চেন্নাই ফ্লাড স্টোরি : মিথ্যে নিয়ে সত্যি কথা

 

(দুর্বার, জানুয়ারি ২০১৬)

আমার কথা

আমার আদত বাড়ি কলকাতায় হলেও ২০০৭ সাল থেকে আমি চেন্নাইবাসী। ছোটবেলায় বন্যা মানে কয়েকটি ছুটির দিন এবং জল ছপছপিয়ে খেলার আনন্দই বুঝতাম। মাঝে বহু বছর বন্যা বলতে শুধুই টিভির খবরে ঘোলা জল ছিল। চেন্নাইয়ের এই ভীষণ বন্যা এই বিশেষ প্রাকৃতিক দুর্যোগটিকে অনেকটা কাছ থেকে দেখার সুবিধা করে দিল। ব্যক্তিগতভাবে আমার কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। আবারও ছুটির আনন্দে ছপ ছপ করে ঘুরে বেড়িয়ে কাটালাম কয়েকটি দিন।

এই বন্যায় এক বিপুল সংখ্যক মানুষ ব্যাপক অর্থে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন – তাঁরা সমাজের বিভিন্ন স্তরে বসবাস করেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই ব্যাপারটা মজার – এক অর্থে বিত্ত, পেশা, সামাজিক অবস্থান, লিঙ্গ ইত্যাদি তেমন কোনো গ্রাহ্য বিষয় নয়। আবার অন্যদিক দিয়ে দেখতে গেলে এই বৈশিষ্টগুলি মানুষকে যেকোনো রকমের দুর্যোগ থেকেই বাঁচার কিছু অতিরিক্ত সুবিধা বা অসুবিধা তৈরি করে দেয়। তার উপর কোনো মানুষের বা কোনো গোষ্ঠীর জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা কখন সর্বজনগ্রাহ্যভাবে ‘দুর্যোগ’ তকমা পাবে, তারও মানদণ্ড হিসেবে এইজাতীয় নানা বৈশিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

চেন্নাইয়ের দুর্যোগে দেখা যাচ্ছে এমনকি বহু উচ্চবিত্ত মানুষেরও বাসভবন থাকার অযোগ্য হয়ে উঠেছে। দক্ষিণ চেন্নাইয়ের ভেলাচেরি থেকে শুরু করে বিস্তীর্ণ জলাভূমির উপর তৈরি যে ‘নব চেন্নাই’ – সেখানে জল প্রায় দোতলা অব্দি উঠেছে। উত্তর ও মধ্য চেন্নাইয়ের বহু এলাকা, টি-নগর, কোট্টুরপুরম, পোরুর, ভলসেরাবক্কম, আম্বাত্তুর ইত্যাদি বহু এলাকায় মানুষ বুক অব্দি উঁচু নর্দমা ও বৃষ্টির মিলেমিশে যাওয়া জল ঠেলে – স্কুলের পাঠ্যবইয়ে আঁকা বন্যার্ত গ্রামবাসীদের ছবির মত – মাথার উপর জামাকাপড়-বাসনপত্র-টিভি-কম্পিউটার-শিশুদের তুলে ধরে হেঁটে গেছেন শুকনো ডাঙার খোঁজে। হাতের কাছে রবার, হালকা বাক্স, কাঠের টুকরো, প্লাস্টিক এইসব যা পাওয়া গেছে তাই দিয়ে ছোট ছোট নৌকো বানিয়ে ত্রাণের কাজ করেছেন অনেকে, কিছু কিছু এলাকায় ওলা কোম্পানির রবারের নৌকো চলতে দেখা গেছে। রিসার্ভয়ারগুলি যেসব এলাকায় জল ধরে রাখতে না পারায় ওভারফ্লো করেছে, সেখানে দেখা গেছে বাইক চালাতে চালাতে কেউ কেউ জলের তোড়ে স্লিপ খেয়ে খালে পড়ে গেছেন এবং সম্ভবত মারাই গেছেন। টিভি ও সোশ্যাল মিডিয়ায় এসব ছবি বারবার দেখানো হয়েছে। তার ফলে যাঁরা অপেক্ষাকৃত উঁচু এলাকায় থাকায় এই সমস্যায় পড়েননি, অন্যান্য শহরে তাঁদের পরিবার-পরিজন খবর না পেয়ে উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়েছেন। এর প্রধান কারণ দুর্যোগের প্রথম দু-তিন দিন প্রায় সমস্ত ল্যান্ড ফোন, মোবাইল ও ইন্টারনেটে যোগাযোগের রাস্তা বন্ধ ছিল।

যেমন আমি। আমি থাকি ইন্দিরা নগর বলে একটি জায়গায়, যেখানে কিছু রাস্তা জলমগ্ন হলেও বাকি রাস্তাগুলি বেশ শুকনো ছিল। তাই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে হলে খানিকটা নোংরা হাঁটুজলে নামতে হয়েছিল বটে, বাকি শহরের মত এখানেও বিদ্যুৎ-ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় মোমবাতি আর টিউবওয়েলের জলে কাজ চালাতে হচ্ছিলও বটে, কিন্তু তা বাদে কোনো বড় রকমের সমস্যায় পড়তে হয়নি। তার উপর ফোন আর ইন্টারনেট কাজ না করায় বন্যার নানান ভয়াবহ সত্যিমিথ্যে দৃশ্য ও ঘটনা, যা অন্য শহরে মানুষ সহজেই দেখতে পাচ্ছিলেন, তার কিছুই দেখতে বা জানতে পারিনি। ফলে তেমন একটা দুশ্চিন্তাও হয়নি। পর্যাপ্ত গ্যাস থাকায় ভালমন্দ রান্না করে খেয়েছি, মোমের আলোয় বিস্তর গল্পের বই পড়েছি। অবশ্য ভাগ্যক্রমে আমার কাছে কয়েকদিনের জন্য যথেষ্ট খাবার ও পানীয় জল ছিল। যাঁদের তা ছিলনা, তাঁরা সমস্যায় পড়েছিলেন, কারণ রাতারাতি সমস্ত দোকান থেকে মিনারেল ওয়াটার, চাল, ময়দা, পাঁউরুটি, মোমবাতি, তেল, দুধ, তরিতরকারি – এই জিনিসগুলি উধাও হয়ে যায় আর বৃষ্টির কারণে সাপ্লাইও বন্ধ থাকে। শুনেছি শহরের কোথাও কোথাও এসব চড়া দামে বিক্রি করা হয়েছে, কিন্তু আমি প্রত্যক্ষে তেমন কিছু দেখিনি। যাঁরা রোজ কি ঘটছে না ঘটছে এ বিষয়ে বেশি ওয়াকিবহাল, তাঁরা নিশ্চয় এই দুর্যোগ সম্পর্কে আগেই খবর পেয়েছিলেন এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে রেখেছিলেন। পরের দিকে, শহরে না মিললেও, শহরের বাইরের অঞ্চলগুলি থেকে দুধ, চাল, তরকারি আনার ব্যবস্থা করতে পেরেছিলেন অনেকে।

দুর্যোগের দ্বিতীয় দিন, অর্থাৎ ডিসেম্বরের ২ তারিখ সকালে ইন্দিরা নগর আর তার চারপাশের কয়েকটি অঞ্চলে প্রায় ঘণ্টা দেড়েক ঘুরে বেড়িয়েও মোমবাতি কিনতে পারলামনা। আশ্চর্যজনকভাবে যদিও তার আগের রাতেই এক-দেড় কিলোমিটার হেঁটে কোমরজল ভেঙে বাস-মেট্রো পাল্টে বাড়ি পৌঁছেছি, তবুও ওই মোমবাতির অভাবে প্রথমবার মনে হল আমার চারপাশের দৈনন্দিন পৃথিবীটা কোথাও একটা পাল্টে গেছে – যেমন হলিউডের ঘোরতর দুর্যোগবিষয়ক সিনেমাগুলিতে দেখানো হয় – র‍্যাট-ব্যাট-ভলক্যানো-টুইস্টার-বার্ডস এইসবে – যে এক রোদ-ঝলমলে সকালে, হিরো বা হিরোইন বা কেউ একজন বাড়ির বাইরে বেরিয়ে হয়তো বা রাস্তার একধারে একটা ছোট্ট ফাটল বা গাছের নীচে একটা পায়রা মরে পড়ে আছে দেখে খুব সূক্ষ্মভাবে বুঝতে শুরু করলেন (বা তিনি বুঝলেন না, কিন্তু দর্শক বুঝতে পারলেন) যে কি যেন একটা গোলমাল হতে চলেছে! এই হঠাৎ কখন আর পাঁচটা ঘনঘোর বর্ষার দিনের মতই একটা দিন ‘ডিজাস্টারে’ বদলে গেল এটা নিয়ে ব্যক্তিগত আত্মকথার সাত খণ্ড মোটা মোটা বই লিখে ফেলা যায়।

Continue reading