চিনতে শিখেছে তাই নয়, তাদের চারদিকের অন্য শরীরগুলিকেও তারা বুঝতে পারে, তাদের দায়িত্ব নিতে পারে।

রোজকার জীবনে প্রতি মুহূর্তে কত ঘৃণা, কত অবিশ্বাসের মোকাবিলা করতে হয় আমাদের। তার ভিতর নিজেকে আর অন্যকে চেনা, বোঝা, মুক্ত করা আর দায়িত্ব নেওয়ার ছোট-ছোট ছবিগুলো নাচতে গিয়ে, নাচ শেখাতে গিয়ে বারবার চোখে পড়ে, আর আশা জোগায়। মনে হয়, এই মেয়েগুলি, যারা এমন চমৎকার নাচছে, তাদের কি স্বভাবে এই মুক্ত ভাব ছিল বলেই তারা এত ভালো নাচছে, নাকি নাচতে-নাচতে তাদের মধ্যে মুক্তি চারিয়ে যাচ্ছে? হয়তো দুটোই সত্যি।

মেয়েরা শরীর-মনকে মুক্ত করতে চায়

শরীরকে চেনা, মুক্ত করার মানেটা কি? আসলে যেকোনো প্র্যাকটিসেই অনেকদিন ধরে ট্রেনিং নিলে, একসময় ট্রেনিং-এর মজাটা দেখনদারির চেয়ে বড় হয়ে ওঠে। নাচের ক্ষেত্রে এই মজাটার মানে হল, শরীরের সাথে মনের একটা আড্ডা, একে অন্যকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়ার একটা খেলা। শরীর বলতে পারে, “আমি এখন হাঁটু ভেঙে পনেরো মিনিট ধরে হাফ বসে ভরতনাট্যম নাচব, মন, দেখি তুই তার ব্যথাটা কিকরে হ্যান্ডল করিস।“ আবার মন বলতে পারে, “আমি এখন পরপর দশখানা জটিল স্টেপ বানাব, শরীর, দেখি তুই না হকচকিয়ে গিয়ে পরপর সেগুলো করে যেতে পারিস কিনা।” আবার শরীরকে মুক্ত করার মানে এটাও হতে পারে – নিজের শরীরকে দর্শকের আকর্ষণের কেন্দ্র না ভেবে তাকে একটা বড় যন্ত্রের মধ্যে একটা দরকারি নাটবল্টু হিসেবে দেখতে পারার খেলা।

এই দু’রকমের খেলাই শরীরকে মুক্ত করে, খুলে দেয়। কারণ, দুটো খেলার মধ্যে দিয়েই মেয়েরা শরীরকে একটা মজার যন্ত্র বলে চিনতে শেখে। যার কাজ বাঁকিয়েচুরিয়ে একটা জীবন্ত ছবি তৈরি করা। এই শরীর তখন আর যৌনতার বাহক নয়। ক্ষমতার বাহক বটে, কিন্তু সেটা অন্যকে ছোট করার ক্ষমতা নয়। সৃষ্টি বা নির্মাণের ক্ষমতা।

অনেক বাচ্চা, যারা পয়সা দিয়ে নাচ শেখার বা স্টেজে নাচার সুযোগ পায় না, দিব্যি বিনা ট্রেনিং-এ নিজে-নিজেই এই মুক্তির ব্যাপারটা ধরতে পারে। তারা নিজের মনে নেচে যায় – একটু চোখ খোলা রাখলেই চোখে পড়ে – ফুটপাথে, ট্র্যাফিক সিগনালে, বাজারদোকানে। কেউ দেখছে না, আয়না অব্দি নেই, তাও নেচে চলা। শরীর নাড়িয়ে যাওয়ার আনন্দ। তারপরে একটা সময়, বিশেষ করে মেয়ে বাচ্চাদের ক্ষেত্রে, পরিবার থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয় সভ্যতা-ভব্যতার নানা আজেবাজে নিয়ম। শরীর জিনিসটা হয়ে ওঠে ভীষণ লজ্জার। তাই কুড়ি পেরোতে না পেরোতে দু’কাঁধ গোল হয়ে সামনে ঝুঁকে আসে – যেন বুকের মতো একটা লজ্জার জিনিস শরীরের সাথে জুড়ে থাকার জন্য গলায় কাপড় দিয়ে হয়ে ক্ষমা চাইছে। শরীরে পেশীর ব্যবহার এতই কম, খাওয়াদাওয়ার এতই অনিয়ম, যে কোনোক্রমে মাথাটুকু ঘাড়ের উপর ধরে রাখা চলে। অথচ শ্রমের হাত থেকে মেয়েদের মুক্তি নেই ঘরে-বাইরে। তাই আজ পিঠে ব্যথা, কাল মাজায় ব্যথা, পরশু কাঁধ জমে গিয়ে স্পন্ডিলাইটিস, হরমোনের অসুখ, বাত, বদহজম আর গ্যাসে কুপোকাত।

অথচ মেয়েদের শরীর মুক্তি খোঁজে, শক্তি খোঁজে, নির্মাণের ক্ষমতা খোঁজে। হাতের কাছে যা পাওয়া যায় তাতেই খোঁজে। খোঁজে পাড়াতুতো বা স্কুলতুতো প্রেম-ভালবাসায়, সিনেমা-যাত্রায় হিরোইনের শরীরের দুলুনিতে, মাইকের গানে। আমরা আজকের মেয়েরা কাল গিয়ে যখন মা-মাসি-পিসি হই, আর আমাদের মেয়ে-ভাইঝি-বোনঝিদের উপর নিজেরাই হাজার রকম বাধানিষেধ চাপিয়ে চোখ রাঙাই, তখন কি আমাদের নিজেদের শরীর-মনের সেই দারুণ খোঁজটার কথা মনে থাকে?

নাচ মানে প্রতিরোধ

নিজের ক্ষমতায় কিছু নির্মাণ করার ইচ্ছেটা আমাদের দেশের মেয়েদের ভিতর ছড়িয়ে পড়ার দরকার আছে। আমরা কেউ-কেউ হয়তো নাচটাই শিখেছি, এবং জেনেছি, হ্যাঁ, মন দিয়ে নাচ শিখলে, শরীরে-মনে সমাজের চাপিয়ে দেওয়া বাধার উপরে নানান প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়। তাই স্বাভাবিক ভাবে আমরা চেষ্টা করি সেই রাস্তাটার খোঁজ আরো বেশি মেয়েকে দিতে।

যে মেয়েরা আর্থিক-সামাজিক দিক থেকে অসুবিধের মধ্যে রয়েছে, সমাজ বলে, তারা নিজের থেকে কিছুই সৃষ্টি করতে পারবে না। আমরা জানি, সেটা ঠিক না। তাই বলে, গোটাটাই মন থেকে করলাম, কারুর থেকে কিছু শিখলামই না, বাকি পৃথিবীতে নাচ আর অন্য সৃষ্টির মাধ্যমগুলোতে কি কি কাজ হয়েছে, সেটা দেখলামই না – তাতেও মজা নেই। মন থেকে তো করতেই হবে। কিন্তু আমি যদি প্রাণ ঢেলে নাচি, আমি তো দেখতে চাইবই আরেকজন প্রাণ ঢেলে নাচা মানুষকে; সময় দিয়ে তার কথা শুনতে চাইব, তার লেখা পড়তে চাইব, তাকে নিজের কথা বলতে চাইব। এটাও নাচ শেখা। এখন, যে মেয়েদের পরিবারে সকাল থেকে রাত অব্দি রোজগারের চিন্তা, তারা এইভাবে সময় খরচ করবে কী করে?

অথচ নির্মাণের কাজের অনেকটাই যে সময় নষ্ট করার উপরেই দাঁড়িয়ে থাকে। বানানো, ফেলে দেওয়া, আবার ফিরে বানানো, আবার ফেলে দেওয়া, এই করতে করতে হঠাৎ একটা ছবি উঠে আসে, যেটা দর্শককে নাড়িয়ে দেবে। তাই নাচ শেখানোর পাশাপাশি এটাও শেখাতে হবে, যে ওই বানানো-ফেলে দেওয়ার খেলার একটা মূল্য আছে। একটা নাচের ক্লাস মানে একটা জায়গা, যেখানে খালি ওয়ান-টু-থ্রি-ফোর লেফট-রাইট-লেফট-রাইট করে নাচ গেলানো হবে না; সবাই মিলে বানানো হবে, সেই নিয়ে গল্প হবে – কেন কেউ একটা কিছু বানালো, একজনের বানানোটা আরেকজনকে কেন নাড়িয়ে দিল, বা দিল না। নাচের স্কুলকে হতে হবে এমন একটা জায়গা, যেখানে এই কথাগুলো বলতে গেলে কারুর মনে হবে না যে সে নিজের বা অন্যের সময় নষ্ট করছে, বা তার মাথার পোকা নড়ে গেছে।

নিজেকে এই সময়টা দিলে তবে নাচের ভিতর দিয়ে জোরালো গল্প বলা যায়। এমন ভাবে বলা যায় যেটা হয়তো শব্দ দিয়ে বোঝানোই যায় না। শরীরের নড়াচড়া নিয়ে খেলতে-খেলতে, বানাতে-বানাতে, ফেলতে-ফেলতে কোনো একটা সময়ে গোটা নাচের দল মিলে হয়তো এমন একটা ছবি তৈরি করে ফেলতে পারে, যেটার ভিতর থেকে একটা গল্প বেরিয়ে আসছে। আবার পদ্ধতিটা উল্টোও হতে পারে। হয়তো, একটা এমন ঘটনা ঘটে গেছে সমাজে, যা ছুঁয়ে গেছে নাচের দলের সবাইকে। তখন কি করা যায়? পুলিশ লাগিয়ে, মারপিট করে নিজের গল্প অন্যকে জোর করে গেলায় দেশের শাসকরা। তার উল্টো দিকে সেই একই শরীরকে কাজে লাগিয়ে প্রতিরোধের গল্প বানানো যেতে পারে।

কেউ একা-একা নাচতে গেলে তাকে হয় চোখ রাঙিয়ে, নয় পুলিশ দিয়ে ঠেঙিয়ে থামিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু দলকে দল নাচতে নামলে তাকে থামানো সহজ নয়। এই তো, মাস খানেক আগেই দক্ষিণ অ্যামেরিকার চিলিতে কয়েকশো মেয়ে এইভাবে রাস্তায় নেমে নাচল, গাইল – ‘রাষ্ট্র তুমিই ধর্ষক। আমাদের পোশাক যাই হোক আমাদের ধর্ষণ করার অধিকার কারুর নেই’। সেই নাচ ছড়িয়ে গেল দেশে-দেশে। নাচল কলকাতার মেয়েরাও।

নাচ ডাক দিয়ে বলে, যে সব মানুষ সমান। নারী-পুরুষ, গরীব-বড়লোক, দলিত-বামুন – সবার শরীরই সেই হাড়-মাংস-রক্ত-পেশীতেই তৈরি। বাকি সব উপর থেকে চাপানো। যে মেয়েদের সাথে কাজ করতে চাই, তাদের বারবার এই ডাক শোনাতে পারাটা নাচের শিক্ষকের সামনে একটা বড় চ্যালেঞ্জ।

নাচ মানে ভালোবাসা?

একটু আগে বাচ্চাদের স্বভাব-নাচের কথা বলছিলাম। নিজের মনে নেচে চলা। যে শ্রেণীর বাচ্চাদের স্বভাবে জড়তা কম, যাদের এমনিতেই রাস্তায় বাঁচতে হয়, দশটা লোকের সাথে নানান শরীরী ভাষায় কথা বলতে হয়, তাদের শরীরে এই নাচ আরোই সুন্দর, স্বাভাবিক, যা দর্শকের মনে আগ্রহ জাগায়। তারা কিন্তু নিজের মতো করে শিখেও চলেছে, নিজেকে ট্রেনিং দিয়ে চলেছে, নিজের মতো করে ক্ষমতা সঞ্চয় করছে। যেমন একটি বস্তির মেয়ের কথা মনে পড়ছে – ক্লাস ফোরে পড়ে। পড়তে-টড়তে পারে না, কিন্তু দিব্যি পায়ের বদলে দুই হাতের উপর দাঁড়িয়ে যেতে পারে, যেটা সাধারণত বস্তির ছেলেদেরই একচেটিয়া ক্ষমতা। বস্তির ঘুপচি গলিতে ঘুরে-ঘুরে বেড়ানো এই মেয়েটির মধ্যে খুব গভীরে একটা বেপরোয়া বন্যতা আছে। সেটাই নাচ। যে মেয়েদের কথা এ লেখায় কয়েকবার উঠে এল, তাদের কথা বলা, তাকানো, হেসে ওঠা – সবের মধ্যেই দেখেছি নাচ আছে – স্বভাব-নাচ।

তাহলে এই মেয়েদের আবার ঘটা করে নাচ শেখাবার দরকারটা কি? আমরা নাচ শেখাবার মধ্যে দিয়ে কি এমন দিতে পারব, যা তারা তাদের স্বভাব-নাচের মধ্যে পাচ্ছে না?

নানা দরকারের মধ্যে একটা দরকার হয়তো এইরকম। স্বভাব-নাচের সমস্যা হল, সে দিশা না পেয়ে ঝুপ করে নিভে যেতে পারে। একটি মেয়ে কী কী ভাবে জীবনের নানা ভালো লাগা-খারাপ লাগাকে তার নির্মাণের ক্ষমতার সাথে জুড়তে পারে, নিজের মনের কথাকে নাচ ব্যবহার করে মানুষের সামনে নিয়ে আসতে পারে যাতে মানুষ ঘুরে দেখতে বাধ্য হয়,  – এগুলো চর্চার সাথে-সাথে আরো ভালো করে বোঝা যায়। শিখতে গেলে তবেই মানুষ আটকায়, তবেই আটকানোটা নিয়ে ভাবে, আলোচনা করে, আর কে কোথায় কি করছে জানতে চায়। আর এই জানাটা যত বাড়তে থাকে তত খুলে যায় শরীর-মন।

আমরা যারা শেখাতে চাই, তারা এই খুলে যাওয়াটা চাই, যাতে রশ্মিকে তার বয়েসের আগেই বিয়ে দিতে না পারে তার দাদা-বৌদি, যাতে তার নাচগত বিস্ফোরণ ঘটতে পারে তার জীবনেও। যাতে গুণা তার মাতাল বাবাকে খোলাখুলি জানাতে পারে তার নাটক করার কথা, যেভাবে সে খোলাখুলি দর্শকের দিকে তাকায় মঞ্চে উঠে। যাতে মাহীকে তার শরীরের লালিত্য আর কঠোরতার দ্বন্দ্বে কষ্ট না পেতে হয়। যাতে অভিরামীকে নিজের শরীরকে আশপাশের শরীরগুলোর সাথে তুলনা না করে যেতে হয়। যাতে টুনটুনি তার নিজস্ব ভঙ্গিতে নেচে-নেচে সকলের মুখের উপর বলে উঠতে পারে, তার বাবা কি করেন, তারা কোথায় থাকে, এবং কেনই বা তারা সেখানে থাকে। আমরা এগুলো চাই। কিন্তু যাদের আমরা শেখাতে চাই, তারা কি আমাদের চাওয়াগুলোকে চায়? তারা কি আমাদের চায় তাদের জীবনে?

এখানে-ওখানে ছোট-ছোট ওয়র্কশপ করতে-করতে মনে হয়, আমরা ভুল করছি। ভাল-ভাল কথা শেখাতে চাইছি, কিন্তু সময় দিচ্ছি না। একটা জোট চাইছি, কিন্তু নিজে সেই জোটে ঢুকতে চাইছি না। ভালো করতে চাইছি, কিন্তু যাদের ভালো করব, তাদের সমস্যাগুলো ধরতেই পারছি না।

তাছাড়া, ভালো করতে চাওয়ার আমরা কে? কই, ওই মেয়েরা তো আমাদের ভালো করবে বলে কোমর বেঁধে বসেনি? অথচ তারা আমাদের তাদের জীবনে যতখানি ঢুকতে দেয়, আমরা কি তার একের দশ ভাগও দিই? আমরা তাদের প্রেমের গল্প, শারীরিক সমস্যার গল্প, বাপমায়ের সমস্যার গল্প, মান-অপমানের গল্প শুনি, কষ্ট পাই, সমাধানের চেষ্টা করি। কিন্তু নিজেদের সমস্যা-দুর্বলতা-দুশ্চিন্তার কথা কতটুকু ভাগ করে নিই তাদের সাথে? অথচ নিজের দুর্বল জায়গাগুলোকে সামনে খুলে ধরাটা কি ভালবাসার শর্ত নয়? শুরুতেই দাবি করেছিলাম যে অন্যের মনের উপর জোরটুকু থাকলে তবেই এক শরীর আরেক শরীরকে নাচ শেখাতে পারে। এই জোরটা কি একতরফা হতে পারে? এ প্রশ্নের উত্তর এখনো খুঁজে পাইনি।

উজ্জ্বল এক ঝাঁক…

যখন এইসব ভাবছি, তখন সামনে আমায় নাচ দেখাচ্ছে চারটি স্কুলের মেয়ে, এক বাড়ির ছাদে, শীতের দুপুরবেলা। নাচছে, নাচছে… হঠাৎ তাদের পিছনে এক ঝাঁক পায়রা উড়ে যাচ্ছে। চারটি মেয়ে যখন ঘড়ির কাঁটার উল্টোদিকে ঘুরে-ঘুরে নাচছে ঘুমর ঘুমর ঘুমর ঘুমে, তখন পায়রারাও ঘুমর ঘুমর ঘুরছে আকাশে ঘড়ির কাঁটার দিক বরাবর। মেয়েগুলি যেমন ঘুরতে ঘুরতে মাটিতে বসে পড়ছে, পায়রাগুলোও ঘুরতে ঘুরতে বাড়ির ছাদে, অ্যান্টেনায়, চিলেকোঠার উপর এসে বসছে,। প্রতিটি পাখির মুখ আলাদা-আলাদা দিকে ঘোরানো। পায়রাদের চিন্তা নেই সমাজ-সংসার নিয়ে। এই চারটি মেয়েও সমাজের সেইসব বড়-বড় সমস্যা নিয়ে চিন্তিত নয়, যা নিয়ে খবরের কাগজ, সোশ্যাল মিডিয়া, ভোটের বাজার মেতে ওঠে। তাদের চিন্তা প্রেম, পরীক্ষায় ফেল, মদ খেয়ে বাবা আর পরপুরুষের সাথে বেড়িয়ে এসে মায়ের ঝগড়া, ফোনের ব্যালেন্স ফুরিয়ে যাওয়ায় তিনদিন টিকটক দেখতে না পাওয়া, শীতে হাতপায়ের ছাল উঠে যাওয়া – এইসব। অথচ পায়রা-মানুষ সমস্তটা মিলিয়ে কি অপূর্ব এক নাচ! সমাজের কাছে এই নাচের মূল্য কি? এই চারটি মেয়েকে আমি তাদের নাচ শেষ হলে কি বলব?

চারজনের একজনের শরীরে রয়েছে দারুণ স্বভাব-নাচ। একজন নতুন চোখ মারতে শিখেছে; সে প্রতিটি স্টেপের সাথে সামনে বসা কোনো কাল্পনিক পুরুষের দিকে চোখ মেরে চলেছে। একজন দায়িত্ব নিয়ে নাচটি শিখিয়েছে বাকিদের, কিন্তু তার চোখ মাটির থেকে উপরে ওঠে না। সে কি যেন ভেবে চলেছে নাচতে-নাচতে। আরেকজন নাচবে কি, হেসেই মরে যাচ্ছে।

ওদের সকলকে আরও ভালো করে শেখাতে ইচ্ছে করে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s